চলতি হাওয়া

শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর?

অনির্বাণ চৌধুরী
কলকাতা, ২০ ডিসেম্বর, ২০১২

world end day 2012

মানুষ তো বেঁচে থাকতেই ভালবাসে। ছবি- গ্রাফিক্স

নাহ্! আমি যখন নিশ্চিন্তে বসে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে জনচিত্ত বিনোদনের জন্য এই লেখাটা লিখতে পারছি; তখন আগামী কাল পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। সারা বিশ্বে যদিও কিঞ্চিৎ দোলাচলতা দৃশ্যমান; আমার শহরে বয়ে চলেছে সেই গতানুগতিক জীবনই! সব কিছু আছে সেই আগের মতন; ‘সকলই শোভন সকলই বিমল’। তাছাড়া সকলেই সকলের দিকে আড়চোখে দেখে, দেওয়ালের গায়ে ছায়া ফেলে জলের কোলাহলও অক্ষুণ্ণ। এখন সে সব ‘মরুক গে যাক’ মনোবৃত্তির সন্তান, নাকি ‘শেষের আগে আরেকটি বারের’ মরিয়া অবচেতন- সেটা কূট তর্কের বিষয়।

তাই বলে মায়া সভ্যতার সুপ্রাচীন সময়পঞ্জীটাকে দাঁত বের করে উড়িয়ে দিতেও মন নারাজ। এখন মৃত সভ্যতা হলে কী হবে, একটা সময়ে ওরাই তো সভ্যতার একটা বড় অংশকে চিনিয়েছে সোনা-চকোলেট-কফি আর ভুট্টার মূল্যমান! তাছাড়া যে সভ্যতা এখনও সারা বিশ্বে সুসংহত স্থাপত্য স্থাপনের নজির- তার সাবধানবাণী একটু অন্তত বিচার করে দেখাই উচিত।

‘পোপোল ভুহ’ এবং তার অন্তর্গত সময়পঞ্জীর মতে, এর আগে তিনটি যুগ এবং তিনটি সৃষ্টিধ্বংস পেরিয়ে এসেছে এই সুপ্রাচীন সভ্যতা। ভারতীয় পুরাণমতে যেমন সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর আর কলি এই চার যুগে পৃথিবীর বয়সের শ্রেণীবিন্যাস, ‘পোপোল ভুহ’-তেও অনেকটা তাই। তো, সেই তিনটি যুগ পেরিয়ে এই বহতা চার নম্বর যুগটিও ধ্বংস হবে আগামী কাল ২১.১২.১২. তারিখে- এমনটাই সেই সময়পঞ্জীর ভবিষ্যৎবাণী। কিন্তু সেই সময়টা গোনা হচ্ছে কীভাবে?

আজটেক সময়পঞ্জী আদতে তৈরি হয়েছে একটা ‘ক্যালেন্ডার রাউন্ড’ হিসেবের ওপর। সেই মতো, একটা নির্দিষ্ট মাসের নির্দিষ্ট দিনকে ধরে এক-একটা যুগের সমাপ্তি; যা কিনা এক-একটা নির্দিষ্ট বহতা সময়ের ব্যবধান বা ‘বাকতুন’-এর নিরিখে অনস্বীকার্য। সেই হিসেব বলছে, ১৩ নম্বর বাকতুন-এ পৃথিবী ধ্বংস হবে। আজটেকমতে একটা বাকতুন-এর পরিধি ৩৯৪ বছর। আর ১৩টা যেহেতু ওদের পবিত্র সংখ্যা; তাই সেটাতেই পৃথিবী সমাপ্ত- এমনটাই ধরে নেওয়া হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, সেই ১৩ নম্বরি বাকতুন-এর শেষ দিন আগামীকাল। বিশ্ব সেটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকলেও কলকাতা কিন্তু নির্বিকার।

আসলে স্পেনীয় আগ্রাসনের পর আজটেক ক্যালেন্ডার যে আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, সেটা বোধহয় হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পেরেছে কলকাতা। তাই কেউই আতঙ্কিত নয় পুরনো হিসেব ধরে পরিণামে; কারওর-ই তেমন হেলদোল নেই ২১.১২.১২ তারিখটা নিয়ে। রোজ আমায় কফি এনে দেয় সুশান্ত বলে যে ছেলেটা, যে কফি কিনা মায়াদের-ই জিনিস, তাকে খবরটা বলতেই ছোকরা তো হেসে কুটিপাটি!

‘হলে তো ভালই হয়, কাল থেকে আর আসতে হবে না কাজে! তাছাড়া এক একটা দিন কিচ্ছু ভাল লাগে না, এসব শেষ হলে বাঁচা যাবে’, অকপট জীবন-দার্শনিকতা উগরে দিল বছর বারোর সুশান্ত। এখন, আজ যে সারা ভারতে ব্যাঙ্ক বন্ধ ধ্বংসের ঠিক আগের দিন, সেটাও কি এই এক গতানুগতিক জীবনচর্যার ফসল? হলে অবাক হব না। আজ দিনমানে ও রাতবিরেতে ফূর্তি সেরে কর্মচারীরা যখন আগামীকাল ব্যাঙ্কে কাজ করতে ঢুকবে, তখন পৃথিবী ধ্বংস হোক আর নাই হোক- বেশির ভাগেরই যে মনের উৎসাহ দিনগত পাপক্ষয়ের পরে ধ্বংস হয়ে যাবে, এ আর কে না জানে!

তা বলে ব্যতিক্রমও কি কিছু নেই ধ্বংসের ঠিক আগের দিনের কলকাতায়? আলবাত আছে। খেয়াল করতেই চোখে পড়ল রোজকার তুলনায় আজ একটু বেশি সেজেগুজে পথে বেরিয়েছে মানুষ; অধিকাংশ পুরুষের গালে দাড়ি আর নারীর গালে মেক-আপ যদিও আগের মতন! এই ব্যাপারটাকে অবশ্য সমাপতন অথবা পৃথিবীর পাতন কোনওটাই না বলে আসন্ন বড়দিনের উৎসবের মেজাজ বলাই ভাল। আর সেটাকেই সমর্থন করছে কলকাতার একটা আইটি ফার্ম-এর অ্যাসোসিয়েট রুদ্রদেব মুখোপাধ্যায়-এর জবানবন্দী, ‘কোনও অ্যাঙ্গেল থেকেই কাল পৃথিবী ধ্বংস হবে না! আমি শুধু এটুকু জানি, কাল আমার ছুটি আছে আর আমি পার্টি করব’।

তবে সারা পৃথিবীর অবস্থা কিন্তু এমন নির্বিকার নয়। চিনে আর রাশিয়ায় বিশেষ কমিটি বসেছে পৃথিবীর নিরাপত্তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার জন্য। মার্কিন মুলুকে ঢেলে বিকিয়েছে ‘আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার উপায়’ শীর্ষক বইয়ের হাজার হাজার কপি। ৩০,০০০ রুবল-এর বিনিময়ে রাশিয়ায় কিছু সংখ্যক মানুষ ঠাঁই পেয়েছে স্তালিন আমলের ২০০ ফুট নিচের মাটির তলার বাঙ্কারে। আর মায়াদের চারণভূমি মেক্সিকো-তে তো শুরু হয়ে গিয়েছে উৎসবের মেজাজ। আজ আর কাল- এই দুটো দিন তারা পালন করছে বড়দিন আর বছরের পয়লা দিনের মতন। পাশাপাশি, ‘পোপোল ভুহ’ অনুসারে মেক্সিকোতে যা যা হবে, সে সব দেখার জন্য কাতারে কাতারে সেথায় ভিড় জমিয়েছে আমোদগেঁড়ে পর্যটকের দল। একটি হোটেলও আর খালি নেই সেখানে। প্রাণের মায়া উপেক্ষা করেই ‘মায়া’-র খেলা দেখতে এমন লোকসমাবেশ।

আসলে মানুষ তো বেঁচে থাকতেই ভালবাসে। যে তার পরপারটিকেও ব্যাখ্যা করেছে পৃথিবীরই আদলে, সে যে ধ্বংসের দিনটাতেও যথা সম্ভব ফূর্তি করে নিতে চাইবে, তাতে আর আশ্চর্য কী? এমনকি সেই কবে থেকে হাজার হাজার মানুষের মন মাতিয়েছে যে গ্রিমভাইদের রূপকথা, তারও ২০০ বছরের বর্ষপূর্তি ধ্বংসের এই আগের দিনে। তাই রূপকথার উৎসবের মেজাজেই আছে সারা দুনিয়া। তালে তাল মেলাচ্ছে না কেবল এই শহরই। আসলে ওই যে ঠাকুর বলে গিয়েছেন না ‘সেই সত্য যাহা রচিবে তুমি’-র মতো অমোঘ বাণী- কলকাতা আছে কলকাতাতেই!

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন