অতীতচারিতার শহর
শতরূপা চাকী
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক শতরূপা জামশেদপুরের এক্সএলআরআই থেকে ম্যানেজমেন্ট-এ স্নাতকোত্তর করে বহু প্রতিষ্ঠিত সংস্থায় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ইন্ডিগো এআর লাইনের মানবসম্পদ বিভাগে জিএম। পনেরো বছর কলকাতার বাইরে কর্মসূত্রে রয়েছেন শতরূপা। বর্তমানে তিনি থাকেন গুরগাঁওতে।
সেই শহরের রাজপথ পেরিয়ে এসে আমরা বাঙালি থেকে বং হয়ে গেছি। সেই শহরের বাইরের দুনিয়াতে অনেক পথের নিশানা, অনেক আশার আলো। সেই আলো কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ে সামিল হতে হতে ফেলে আসা শহরের রাজপথের বুক ঢেকে ফেলা অন্ধকারের দিকে তাকালে নিজের জীবনের আলোটা হঠাৎ খুব চোখে লাগে। ইচ্ছে করে, নতুন করে দেখি নিজের শহর কলকাতাকে। ইচ্ছে করে, নতুন করে তুলি সেই আমার ছোটবেলার স্মৃতিমাখা শহরকে।
সব শহরেরই নিজের এক ইতিকথা থাকে। এক মানদণ্ডে ফেলে সব শহরকে বিচার করাটা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আশীর্বাদ দেশ ভাঙনের নির্মম আঘাত হয়ে নেমে এসেছিল এই রাজ্যের ওপর। অর্থনীতি দুর্বল হওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই। উদ্বাস্তুর চাপ বাড়িয়েছে বেকারের বোঝা। তার সঙ্গে বেড়েছে ক্ষোভ, হতাশা, অবিশ্বাস। সমস্যা আগেও ছিল; এখনও আছে। কিন্তু আগে সমস্যা সমাধানের যে আন্তরিক ও বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা দেখা যেত, সেটাই আর চোখে পড়ছে না আজকাল। পরিবর্তে স্বার্থসর্বস্ব ও দূরদৃষ্টিহীন রাজনীতি এই রাজ্যের উন্নতির সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।
অগুনতি বনধ্, হরতালের মধ্যে বড় হতে হতে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল, সফল হতে হলে এখানে থাকা যাবে না। জীবনে থিতু হওয়ার পর যখন পিছন ফিরে দেখি, বুঝতে পারি ইচ্ছে থাকলেও নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার আর কোনও পথ খোলা নেই। তখন এক অসহায়তা গ্রাস করে বইকি! আমার সমসাময়িক বা নতুন প্রজন্ম কেউ কোনও সদর্থক ধারণা পোষণ করেন না এই শহর সম্পর্কে। যাঁরা বেড়িয়ে গেছেন, তাঁরা ফেরার কোনও ইচ্ছে রাখেন না। আর যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরাও চান তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম বেড়িয়ে যাক এই কর্মহীনতার বেড়া ভেঙে।
এ কি তবে সত্যিই 'অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে মরা'?
ইচ্ছে, শুধু ইচ্ছেটুকু থাকলে, কোনও কিছুই জীবনে অসম্ভব নয়। ছোট-বড় সব বিষয়ের অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ বন্ধ করে গঠনমূলক কর্মের পরিবেশকে উৎসাহিত করার জন্য সদিচ্ছা আর নিষ্ঠা ছাড়া অন্য মূলধন লাগে কি? এইটুকু করতে পারলেই কিন্তু একটি সদর্থক আবহাওয়া তৈরি করা যায়। বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের পরামর্শ মতো উন্নয়নের একটি রূপরেখা তৈরি করে সেটিকে সফল রূপায়ণের লক্ষ্যে কাজ করা যায়।
প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন করার ব্যাপারে প্রশংসনীয় আগ্রহ দেখালেও তার গুণগত মান নিয়ে সচেতনতা দেখা যায় নি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মোপযোগী করে গড়ে তোলা বুদ্ধিজীবির এই শহরে খুব কঠিন কাজ কিছু নয়। পাশাপাশি, অর্থনীতির সূচককে প্রভাবিত করে শিল্প-বাণিজ্যের সাফল্য। আর শিল্প-বাণিজ্যের সাফল্য শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে অর্থনীতির উন্নয়নের সহায়ক করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে নিয়মিত সংযোগ স্থাপন প্রয়োজনীয়। শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য ভরসার বাতাবরণ গড়ে তোলা দরকার। তার জন্য চাই শিল্প উপযোগী নীতি ও তার সফল রূপায়ণের স্বচ্ছ ও স্পষ্ট পদ্ধতি। চাই উপযুক্ত পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি।
আর তার জন্য উন্নয়নকে লক্ষ্য রেখে দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের একসঙ্গে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সখ্যতা বজায় রেখে কাজ করা উচিত। নচেৎ বিরোধ আর পারস্পরিক দোষারোপে সময় ও কর্মশক্তি নষ্ট হয় শুধু। এরই সঙ্গে সরকারি ও প্রশাসনিক স্তরে অতিরিক্ত ও বাহুল্য ব্যয় বর্জন করে সবরকম অকর্মণ্যতা ও দুর্নীতিকে কঠিন হাতে দমন করতে হবে। দরকার এমন এক নাগরিক সংগঠন যা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে সামিল হবে, আর জনগনের অর্থের সঠিক ব্যবহার যাতে হয় তা নিশ্চিত করবে।
আর অবশ্যই দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত ও একত্রিত করে তাঁদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও পুঁজিকে এই রাজ্যের উন্নয়নের কাজে লাগানোর উদ্যোগ হওয়া উচিত।
কলকাতা অতীত আঁকড়ে পড়ে থাকে বলে গাল খায়, কিন্তু অতীত ছাড়া আর কি আছে তার? এ সময় যে ভারি অসময় তার জন্য। তবু তো অনেক কিছু বদল হচ্ছে, রবীন্দ্রসঙ্গীতে ড্রামের তাল বা গিটার এর বোল-এও অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বাঙালির কান। বাউল বাঙালির মনে দিব্যি জায়গা করে নিছে রক ব্যান্ড। তেমন করেই মেনে আর মানিয়ে নেওয়ার অভ্যেস ছেড়ে, সহনশীলতার নমনীয়তা ঝেড়ে ফেলে খুব শিগগিরই হয়তো আমরা দেখব নতুন কলকাতাকে, যেখানে মানুষ প্রশ্ন করবে, কাজ করবে আর ভাল থাকবে।
পরিকল্পনা ও অনুলিখন : ডঃ পাপিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়