চলতি হাওয়া

যখন ছোট ছিলাম

গুলশনারা
কলকাতা, ২৩ নভেম্বর ২০১২

Childhood

কে বলেছে আমরা ভাল নেই? ছবি- ফাইল চিত্র।

বছর পাঁচ আগে ল্যাবে চাবি দিয়ে বিজ্ঞানী নেরস্যেন ফ্রিডা বেশ চিন্তিত। আজও পাগলটা দাঁড়িয়ে আছে। জংলা দাড়ির বয়স আনুমানিক ৫৫। ডাস্টবিন উল্টে রঙিন চকোলেটের প্যাকেট খুঁজে-পেতে মুখে সে কী আনন্দ তার! যেন আশপাশে হাসতে ভুলে যাওয়া মানুষকে এক থাপ্পড় কষিয়ে বলে, কে বলেছে আমরা ভাল নেই? এই দেখো কেমন ভাল আছি। নাহ! এই সময়ে না। ঠিক ছোটবেলায় ফিরে গিয়ে ভাল আছি। ফ্রয়েড উলটে ফ্রিডা বছরের পর বছর ভেবেছেন। তাঁর চেনা-পরিচিত অর্গানাইজেশনগুলির কেস স্টাডি করেছেন। পাগলামি লক্ষণের অধিকাংশ কীসের টানে ফিরে যায়, চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলায়? জটিলতা আর মুখোশের ভারে ক্লান্ত বড়বেলার হাতুড়ির চাপে হঠাৎ গুলিয়ে ফেলা মন (আভিধানিক অর্থে বিকৃতি) নিস্তরঙ্গ ছোটবেলায় যেতে চেয়ে চেয়ে ভাল থাকে? যেমন জ্বরের বিকারে ছোটবেলায় মায়ের হাতের দুধ-পাঁউরুটির গন্ধের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো।

সেই রাস্তার পাগলটাকে কিন্তু সীমানা-পরিধি ছাড়িয়ে দেওয়ালে ঝোলানো আয়নায় দেখতে পাওয়া যায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্কিৎজোফ্রেনিয়া হোক বা ডিপ্রেশন, এই গোত্রের ৭০ ভাগের(বিশেষত এই প্রজন্ম) লক্ষণ হল বারবার বর্তমান সময় ভুলে ছোটবেলাকে গুলিয়ে ফেলা বা সে সময়ে ফিরে যাওয়ার নিষ্ফল বাসনা থেকে ভেঙে পড়া। কারণ কী? ক্লান্ত দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়তেই একরাশ ভাবনা- এই দৌড়ের শেষ কোথায়! একেবারে এই প্রজন্মের ব্যথার গভীরতা আরও বেশি। মুখ ফুটে চাওয়ার আগেই 'সব পেয়েছি'-র ছোটবেলা মানেই গোছানো-পাটপাট একটা কাল। প্রেম না পাওয়া থেকে চাকরির অনিশ্চয়তা বা ইঁদুর দৌড়ে সামান্য ফসকে যাওয়ার মানেই সেই 'সব পাওয়ার' ছোটবেলা, লাস্ট ট্রেনের হতাশা নিয়ে দূর অতীত থেকে চেয়ে থাকে। কান্না পেতে পেতে হঠাৎ করে সেই দিকে মিশে যাওয়া মন কখনও ডিপ্রেশন, কখনও স্কিৎজোফ্রেনিয়া নাম দিয়ে দাঁত খিচিয়ে ওঠে। আধুনিক-ফাস্ট জীবনের আরও নানা মাসুলের মধ্যে রাজার শিরোপায়, এই ছোটবেলা ফিরে পেতে চাওয়ার বুকফাটা আক্ষেপ। চলতে চলতে হাওয়ায় কান পাতুন ঠিক শুনতে পাবেন সেই মনখারাপের দীর্ঘশ্বাস বা গাড়ির লুকিং গ্লাসে চেনা মুখের অচেনা ব্যথা। এই চাদরে মুড়ে একটা প্রজন্ম।

আমরা তো সত্যিই আর ছোট নেই। 'মেঘবালিকা'-র কথা মনে করতে করতে সেদিন হঠাৎ মনে হওয়া বিকেলে স্বীকারোক্তি বহু পুরাতন ছোটবেলার এক বন্ধুর। বিতর্ক জাগতেই পারে, তবে জয় গোস্বামী কি ছোটকালের কথা বললেন? না ঠিক তা নয়। তবে আধুনিক কবি খুব স্পষ্ট শেখালেন ওই চেনা চরাচরে নদীর ধার ঘেঁষে মেঘবালিকার প্রতীক্ষা, বৃষ্টি মেখে নির্জনতায় একদিন রঙিন কল্পনার ফানুসে ভেসে যাওয়ার আক্ষরিক নাম ছোটবেলা। আঁতলেমি দোষে দুষ্ট কেউ কেউ চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে বলেন, বিপন্ন শিশুকাল। তাই নাকি এতসব ছাঁইপাশ-চারপাশ! সেবার গরমের ছুটির মওকায় সত্যজিতের 'যখন ছোট ছিলাম' হাতে নিয়ে বেশ হাসি তখন। বড়ত্বের গাম্ভীর্যে এসে কারও বুঝি অমন পরাধীন শিশুবেলা নিয়ে মনখারাপ মাখামাখি হুতাশ থাকতে পারে? ক্লান্ত দিনের শেষে ফিরতি ট্যাক্সির জানালায় সিগারেট ঝাড়তে গিয়ে, পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া সেই ছোটকালের স্কুলবাড়ি চোখ পাকিয়ে বলে, হ্যাঁ ছোট থেকেই বড় হওয়ার কঠিন পথের দুধারে বেগনভুলিয়ার মতো ঝুলে থাকে এই হুতাশ- ইস কেন যে বড় হলাম!

কিন্তু বড় হওয়ার নানা মুহূর্ত শিখিয়েছে ঠোক্কর খেয়ে, লুকিয়ে ব্যাণ্ড-এইড লাগিয়ে আবার ছুটতে শুরু করা। নিষ্ফল ব্যথার মতো ঝুলে থাকা হাসিখুশি চাঁদমালা-ছোটবেলা বেশ থাকুক, একলা রাতে- শূন্য ছাদে। জ্বালা জুড়োতে ফিরে পেতে চেয়ে মদের গ্লাস না, সঙ্গী হোক কার্টুন চ্যানেল বা পাশের পাড়ায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা মেলায় বেলুন ফাটানোর বাচ্চামি। ছোটবেলা হারতে শেখায়নি। সেই জিতে যাওয়ার দাঁতে-দাঁত জেদ মুছিয়ে দিক বড় হওয়ার ক্লান্ত হতাশা। মনোবিজ্ঞানীর চেম্বারের পাশ দিয়ে হাসিমুখে যেতে যেতে বলে উঠুন, ভাগ্যিস ছোটবেলাটা ছিল।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

"ব্রহ্মাস্ত্র ১৩৭"

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 48 জন

খুনের আসামী শিক্ষিকা চম্পাদেবী

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 43 জন

ললিত মোদীর গড়াপেটা বোমা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 39 জন

জানতে চাও সে কেমন ছেলে?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 81 জন

মাধুরীর ঘাঘরায় রণবীর ফিদা

টিসিরিজ

দেখেছেন 158 জন