চলতি হাওয়া
জীবন থেকে ফ্যাশনে সিরিয়ালের নায়িকারা
গুলশনারা
কলকাতা,২৭ নভেম্বর ২০১২
'ম্যায় মাধুরী দীক্ষিত বননা চাহতি হুঁ' ছবিটার কথা মনে পড়ে? যে ছবিতে গ্রামের মেয়েটি সুপারস্টার মাধুরী দীক্ষিতের মতো হতে চেয়েছিল? হতে গিয়ে কীসব অ্যাডভেঞ্চারের মুখে সে পড়ল, তাই নিয়েই ছবির গল্প। এবার সেসব অভিজ্ঞতার কথা বাদ দিয়ে যদি ছবির সারটুকু দেখি? সেটা হল, একটি সাধারণ মেয়ের অসাধারণ তারকা হতে চাওয়ার বাসনা। এই ইচ্ছেটুকুর আড়ালে রয়েছে আদতে নিজেকে সেই চরিত্রের আদলে গড়ে-পিটে নেওয়া। এভাবেই শহর থেকে গ্রাম, মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তের গণ্ডি পেরিয়ে 'থোড়া ফিল্মি' হওয়ার প্রতিযোগিতা কিন্তু কোনও যুগেই থেমে থাকেনি। তার ফলটা কাজে কাজে কী দাঁড়াচ্ছে চলতি হাওয়ায়?
আস্তে আস্তে পছন্দের নায়ক-নায়িকার চেয়ে, তাঁদের অভিনীত কোনও চরিত্রই হয়ে উঠেছে জীবন থেকে ফ্যাশনের ফান্ডা। তবে চলতি হাওয়ার চলতি ট্রেন্ড সব সময়ই একটু হটকে, একটু কুল। তাই চলতি তারকা ফ্যাশনে ফিল্মি-সিল্মি ভাবনা নয়, হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছে মেগা সিরিয়াল। ড্রইং রুমের বোকাবাক্সে বন্দী হরেক মেগা সিরিয়ালের নায়িকার দিনলিপি-সংগ্রাম-ফ্যাশন ফান্ডা ভীষণ ভাবে জেন ওয়াই-এর চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনভর একেক ধারাবাহিকের মুখ্য চরিত্ররা (মূলত নায়িকারা) শাড়ি-স্টোল-জাংক জুয়েলারির অনন্য ফ্যাশন নিয়ে বাজারে সেরা। আর এই নায়িকাদের জীবনভর লড়াই ইন্সপিরেশনের কাজ করছে রিলেশনশিপ আর আধুনিকতার 'চাক্কি পিসিং' লাইফে। গ্রাম থেকে কলেজে আসা সেরা ছেলেটিকে, বড়লোক বাবার আদুরে মেয়ে নায়িকা বাড়ির সঙ্গে লড়াই করে জীবনসঙ্গী বানাচ্ছে বা শাশুড়ি-ননদের অত্যাচারের মুখে মাথা না ঝুঁকিয়ে বাহারি শাড়ির আঁচল গায়ে ফেলতে ফেলতে সব পরীক্ষায় জয়ী হচ্ছে, সে গল্প মাসি-পিসির চাইতেও জেন ওয়াইয়ের বেশি প্রিয়। কারণ, কোথাও এই লড়াইয়ের শেষে জিত আছে। শিল্পের স্বার্থে কান্না দিয়ে অসম্পূর্ণতা যেখানে আধুনিক ছবির চরিত্র, সেখানে মেগা সিরিয়ালের গল্পে কাঙ্ক্ষিত হ্যাপি এন্ডিং কেল্লা ফতে করছে। উদাহরণ চাই?
গ্রাম থেকে আসা অর্ধশিক্ষিত-হাবাগোবা-বেচারি মৌরি যখন শহুরে স্বামীর মন পাওয়ার লড়াইয়ে, স্বামীর আল্ট্রা মডার্ন-সর্বসেরা প্রেমিকাকে পিছনে ফেলে জিতে যায়, সে বছর মৌরিই ছিল সবার চোখের মণি। দাঁতে দাঁত চিপে টার্গেট পূরণের অনুপ্রেরণা মৌরি জুগিয়েছিল। জনপ্রিয় এই মেগা সিরিয়ালের চরিত্রের আড়ালে অভিনেত্রী গৌণ। মৌরি চরিত্রই তখন নায়িকা। সেবার পুজোয় উঠল আটপৌরে শাড়ি আর মুখে সারল্যের মেক-আপ নিয়ে বাজার কাঁপানোর ফ্যাশন। গ্রামের মেয়েটা যদি অসাধ্যসাধন করতে পারে, তবে আইআইএম ফেরত এমবিএ সার্টিফায়েড যুবা পারবে না বসের নাকে তুড়ি মেরে প্রোমোশন বাগিয়ে নিতে? ঠিক এই খেলাতেই মেগা সিরিয়াল ছবিকে কোথাও পিছনে ঠেলেছে।
ফলে বসার ঘর থেকে শোওয়ার ঘর, এমনকি অফিসের ডেইলি রুটিনেও এখন মেগাকাঁপানো নাটকবাজি! তাতে অসুবিধেও নেই, কেননা হিন্দি ছবির হিরেখচিত আড়ম্বর নয়, বাংলা মেগার জনপ্রিয় নায়িকারা সবাই গ্রাম-মফস্বল থেকে উঠে এসে একেবারে শূন্য হাতে লড়াই শুরু করে। সাঁওতাল মেয়ে বাহা, কলোনির মেয়ে টুসু, মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে টাপুর, বস্তিতে বড় হওয়া মেয়ে ঝিলিক, পাহাড়ের সারল্য বয়ে নিয়ে আসা এষ্ণা, গ্রামের দস্যি মেয়ে অলক্ষী- এরা সবাই। এদের লড়াই ভীষণভাবে সবল-শক্তিমান প্রতিযোগীর সঙ্গে। দজ্জাল ব্যাকলেস পরিহিতা শাশুড়ি, ইংরেজি ফটফটানো নোজ রিং-এর সেক্স বম্ব ননদ, বিজনেস টাইকুনের আদুরে মেয়ে কাম স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকা- অর্থাৎ বিত্তে আর ঐশ্বর্যে মহা শক্তিশালী। কিন্তু ভালবাসা আর সততা সঙ্গে নিয়ে আমাদের ঘরের বাহা-টুসুরা শেষমেশ জিতে নায়কের সঙ্গে প্রেমের সিনে যায়। প্রেম আর বিশ্বাস সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ের এই মন্ত্রই চুম্বকের মতো টানছে জেন ওয়াইকে। হেরে যেতে না শেখা এই প্রজন্ম বিশ্বাস করতে চাইছে, এই সাধারণও পারে সততা আর প্রেমের লড়াইয়ের জোরে বিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে।
টেলিভিশনের জনপ্রিয় নির্দেশক স্নেহাশিস চক্রবর্তীও এই কনসেপ্টে কোথাও ভুল দেখতে পাচ্ছেন না। তিনি জানাচ্ছেন, 'তা তো হবেই। একটা ছবি হলে গিয়ে কেউ দেখলো বা দেখলো না। কিন্তু মেগা আসে প্রতিদিন, রিপিটে কয়েক বার। সেখানকার নায়িকারা লাঞ্চ থেকে ডিনার টেবিলে ডাল-ভাতে মেখে আছে। আগে মেগা সিরিয়ালে অনেক মুখ্য চরিত্র থাকত, বয়স্ক চরিত্ররা আদর্শের কথা বলতেন। এই ছবিটা অন্য। একটা সদ্য তরুণী, কখনও গ্রামের মেয়ে- সে অন্যায়, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকার মন্ত্র শেখাচ্ছে। এখানেই তারা সব প্রজন্মের কাছে প্রিয়।'
তবে শুধু চারিত্রিক আকর্ষণ নয়, ফ্যাশন মার্কেটেও কাজে কাজেই মেগার নায়িকারাই সেরা। পুজোয় কাঁপানো বাহা শাড়ি, এষ্ণার স্কার্ট-স্টোলের ফ্যাশন, মুনের মেটালের গয়নার রমরমা শপিং মল থেকে কলকাতার বাজারগুলিতে। হবে নাই বা কেন, মহাতারকার ছুঁতে না পাওয়া দূরত্ব থেকে টেলিভিশনের দুনিয়াকে বাড়িতে এনে ফেলা নিত্যদিনের নায়িকাদের সাজ আর সংগ্রাম আকর্ষণ করতে বাধ্য বইকি।













