চলতি হাওয়া

স্বদেশি মধুচন্দ্রিমা

গুলশনারা
কলকাতা, ২২ ডিসেম্বর, ২০১২

honeymoon in own country

পার্টনারকে তাক লাগিয়ে দিতে চায় এই প্রজন্ম। ছবি- ফাইল চিত্র

'না না। ফরেন ট্রিপ? পাগল নাকি? আগে নিজের দেশটা ভাল করে দেখি। বিদেশে গিয়ে অচেনা জায়গায় নিজেদের মোটেও খুঁজে নিতে পারব না। তার চেয়ে সাউথ বা নর্থে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে আছে। হানিমুন চেনা দেশেই ভাল। অচেনা মানুষটাকে চিনে নেওয়ার জন্য খানিক চেনা সীমানার দরকার আছে'- আগামী ফেব্রুয়ারিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে হানিমুন নিয়ে এমনটাই প্ল্যান সুদেষ্ণা ঘোষ-এর।

এখন এই বিয়ে মরসুমে সানাই-চন্দন মাখামাখি হয়ে হানিমুনের প্রসঙ্গ বড় বেশি মনে উঁকি দেয়। এযাবৎ কালের নিষিদ্ধ সমস্ত কিছুর সামাজিক স্বীকৃতির পরোয়ানা হাতে, বন্ধুদের ইতিউতি ছুঁড়ে দেওয়া গায়ে মেখে বেরিয়ে পড়া আর চিনে নিতে চাওয়ার নাম হানিমুন। সবটাই মিষ্টি। চশমার ফাঁক থেকে কাকু-জেঠুরা ভুরু তুলে বলতেই পারেন, মিষ্টি ছিল আমাদের সময়ে। খোলামেলা এ প্রজন্ম চিনে নেওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলতে বিয়ে-সপ্তপাকের ঘেরাটোপের অপেক্ষায় আর থাকে না। কিন্তু তবু হানিমুন মানেই সেকাল থেকে একাল- বড় বেশি আবেগপ্রবণ। অচেনা এক ঝলক দেখা তরুণী স্ত্রী হোক বা ছোটবেলার বন্ধুকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়া হোক, এই হানিমুনে নিজেকে সেরা রোম্যাণ্টিক মানুষ হিসেবে প্রমাণ করার কসুর ছাড়ে না কোনও প্রজন্মই।

তারই প্রথম চমক তো দেশ খোঁজায়। যেখানে ঝরণার গায়ে হাত পাতলে সারা বছর রামধনু এসে পড়ে, বা রিসর্টের উত্তর জানালা খুলতেই ওই দূরে বরফ-সোনালি পাহাড় হাসছে- প্রকৃতির এমন আজব কারখানার খোঁজ হানিমুনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এমনিতেই বড় বেশি পাশ্চাত্যপ্রেমী হওয়া নিয়ে জেন-ওয়াইয়ের ঘাড়ে সেকালের তিরষ্কারের নিশ্বাস কম পড়ে না। এমনকি, বিয়ের নিয়ম-কানুন সংক্রান্ত হরেক বায়নাক্কা নিয়েও ঝামেলা আছে বইকি। কিন্তু হানিমুনের ক্ষেত্রে স্বভাব বদলে জেন-ওয়াই যেন আজকাল বড্ড বেশি স্বদেশি। তাই আজকাল আল্পস-আন্দিজের বদলে হিমালয়ের কোল বা দুবাই-সিঙ্গাপুর ছেড়ে কাশ্মীর বা বাংলারই অচেনা কোনও প্রান্তরে মধুচন্দ্রিমার বুকিংয়ের অর্ডার আসছে ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর কাছে।

বছর পাঁচ-দশ আগেও হিন্দি সিনেমার রূপকথা তুল্য বিয়ে মানেই বর-বধূর সুইজারল্যান্ড বা নিদেন পক্ষে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় উড়ে যাওয়া। ফলে আম-জনতার হানিমুন ট্রেন্ড তখন ওভাবেই সেট হয়েছিল। ভূস্বর্গ নাম নিয়েও কাশ্মীর তখন ব্রাত্য। ব্যাঙ্ক লোন করে দুবাই-সিঙ্গাপুরে জড়িবুটির মাসাজ আর স্ট্রিপটিজ নাচ দেখা আর ঘোমটা ছেড়ে হট প্যান্ট পরার স্বাধীনতার নামই ছিল হানিমুন। একটু রেস্ত বেশি মানেই সুইজারল্যান্ড-লন্ডনে, নবদম্পতির মাঝে সাদা চামড়ার পথচারীকে জোর করে দাঁড় করিয়ে দন্তবিকাশময় ছবি। সে ছবি ল্যামিনেটেড হয়ে ড্রইং-রুমে জায়গা পেত। না না, মধুচন্দ্রিমার মধু বিতরণের জন্য নয়। অতিথির কাছে এই প্রমাণার্থে যে বিদেশভ্রমণ নয়, এই যাত্রায় খাস বিলিতি বন্ধুও বড় কম হয়নি।

নানা অভিযোগের শিকার হলেও, একেবারে হটকে এই জেনারেশন কিন্তু এই শো-অফের ব্যামো থেকে একেবারেই মুক্ত। শরীর চেনার গন্ধ যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই আগে মিটে যায়, তাই কয়েকটা দিন চেনা মাটির স্বাদ নিতে নিতে অচেনা মনের কোণ খোঁজার মোহের নামই, এই প্রজন্মের কাছে মধুচন্দ্রিমা। এখানে নব বিবাহিতা স্ত্রীকে নায়াগ্রা দেখানোর বড়াইয়ের চেয়ে, কেরলের নিসর্গ ব্যাক ওয়াটার বা কাবের উৎসের নিশ্চুপ বনের মাঝে হাতে হাত ধরে ইতিহাস খুঁজে নেওয়ার বাসনা বড্ড বেশি। বেদব্রত পাইনের 'চিটাগং' রিলিজের পর, পূর্বপুরুষের ভিটেয় দিন কয়েক কাটানোর হানিমুনের সংখ্যাও কম নয়।

ম্যাকাও ট্র্যাভেল এজেন্সির পক্ষ থেকে বন্দিতা রায় জানাচ্ছেন, 'এটা সত্যিই যে ইয়ং জেনারেশন এখন ফরেন কান্ট্রির চেয়ে দেশের মধ্যেই কোথাও শান্ত-নিরিবিলি জায়গার খোঁজ করে। প্রথমত অফিস থেকে ছুটি কম পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, চেনা দেশের মধ্যেই কত অচেনা সুন্দর জায়গা আছে, এটা দেখিয়েও পার্টনারকে তাক লাগিয়ে দিতে চায় এই প্রজন্ম। দুবাই-সুইজারল্যান্ড-জাপানে ফ্যামিলি ট্রিপ অনেকেই করেন। কিন্তু হানিমুনে দেশের মধ্যে যাওয়ার ট্রেন্ডটাই বেশি।' ঠিকই তো। শেয়ালদা থেকে চারটে স্টেশন পরে জমিদার বাড়ির ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখার মধুচন্দ্রিমার বিস্ময় যে অনেক বেশি মধুময়!

 

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

পাক্কা ঘুঘুর মেয়েবাজি

এসকেমুভিজ

দেখেছেন 69 জন

হক কথা বললেন অনুব্রত

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 314 জন

ইডি, কমিশনকে জ্ঞান দিলেন পার্থবাবু

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 206 জন