বাংলা ব্লগ

কোথায় পাব তারে

দামু মুখোপাধ্যায়

বেশ কিছু বছর আগে জলপাইগুড়ির সেজোমেসো যেদিন বলেছিলেন, সুখিয়াপোখরি না টংলুতে পর্কসাপ্টা খেয়ে এসেছেন, বাবা জাস্ট উড়িয়ে দিয়ে গর্জে উঠেছিলেন, 'যত্ত সব'! আসলে আজগুবি কথা বলে চমকে দেওয়ায় ততদিনে দস্তুরমতো নাম কিনে ফেলেছেন মেসো।

কিন্তু পরে পাড়ার রোলের দোকানের কারিগর ছেমা লামা যখন হলফ করে জানাল, গত দেওয়ালিতে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে জিনিসটা সে নিজে চেখে এসেছে, তখন নড়েচড়ে বসলাম। একটা আস্ত গোল্ড ফ্লেকের টোপ দিতে সেদ্ধ নুডলস ঝুড়িতে শুকোতে দিয়ে টুল পেতে সে বসল। তারপর সিগারেটে আয়েসি টান মেরে চেরা চোখ যতটা পারা যায় বিস্ফারিত করে নাগাড়ে আধ ঘণ্টা ধরে চলল দুর্লভ পদের গুণবন্দনা। কিন্তু তার চেহারা কেমন? চেপে ধরতে বুঝতে পারলাম স্বাদগ্রহণ দূর অস্ত, বাপ-দাদার মুখে শোনা কথাই এতক্ষণ কপচাচ্ছে। তবে ধরা পড়ে গিয়েও মহাকাল বাবার কিরে কেটে সে জানাল, ও নামের পদ সত্যিই মেলে পাহাড়িয়াদের সাবেক হেঁশেলে।

ব্যাপারটা ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম, যদি না দার্জিলিঙে মায়ের বন্ধু আতরমাসির বাড়িতে হঠাৎ পাটিসাপ্টার প্রসঙ্গ উঠত। মনে পড়ে যেতেই আতরমাসির ছোটছেলে গদাইদাকে পাকড়াও করলাম, কোথায় মিলবে পর্কসাপ্টা! ভেবেচিন্তে সে আমায় নিয়ে গেল ম্যাল (এখনও মল হয়নি!) ছাড়িয়ে ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ টপকে 'নিউ ডিশ' রেস্তোরাঁয়।

ছোট্ট দোকানে গিজগিজ করছে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ের ভিড়। ছটফটে গোর্খা মেয়ে বাইরের একচিলতে ফুটপাথে বেঞ্চি পেতে দিল। মাঙ্কি টুপির শিরস্ত্রানে শেষ নভেম্বরের শীত বাগ মানে না। মরা রোদে পিঠ দিয়ে বসতেই মেলামাইনের জাবদা বোলে এল ধোঁওয়া ওঠা চিকেন স্যুপ। ওপরে লিকের কুচি। খাসা স্বাদ তার! গা গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মগজের কলম্বাস উঁকি মারলেন। ইতিমধ্যে গদাইদার ডাকে সামনে হাজির সাঁই লম্বা এবং তার চেয়েও চওড়া গোমড়া মুখের মাঝবয়েসী দোকানমালিক।

'নাও, তোমার কী জানার আছে এঁকে জিজ্ঞেস কর', বলে স্যুপ শেষ করতে মনোযোগী হলেন দাদা। আমি কালীঘাটিয়া হিন্দিতে কথা শুরু করতেই বিরক্তবাবা আরও গম্ভীর হয়ে বাতলালেন, 'আপনি বাংলায় বলতে পারেন। আমি আঠেরো বছর বাঁশদ্রোণীতে ছিলাম'।

আচমকা মুগ্ধবোধে দেঁতো হাসিই বাঙালির সম্বল। ইনিয়ে-বিনিয়ে অভীষ্টের কথা জানাতে ডান পাশের ভুরুটা একটু উঠল। খানিক কী যেন চিন্তা করে জানালেন, বস্তুটা শহরে মেলা ভার। তবে গাঁ-গঞ্জে মিললেও মিলতে পারে। তাঁর কাছেই প্রথম জানতে পারলাম, নামে মিল থাকলেও চরিত্রে বাংলার পাটিসাপ্টার সঙ্গে আদপেই সাদৃশ্য নেই শুয়োরের মাংসের এই ইতিপূর্বে অশ্রুত পদের।

সান্ত্বনা হিসেবে পেল্লায় রোস্টেড পর্কের চাঙড় সামনে রেখে বিদায় নিলেন গদাইদার রেফারেন্স। মিথ্যে বলব না, অতুলনীয় ছিল নিভু আঁচে ঝলসে নেওয়া সেই বরাহমাংস খণ্ড। কিন্তু সোনার হরিণের খোঁজে বেরিয়ে কি আর শাখামৃগে সন্তুষ্টি আসে!

সেই থেকে পর্কসাপ্টাই হয়ে উঠল আমার ধ্যান-জ্ঞান। তার সন্ধানে কোথায় না হানা দিয়েছি! গ্যাংটকের ‘হাংরি জ্যাক’ থেকে কালিম্পঙের ‘গোম্পুজ’, ফুন্টশিলিঙের ‘ববিজ ডেন’ থেকে রংপোর ‘ফুরকে দাজু’-র ঠেক, মায় সাবেক ভবানীপুরের ‘টিবেটান ডিলাইট’। কেউ পড়েছেন বহুতলের ছাদ থেকে, কেউ ভেট দিয়েছেন অনাবিল ফোকলা হাসি, আবার কেউ খ্যাক্‌খ্যাক্ করে হেসে মাছি তাড়ানোর মতো স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছেন আমার কৌতূহল। মোদ্দা কথা, প্রায় হাজার দুয়েক কিলোমিটার চষে ফেলেও স্বর্গের পারিজাতের মতোই অধরা রয়ে গিয়েছে অনাস্বাদিত সেই রসনা-মায়া।

পুজোর দিন কুড়ি আগে অফিসের কাজে কার্শিয়াং যাওয়ার হুকুম এল। মালদা থেকেই সঙ্গী হল নাছোড়বান্দা বৃষ্টি। নিউ জলপাইগুড়িতে ভোরবেলা নেমে মেজাজটাই গেল বিগড়ে। ধুত্তোর! দায়ে না পড়লে উত্তরবঙ্গের বর্ষার খপ্পরে কেউ পড়ে! কার্শিয়াং পৌঁছে দেখি মেঘের ওড়নার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে মিটমিটে সূর্য। দু' দিনের কাজ মিটিয়ে কলকাতামুখো হব, এই ছিল প্ল্যান। কিন্তু দুপুর গড়াতেই দুদ্দাড় বাজ-টাজ পড়ে তেড়ে বৃষ্টি নামল।

ঘর ছেড়ে বেরনোর উপায় নেই। গেস্ট হাউজের চৌকিদার পবন বাহাদুর কাঁচুমাচু মুখে জানাল, বাজার বসেনি এ বৃষ্টিতে। তাই ডিমের ঝোল দিয়ে ডিনার সারতে হবে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তিরিক্ষি গলায় জানতে চাইলাম, ডিম ছাড়া আর কিছু মিলবে কি না।

'ফাকসা হ্যায় না সাব'! পবনের স্বীকারোক্তি। ফাকসা, মানে শুয়োরের মাংস। আরে! এ তো মেঘ না চাইতেই জলের ব্যবস্থা করে ফেলেছে।

“তা, কী রান্না হয়েছে বাপু!” নোলা সামলে শুধোই।

'গাঁও থেকে বজু এসেছে। পর্কসাপ্টা পাকিয়েছে। হুজুরের চলবে কি'?

নিজের কানকে বিশ্বাস করা যায়? ইচ্ছে হল কম্বল ছেড়ে লাফ দিয়ে বাহাদুরকে এক্কেবারে ফ্রেঞ্চ কিস দিই। হা ঈশ্বর! কী বিচিত্র তোমার লীলা! যার খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটে বেরিয়েছি আকৈশোর, সে এভাবে, এত অবলীলায় কার্শিয়াঙের বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ধরা দিল!

আবেগের গলায় ল্যাসো হাঁকড়ে কোনও রকমে বললাম, 'এক্ষুনি নিয়ে এসো ভাইটি। খিদেয় নাড়িভুঁড়ি জ্বল রাহা হ্যায়'।

থালায় চড়ে চারটে দামড়া হাতরুটিকে সঙ্গী করে এলেন আমার স্বপ্নের রাজকন্যা। আহা, কী তাঁর গায়ের রং! যেন জ্বলন্ত কাঠকয়লা! থকথকে গ্রেভির নদীতে আধডোবা হয়ে থিতু অসংখ্য চ্যাপ্টা, চৌকো মাংসের টুকরো যাঁদের কয়েকজনের মাথায় সরু সফেদ চর্বির তাজ। নাক টেনে বুকে ভরে নিলাম তাঁর গায়ের তীব্র গন্ধ। উফ! পাগল করা সেই সুঘ্রাণ নিমেষে জারিয়ে গেল শরীরের প্রতি রক্তবিন্দুতে।

জিভের প্রথম স্পর্শেই প্রায় চেতনালুপ্তি। একটু ঝাল, খানিক টক, কিন্তু আরও যেন কত কিছু! রসনার অনিবর্চনীয় মায়ায় আচ্ছন্ন হলাম। স্বাদের লিবিডোয় টঙ্কার তুলে স্বপ্নসুন্দরী জানালেন, 'আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা'!