এই শহর

নিলামঘরের ইতিকথা

দামু মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, ২১ জানুয়ারি, ২০১৩

kolkata's auction house

অ্যান্টিকের পসরাই ছিল নিলামঘরগুলির প্রধান আকর্ষণ। ছবি- নিজস্ব চিত্র।

নিলাম বললেই সিনেমায় দেখা সর্বস্বান্ত পরিবারের কথা মনে পড়ে। দেনার দায়ে সদ্য দেউলের খাতায় নাম লেখানো গৃহকর্তা মুহ্যমান হয়ে প্রাসাদোপম বাড়ির দালানে বসে। সামনে দুই ছেলেকে জাপটে ধরে চোখের জলে ভেসে যাচ্ছেন অসহায় স্ত্রী। বাড়ির মার্বেলের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে এক শেঠজি তাঁর চাকরদের হাঁকডাক করছেন। আর বাড়ির দাম চুকিয়ে হতভাগ্য পূর্বতন মালিককে প্রায় গলাধাক্কা দিয়ে বাড়িছাড়া করতে উদ্যত শেঠজির গোমস্তা। জানা গেল, ধার শোধ করতে না পারায় ভদ্রলোকের বসতবাড়িটি নিলামে চড়ানো হয়েছে। আর তার ফলেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে ওই পরিবার।

বাণিজ্যিক সিনেমায় অতিরঞ্জনের পারম্পরিক ঘনঘটা নতুন নয়। এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা নিয়ে বাড়াবাড়ি যে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। বাস্তবে বাড়ি নিলামের পেছনে বেশির ভাগ সময়ই এরকম ট্র্যাজিক কারণ থাকে না।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতার পাট চুকিয়ে জাহাজে ওঠার আগে বহু ইংরেজ হোমরাচোমরাই তাঁদের বাড়ির জিনিসপত্র নিলামে তুলে দিতেন। বাড়ির মালিকানা বদল তুলনায় কম ঝক্কির হলেও কাঁড়ি কাঁড়ি ক্রকারিজ অ্যান্ড কাটলারিজ, তার সঙ্গে আসবাবপত্র, আলোকসজ্জা মায় পাল্কি গাড়িটি বেচতে গিয়ে ঘরমুখী সাহেবের তখন ল্যাজে-গোবরে অবস্থা। মেমসাহেবের গুঁতোয় অগত্যা নিলামদারের শরণাপন্ন হতেন সেকালের ইউরোপিয়ান জেন্টলম্যানরা। তৎকালীন চৌরঙ্গিপাড়ায় ছিল বেশ কিছু নিলামের দোকান। কমিশনের বিনিময়ে চটপট সে সব জিনিস বিক্রি করতে এঁদের জুড়ি মেলা ভার। এভাবেই কলকাতার বুকে জাঁকিয়ে বসে নিলামের ব্যবসা।

তবে এ তো গেল বহুকাল আগের কথা। বিংশ শতকের মাঝামাঝি কোনও এক অজ্ঞাত কারণে শহরের নিলামঘরগুলি কেন্দ্রীভূত হয় পার্ক স্ট্রিট-রাসেল স্ট্রিট এলাকাতেই। ১৯৪০ সালে পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন রাসেল স্ট্রিটে খোলে রাসেল এক্সচেঞ্জ। কয়েক বছরের মধ্যেই খোদ পার্ক স্ট্রিটেও নিলামের পসরা সাজিয়ে মুখোমুখি ফুটপাথ ঘেঁসে খুলে যায় স্টেইনার অ্যান্ড কোম্পানি এবং ক্যালকাটা সেল্স ব্যুরো। রাসেল এক্সচেঞ্জের কাছাকাছি ডালহাউসি এক্সচেঞ্জের খ্যাতিও লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। তুলনায় নবীন এঁদের পড়শি মডার্ন এক্সচেঞ্জ। ৬০-এর দশকে এর আত্মপ্রকাশ।

এক সময় মূলত অ্যান্টিকের পসরাই ছিল নিলামঘরগুলির প্রধান আকর্ষণ। তবে তার সঙ্গে প্রাচীন আসবাবত্রের টানেও ভিড় জমত সেখানে। প্রতি রবিবার অতীতের দুষ্প্রাপ্য জিনিসের সন্ধানে রাসেল এক্সচেঞ্জ, ডালহাউসি এক্সচেঞ্জ বা স্টেইনার অ্যান্ড কোম্পানিতে হাজির হতেন শৌখিন সংগ্রাহকরা। এঁদের অধিকাংশই ছিলেন ধনী বা উচ্চবিত্ত। নিলামদারের হাতুড়ির নিচে হাজার হাজার টাকায় সেকালে বিকিয়ে গিয়েছে বেলজিয়ান গ্লাসের ফুলদানি, আয়না, ঝাড়বাতি। কখনও বা নিলামে হাজির থাকা মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছে দুর্মূল্য প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি দেখে।
 
নিলামের দোকানে এক কালে অনায়াস যাতায়াত ছিল চিত্রতারকাদের। শ্যুটিংয়ের অবসরে বহু বারই এসেছেন শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন ও মুনমুন সেনের মতো বিখ্যাত অভিনেত্রীরা। নিলামঘরে প্রায়ই আসতেন অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী, পাহাড়ী সান্যাল। স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ও ঢুঁ মেরেছেন রাসেল এক্সচেঞ্জে। অ্যান্টিকের প্রতি তাঁর অসম্ভব টান ছিল, জানালেন দোকানের অংশীদার সরফরাজ জাভেদ।

তবে সে দিন আর নেই। খদ্দেরের অভাবে রাসেল স্ট্রিটের নিলামঘরগুলি আজ প্রায় ধুঁকছে। ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে স্টেইনার ও ডালহাউসি এক্সচেঞ্জ। এখন সেখানে ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁ আর নামি ব্র্যান্ডের জামাকাপড়ের দোকান। তবু টিমটিম করে জ্বলছে রাসেল এক্সচেঞ্জ। সঙ্গ দিচ্ছে পাশের মডার্ন এক্সচেঞ্জ আর হালের মোহন এক্সচেঞ্জ, সুমন এক্সচেঞ্জ। একদা পোর্শে, স্টুডিবেকার, বুইক, হেরাল্ডের থেকে নেমে আসা রায়বাহাদুর, অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট বা ফিল্মস্টারের বদলে রবিবারের নিলামে উঁকি দিয়ে যান ভেড়ি ব্যবসায়ী, ট্যাক্সিচালক বা মোবাইল ফোনের দোকানদাররা। কখনও-সখনও পথচলতি ভবঘুরেও ঢুকে পড়েন নিলামখানায়। পণ্যও কি আগের মতো মেলে এ তল্লাটে!
 
নিলামের ব্যবসার সুদিন ফুরিয়েছে বেশ কিছুকাল, জানালেন মডার্ন এক্সচেঞ্জের মালিক মনু সিংহ। 'মাত্র কুড়ি শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কোনওরকমে টিকে আছি আমরা', দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রৌঢ়। জানালেন, রবিবার নিলামের টেবিলে ইদানিং জড়ো করা হয় ভাঙা ল্যাম্পশেড আর রঙচটা প্লাস্টিকের থালা-কাপ-ডিশ। ভাগ্য ভাল থাকলে অকেজো মোবাইল ফোন, বছর তিরিশেক আগের অ্যালার্ম ঘড়ি অথবা উইং সাং ফাউন্টেন পেন। অ্যান্টিকের নামে যা আসে তা বেশিরভাগই ঝুটো জিনিস। তাছাড়া, শহরে পুরনো শিল্প নিদর্শন বিক্রির সাজানো শোরুম খুলে যাওয়ার পর নিলামঘরের দিকে বড় একটা পা বাড়ান না প্রকৃত সংগ্রাহকরা।
 
তবে খানিক আশার কথা শোনালেন সরফরাজ জাভেদ। ইদানিং পুরনো আসবাবের প্রতি নাকি আকর্ষণ বেড়েছে নবীন প্রজন্মের। মাস দুয়েক আগে সল্টলেকে নতুন কেনা ফ্ল্যাট সাজাতে রাসেল এক্সচেঞ্জের ভিক্টোরিও আরামকেদারা, আলমারি আর রাইটিং ডেস্ক কিনেছেন জনৈক চিকিৎসক। আর আগামী মাসেই গোটা আষ্টেক চেয়ার সমৃদ্ধ ডিম্বাকৃতি ডাইনিং টেবিলের বরাত দিয়েছেন এক আইটি একজিকিউটিভ। অচিরেই শহরের দক্ষিণ প্রান্তের বহুতল প্রাসাদের টেরাসে শোভা পেতে চলেছে গত এক দশক যাবৎ মডার্ন এক্সচেঞ্জের গুদামজাত রট আয়রনের তৈরি গার্ডেন বেঞ্চ। বেলজিয়ান কাচসাঁটা ওয়ার্ডরোব, হোয়াটনট আর সেগুনের পালঙ্কের অর্ডার দিয়ে রেখেছেন বারাসতের কোনও ব্যবসায়ী। বলতে বলতে রীতিমতো চকচক করে উঠল মনু সিংহের চোখ। নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন নিজেই অ্যান্টিক হতে চলা একদা দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীর নিলামদার।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

প্রচারে সঙ্গীতা-আজাহার

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 209 জন

জয়ের সংসার চলে কার টাকায়?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 558 জন