চলতি হাওয়া
চলে এসো বন্ধু হতে
উজ্জয়িনী মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, ৩০ নভেম্বর ২০১২
দূরত্ব মানেই নিছক আকাশের সঙ্গে তোমার বাড়ির ভৌগোলিক পথটুকু নয়, আবার দূরত্ব একা আন্দামানের পুঞ্জীভূত দীপপুঞ্জের সঙ্গে বিরাটকায় ভারতবর্ষেরই শুধু নয়। আমার মন থেকে তোমার মন অব্দি টাঙিয়ে রাখা ব্রিজটিতে যখন ভাঙন ধরে, তখন তাকেই আমি বলি দূরত্ব। দুটো মনের মাঝের তারে যখন একই সুর ধরে না, সেটাকেই বেশ স্বচ্ছন্দে দূরত্ব বলে চেনা যায় কিন্তু! সমস্যার ব্যাপার, এরকম দূরত্ব আজ চলতি সময়ের কলকাতার ঘরে ঘরে। প্রত্যেকটি বাবা-মার সঙ্গে প্রত্যেকটি সন্তানের আজ এমনই দূরত্ব।
এই যেমন হালতুর মোড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও অটো, ট্যাক্সি কিছুই পেল না দিয়া! ঘড়ি জানান দিচ্ছে, সাড়ে দশটা বাজে... বাড়ি থেকে অন্তত পনেরো বার ফোন চলে এসেছে এর মধ্যেই। দিয়া যে রাত করে বাড়ি ফেরে না, এটা নয়। কখনও সত্যিই পড়াতে গিয়ে, কখনও আবার পড়ানোর নাম করে নিজের দমিয়ে রাখা ইচ্ছেগুলোকে আশকারা দিতে গিয়ে তার দেরি হয়েই থাকে। কিন্তু ইদানিং বাবা মা একটু বেশিই চিন্তিত; রাজ্যে বেড়ে চলা বিভিন্ন ঘটনার জন্য না... তাঁরা চিন্তিত দিয়ার সঙ্গে তাঁদের বেড়ে চলা দূরত্বে। অত্যন্ত খোলামেলা পরিবার হলেও ইদানিং দিয়ার বাবা-মা বুঝতে পারেন যে, একমাত্র মেয়ে তাঁদের সব কথা খুলে বলে না। অন্য ঘর থেকে তাঁরা রাতবিরেতে শুনতেও পেয়েছেন তারস্বরে চিৎকার, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ। জিগ্যেস করলেও কোনও উত্তর পাওয়া যায় না দিয়ার কাছ থেকে। তবে এরকমটা খালি যে দিয়ার বাড়িতেই হচ্ছে, তা ভাবলে কিন্তু ভুল হবে।
শহর কলকাতার প্রায় সব বাড়ির-ই অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যাবে এমন কিস্যা। দূরত্ব কি শুধু হাওড়া ব্রিজের সঙ্গে টেমস নদীর হয়, নাকি দূরত্ব হয় পাঠ্য বইগুলির সঙ্গে আনমনা কিশোরীরই শুধু? বাবা-মা আর তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও ক্রমশ গড়ে উঠছে এমন দূরত্বের প্রাচীর। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর ঘরকুনো ঋজু দিনের পর দিন কেন বাড়ি ফেরে না, তার বাবা জানেন না। প্রশ্ন করলে 'প্রোজেক্ট ওয়ার্ক' বলে চলে যায়। একসময়ে প্রাণবন্ত মীরার বাড়ির লোক জানেন না যে, সে দিন দিন আরও চুপচাপ কেন হয়ে যাচ্ছে। এটাকেই আজকের মডার্ন লোকেরা বলছেন 'communication gap'।
আর বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক রিসার্চ বলছে যে, এই প্রক্রিয়া খুবই সুলভ আজকের পৃথিবীর যে কোনও পরিবারে। ছেলেমেয়েরা কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখলেই বেশির ভাগ পরিবারে দেখা যায় এই সমস্যা- যেখানে দিয়া বলতে পারে না তার প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে তার বদলে যেতে থাকা সম্পর্কের কথা... মীরা বলতে পারে না বাবা-মার ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে তার ভেতরে ভেতরে গুমরে মরার কথা... ঋজু বলতে পারে না তার নতুন বন্ধুদের সঙ্গে করা নতুন নিষিদ্ধ নেশার কথাটাও মাকে অবলীলায়। তবে এই 'গ্যাপ'-টা মিলিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটা কিন্তু শুধু বাবা-মা বা শুধুই ছেলেমেয়ের নয়। প্রথমে আসি বাবা-মার পালনীয় দায়িত্বের কথায়! তাদের এই বয়ঃসন্ধির সময়ে বুঝদারভাবেই পাশে থাকতে হবে... তার পূর্ণ স্বাধীনতাটুকু দিয়েও সময়ে সময়ে বুঝিয়ে দিতে হবে সন্তানকে যে, তার যে কোনও দরকারে পাশে আছেন আপনারা। আর সন্তানদের জন্য বলা যায়, সামলাতে না-পারা সমস্যার সম্মুখীন হলে কী আর হবে ইগো-জেদ-একগুঁয়েমি নিয়ে বসে থেকে, তার চেয়ে মা-বাবাকে একটু মন খুলে কষ্টটা বললেই তো হয়! কথা বললেই কিন্তু দূরত্ব আপসে কমে যায়; একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?













