চলতি হাওয়া
কার্টুন দেখো না
উজ্জয়িনী মুখোপাধ্যায়
কলকাতা,২৮ নভেম্বর ২০১২
স্কুলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হতে হতেই পিয়ালী সাজিয়ে দিচ্ছিল রঙ্গিতের টিফিন। আজ ওর স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে; যেতেই হবে। অথচ রঙ্গিত আজ বেশ নাছোড়। মাকে সেই ছোট্টবেলা থেকেই ঘুম ভাঙার আগেই ও বেরিয়ে যেতে দেখে। স্বাভাবিকভাবেই ওর ব্যাপারটা ভাল লাগে না। ফলে মাঝেমধ্যেই করে ফেলে অন্যায় আবদার। আজও তেমনই একটা দিন, ওর খুব ইচ্ছে করছে মায়ের মুখে সেই 'লিও টলস্টয়'-এর গল্পগুলো শুনে কাটিয়ে দিতে সারা দুপুর। পিয়ালীও জানে, এমন এলোমেলো পরিস্থিতিতে কী করে মন ভাল করতে হয় খুদেটার! আলমারি থেকে টুপ করে বার করে ফেলা ডোরেমনের নতুন পেন্সিল বক্সটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিতেই হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠলো সেন্ট জেভিয়ার্সের খুদে রঙ্গিত মুখোপাধ্যায়ের মুখে। পছন্দের কার্টুনকে টিভি ছেড়ে অ্যাকসেসরিজে পেয়েছে ও; এখন তাই নিয়েই মেতে থাকবে।
রঙ্গিতের মতোই আরেক কার্টুনখোর ঈশান। রুবি পার্কের দিল্লি পাবলিক স্কুল-এ পড়ে ঈশান। বাবা প্রায়শই কলকাতার বাইরে থাকেন, মা বেলা থেকেই অফিসে চলে যান বলে মাঝে মাঝেই মুড সুইং-এ পড়ে যায় ঈশান। ভাত খেতে বড্ড সময় লাগায় ও। ফলে মা বেশিরভাগ সময়ই চালিয়ে দেয় টিভি-তে বেন টেনের কার্টুন। ব্যস, কেল্লা ফতে। ঘন্টার পর ঘন্টা সাধ্য-সাধনা করেও যেটা খেতে সময় লাগাতো অনেকখানি, সেই খাবারটা নিমেষে শেষ করে ফেলে ও। মা-ও নিশ্চিন্তে চাকরিতে যেতে পারে কার্টুন চালিয়ে দিয়ে!
এরকমই শহরের আরেক মা সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার সংযুক্তা পাল, তাঁর ছোট্ট মেয়ে রুখিকে সময়ই দিতে পারেন না। কথায় কথায় মেয়ের অন্যায় আবদার বা অবাধ্যতাকে বাড়তে না দেওয়ার উপায় হিসেবেই প্রায় কিছুটা অসহায়ভাবেই সংযুক্তা কম্পিউটারে চালিয়ে দেন ছোটা ভীমের সিডি! এছাড়াও পড়া, খাওয়া, সময়ে সময়ে কাজগুলো করানোর জন্যেও সে ছোটা ভীমের ব্যাগ, পেন্সিল, জামা, খাতা, পোস্টার... অনেক ঘুষই দিয়ে থাকেন। 'এছাড়া উপায়টাই বা কী? সবাই আশা করে থাকে যে বাচ্চার দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে মাকে; কিন্তু তারও তো নিজের একটা কাজের জগত আছে। এটা কেউ বুঝতে চায় না। ফলে ভুলিয়ে রাখার জন্য আমার ওই কার্টুনই ভরসা', বলছেন সংযুক্তা।
তো, পরিসংখ্যান বলছে একটাই কথা! এই সময়ের সন্তানদের অন্যমনস্কতা, আবদার, জেদ, অন্যায় দাবি- সবকিছুকেই মা বাবারা নিজেদের ব্যস্ততার সঙ্গে ব্যালান্স করার জন্য তাদের সামনে এনে দিচ্ছেন হাজার একটা কার্টুন এবং কার্টুন চরিত্রগুলির ছবি দেওয়া নানান প্রোডাক্ট। জেনে বা না জেনেই চলতি সময়ের অভিভাবকরা তাঁদের টালমাটাল কর্মজীবন আর সন্তানদের ন্যায্য সময় দেওয়ার এই টানাপোড়েনের মাঝেই কার্টুন দুনিয়ার এই অসম্ভব জগতের মোনোপলিটাকে কিন্তু বাড়িয়ে দিচ্ছেন বেশ ভালভাবেই।
ডোরেমন, শিনচন, ছোটা ভীম, বাল গণেশ, বেন টেন, অগি- ওরা নিষ্পাপ একদল কার্টুন চরিত্র। তারা জীবন্তও নয়, ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাসিন্দা। সেই তারা কীভাবে ও কেন স্কেল, স্কুল ব্যাগ, ওয়াটার বটল, জুতো, টি শার্টের মতো হাজার একটা জিনিসের মাঝে জড়িয়ে পড়ছে ও সামলে রাখছে আমাদের খুদে ছানাদের জীবন, সেটা সাফ সাফ বাতলালেন সাইকোলজিস্ট রুমা মুখোপাধ্যায়। এই কার্টুনের ক্যারেক্টারগুলো ওঁর মতে, একদিকে যেমন সাহায্য করছে সামাজিক আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, সেক্স রোল টাইপিং, ভোকাবুলারি, ভাষার দখল বাড়ানো, পোশাক-সেক্স-ধর্ম-মানুষের শরীরের মতো অনেক বিষয়ে বেশ ছোট থেকেই একটা নিখাদ ধারণা তৈরি করতে, ঠিক তেমনই ধ্বংসাত্বক আচরণ, মারপিট, পড়াশুনায় অমনোযোগ, মানসিক দোলাচলতা, মিথ্যাচারণ, বাড়ির কাজে অমনযোগী হওয়ার মত ফ্যাক্টগুলোকেও এফেক্ট করছে প্রকটভাবে। তাঁর মতে, 'এগুলো একটা লং টার্মে চলতে থাকলে শিশুদের মনে চাপ পড়ে। নেগেটিভ চাপগুলো বেশি পড়তেও পারে কম বয়সের জন্য। তাই অভিভাবদের উচিত কাজের শেষের আউটডোর গেম, কাউনসেলিং, প্লে থেরাপি, মরাল স্টোরি, ছবি আঁকা, গল্প করা, সমবয়সীদের সঙ্গে ফ্রি-মিক্সিং-এর মতো জিনিসগুলোতে বেশি স্ট্রেস দেওয়া। কোয়ালিটি টাইম কাটাতে না পারলে শিশু নেগলেকটেড ফিল করতে পারে, যেটা তার সাইকোলজিকাল ডেভেলপমেন্টে বেশ বাজেভাবে এফেক্ট করতে পারে'!
ভয়ের ব্যাপার না? সন্তানদের সময় দিতে না পেরে কার্টুন চরিত্রের নানান প্রোডাক্ট ও কার্টুন চ্যানেলটা কম চালিয়ে দিয়ে এবারে তাই একটু সন্তানদের দিকে মন দেওয়ার পালা! কারণ এই কোমল সময়ের পিতৃত্ব-মাতৃত্বটা মিস করলে, ভবিষ্যতে ওদের থেকে বেশি খারাপ লাগবে আপনারই, তাই না?













