কথপোকথন
গহরজানের চরিত্র পেলে মনপ্রাণ দিয়ে করব : সঞ্জিতা
কিছুদিন পরেই দিল্লির এনএসডি-তে যাচ্ছে রঙ্গকর্মীর নতুন নাটক 'শ্যামার উড়াল'। মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করছেন সঞ্জিতা মুখোপাধ্যায়। এসময়ে যুক্ত আছেন রঙ্গকর্মীর অনুগুঞ্জ, মানসী, চন্ডালিকা ইত্যাদি আরও পাঁচটি প্রযোজনায়। তাঁর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় আমার আনন্দবাজার।
সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা, ৩০ ডিসেম্বর ২০১২
প্রশ্ন: আপনি তো আগে গান গাইতেন?
সঞ্জিতা: হ্যাঁ, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম।
প্রশ্ন: শ্যামাতে অভিনয় করতে এসে তো নাচ শিখতে হল। কখন শিখলেন?
সঞ্জিতা :(হেসে) আমি ভীষণ কুঁড়ে। গান গাইতেই স্বচ্ছন্দ। দিব্বি বসে বসে গাওয়া যায়। ভাবিনি নাচতে হবে। তারপর ওয়ার্কশপে বাংলাদেশ থেকে জামিল এলেন। বললেন হাঁটার আগে কোনদিন হাঁটতে পারতেন? ব্যস, মানেটাই বদলে গেল জীবনের।
প্রশ্ন: থিয়েটারে আসার গল্পটা একটু বলুন।
সঞ্জিতা: তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। একটি দলে চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় ওথেলো করছিলেন। দাদা মনসিজ বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে নাটক করতেন। আমাকে ধরেবেঁধে এমিলিয়া করাল। করতে করতে ভালো লেগে গেল। লোকে বলল আমার কাজ ভাল হচ্ছে। সেই শুরু। মাঝে যদিও কিছু বছর নাটক করিনি।
প্রশ্ন: কেন? বিয়ে?
সঞ্জিতা: হ্যাঁ। বিয়ের পর কলকাতা ছেড়ে চলে গেলাম দিল্লি, লখনৌ। সে সময়টা কোনও কাজ করিনি।
প্রশ্ন: রঙ্গকর্মীতে যোগ দিলেন কখন?
সঞ্জিতা: অন্য কথা দলে নাটক করতাম। নিজেকে বেশ কনফিডেন্ট লাগছিল। তখন রঙ্গকর্মীতে ৭ দিনের একটা ওয়ার্কশপ হল। ভোপাল থেকে মনোজ নায়ার এলেন। ওয়ার্কশপের পর অনুগুঞ্জ বলে একটা হিন্দি প্রোডাকশন হল। চাকরিতে ছুটি নিয়ে ওটায় কাজ করলাম। তারপরই ঊষা গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে বললেন ওঁর সঙ্গে কাজ করতে। একদিনের সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে পাকাপাকি জয়েন করলাম রঙ্গকর্মী-তে।
প্রশ্ন: আচ্ছা রবি ঠাকুরের এত নৃত্যনাট্য থাকতে শ্যামাই কেন?
সঞ্জিতা: শ্যামার অন্তর্দাহ আমাদের সকলকেই টেনেছিল। আমাদের মনে হয়েছিল শ্যামা সম্পর্কে কিছু ভাবনাকে একসঙ্গে করে একটা বাক্সের মধ্যে রেখে তার চাবিটা কেউ হারিয়ে ফেলেছে। তাই শ্যামাকে নিয়ে ভাবনাচিন্তাগুলো বৃদ্ধি পায়নি। আমরা আমাদের এই নাটকে সেই হারিয়ে যাওয়া চাবিটা খুঁজতে চেয়েছি। জামিল স্যার আর ঊষা ম্যাম আমাদের পথ দেখিয়েছেন।
প্রশ্ন: বন্ধ থাকা ভাবনাগুলোর মুক্তি, মানে আপনারা কি শ্যামাকে একটু অন্যভাবে দেখতে চাইলেন?
সঞ্জিতা: ঠিক অন্যভাবে না। শ্যামা আসলে যা সেইভাবেই। আমরা শ্যামার শেষটা অসীমে নিয়ে গেছি। পৃথিবীতে কোনও মানুষ বাতিল হয় না, যদি সে নিজেকে নিজের চোখে দেখতে পায়। আমরা সেই উপলব্ধির জায়গাটা ছুঁতে চেয়েছি।
প্রশ্ন: কিন্তু উত্তীয়র কি হবে?
সঞ্জিতা: আমরা উত্তীয়কে প্রায় সব সময়ে স্টেজে রেখেছি। শ্যামাকে আমরা দেখেছি এক নটী হিসেবে যে হাজার পুরুষের ঘামে গন্ধে নিজেকে রোজ হারিয়ে ফেলে। বজ্রসেনের মধ্যে সে নিজের প্রেম খুঁজে পায়। কিন্তু যখনই বজ্রসেন তাকে জিজ্ঞেস করে, আমারে করেছ মুক্ত কি সম্পদ দিয়ে? তখনই শ্যামার উত্তীয়কে মনে পড়ে। এটাই তো নাটকের দ্বন্দ্ব। তবে শেষ অবধি বজ্রসেন বা উত্তীয় নয়। শ্যামা নিজেকে খুঁজে পায় মহাবিশ্বের মধ্যে। মায়ার জাল কেটে যায়।
প্রশ্ন: আপনাদের স্ক্রিপ্ট কি মূলের থেকে পরিবর্তিত?
সঞ্জিতা: না না। আমরা শুধু নিজেদের মতো করে সাজিয়েছি। আসলে সত্য আর মায়ার দ্বন্দ্বটা ধরতে চেয়েছি আমরা। পরিশোধ কবিতা,গীতিনাট্য আর জাতকের গল্পর কিছু অংশ আমরা মিলিয়ে দিয়েছি এখানে।
প্রশ্ন: গানের ব্যবহারে কোনও নতুনত্ব? কোনও নতুন গান?
সঞ্জিতা: (হেসে) আর বল না। গঙ্গাজল যদি বালির ঘাট থেকে নিই আর কাশী থেকে নিই- তাতে কি কোনও পার্থক্য থাকে? শ্যামার গানগুলো তো আছেই আর কিছু গান বাইরে থেকে আনা হয়েছে।
প্রশ্ন: চোখের জলে লাগল জোয়ার?
সঞ্জিতা : হ্যাঁ, খুব সুন্দর একটা দৃশ্য তৈরি হয়েছে এই গানটায়।
প্রশ্ন: শ্যামা চরিত্রটা আপনি ছাড়াও আরও তিনজন করছেন। শ্যামাকে কি তিনটে আলাদা সত্তায় ভেঙেছেন?
সঞ্জিতা: না না একটাই সত্তা। শুধু তার মধ্যে যে উথালপাথাল, সেটা আমরা তিনজনে করেছি।
প্রশ্ন: ব্যক্তিগত জীবনে নিজেকে শ্যামার জায়গায় বসাতে প়ারেন?
সঞ্জিতা: প্রতি মুহূর্তেই তো বসাই ভাই। লক্ষ্য স্থির রেখে এগোতে গিয়ে কখনও তো নিষ্ঠুর হতে হয়। কিন্তু মন থেকে তো সেই মায়া কাটাতে পারি না। এই মায়া আর বাস্তবের লড়াই তো রোজ ফেস করি।
প্রশ্ন: উত্তীয় না বজ্রসেন কাকে বেশি ভালবাসে বাস্তবের শ্যামা?
সঞ্জিতা: এমন কোনও লড়াই নেই উত্তীয় আর বজ্রসেনের মধ্যে। শ্যামা দুজনকেই ভালবাসে। একজনের কাছে নিজেকে নিবেদন করে আর একজনের কাছে বিনা দ্বিধায় চাইতে পারে। দেওয়া নেওয়া দুটোই তো একই ভালবাসা।
প্রশ্ন: দশ বছর হল থিয়েটার করছেন। সিনেমা, সিরিয়ালে যেতে ইচ্ছা করে না?
সঞ্জিতা: ইচ্ছে? সে কখন যে কি ইচ্ছে করে কে জানে? আমার কাছে মাধ্যমটা বড় নয়। কী চরিত্র করছি সেটাই বড় কথা।
প্রশ্ন: কোনও স্বপ্নের চরিত্র? যেটায় অভিনয় করতে চান।
সঞ্জিতা: এত কমদিন কাজ করছি সব চরিত্রই স্বপ্নের লাগে। তবে গহরজানের চরিত্র পেলে মনপ্রাণ দিয়ে করব।
প্রশ্ন: থিয়েটারে কোনও আইডল, যাকে দেখে অনুপ্রাণিত?
সঞ্জিতা: আমি জামিলে মুগ্ধ। (হেসে) সরি জামিল স্যার। কাজ শিখেছি দাদার কাছে। ঊষা ম্যাম আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেন। ঘুম ভেঙে রোজ স্মরণ করি তাঁকে।
প্রশ্ন: থিয়েটারকে আরও জনপ্রিয় করা যায় কীভাবে?
সঞ্জিতা: হিমালয়ের চূড়ায় কি কুম্ভমেলার ভিড় হয়? তাতে কি হিমালয়ের জনপ্রিয়তা কমে? জনপ্রিয়তা দিয়ে কি হবে? টাকার কথা বলছ তো? নাটকে লাইটের লোক টাকা পাবে। সেটের লোক টাকা পাবে, যারা অভিনয় করবে তারা পাবে না। এমন না যে সব দল দিতে পারে না কিন্তু দেয় না। এটাই নিয়ম।
প্রশ্ন: তাহলে এবার সোজা দিল্লি? কলকাতায় শ্যামার শো হবে না?
সঞ্জিতা: আপাতত দিল্লি। তবে কলকাতায় হবে না- এমন তো কোনও কথা নেই। হতেই পারে।













