চলতি হাওয়া

মতির ঘরে মারিজুয়ানা

আবীর মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১২

marijuana

দম মারো দম/ মিট যায়ে গম। ছবি- হরে রাম হরে কৃষ্ণ ছবির একটি দৃশ্যে জিনাত আমন।

জিনাতকে মনে আছে? লিডো রুমের প্রশস্ত ক্যাবারে মঞ্চে পঞ্চমের সুরে নৃত্যরতা, উষ্ণ কবুতর বক্ষ-বিভাজিকায় লজ্জা-চৌচির স্বল্পবসনা জিনাত? অথবা, সত্তরের ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবিতে রোদ চশমায় চোখ ঢাকা জিনাতের সেই স্বপ্নদৃশ্যটির কথা স্মরণ করুন! আপামর শুখা সেবনকারীর মতো এই দৃশ্যটি আমার খুব প্রিয়। দ্বিধা-জর্জর জীবন ভেঙে যখনই কোনও বন্ধুনিকে দেখি ছিলিমে মারিজুয়ানার সুড়ঙ্গে লালি আঁচ তুলতে, কানে ভেসে এসে লাগে হিসহিসে মুখড়ার সেই দোলন গান, ‘দম মারো দম/ মিট যায়ে গম’। ছিলিম ধরানোর আগে কলকে সাজার যেমন ঝিলমিলে একটি গাল-গল্প থাকে, শহরের চলতি হাওয়ার মরশুমে গঞ্জিকা সেবন ও তার ধুম নেশার গল্পের আগে, এইটে তেমন ধরতাই!

নিজের গল্পে, হালফিলের পট মানে গাঁজা বা মারিজুয়ানার নেশার আগে, শুখা পর্বের হাতেখড়ি হয়েছিল একেবারে সহজপাঠের বয়সে, আমার পিতৃপুরুষের গ্রামে। হয়তো এমন করেই হয় সবার প্রথম নেশাপাঠ। তো কেমন সে নেশাখড়ি?

দেখুন গ্যালারি : গ-এ গঞ্জিকা

স্কুল-ছুটের দুপুর গড়িয়ে ফিরতি পথে খেজুড় গাছের বন-বাদাড় থেকে সংগ্রহ করতাম মাকড়সার জালের মতো সাদা এক ধরণের আঠা। তারপর বেশ কিছুটা সংগ্রহ হয়ে গেলে, হাতের তালুতে নিয়ে একটু মেখে নিতাম খৈনির মতো। কোনও বন্ধু এই অবসরে তালপাতা দিয়ে পাকিয়ে সযত্নে একটি কলকে বানিয়ে দিত। যার মাথায় একটি বাবলার কাঁটা লাগানো থাকত, যাতে পাতার কলকে পাক খুলে না যায়। এরপর সেই আঠার মশলা তালপাতার কলকের মধ্যে ঠেসে দিয়ে নিরিবিলি সুখটান চলত মাঠের আলে বসে। শেষ বিকেলের নিভৃতিতে এই ছিল নিজের জীবনে শুকনো নেশাপাঠের হাতেখড়ি!

অজয়ের স্রোত ছোঁওয়ানো এঁদো গ্রামের আলপথ থেকে কলকাতার রাজপথ- এই পথটুকু পার হতে গিয়ে তেত্রিশ ছুঁই-ছুঁই বয়সে কত নেশা আর নেশাখোরের সঙ্গেই তো আলাপ হল। মহাকাব্যের মধুমাধবী না হোক, ‘ছটাক সোডার জলে পাকী তিনপোয়া হুইস্কি’ সেবন করে কত গুণিজনের বাকতাল্লাও শুনলাম। কিন্তু পাতার ছিলিমে মুখ ডুবিয়ে, মেঠো আলপথের সেই বৈকালিক আখড়ায় বসে, নেশার ধুমকিতে সহজিয়া মানুষের যে গহন কথায় মাতন, তেমন নেশা আর ফিরে পেলাম কই!

শহুরে নেশা-নক্সার বাবু বৃত্তান্তে পাই, কলকাতায় গোপনে গঞ্জিকা সেবনের সিলসিলা বেশ পুরানো। তবে, চলতি সময়ে যখন থেকে লোকগান নিয়ে মাতামাতি শুরু হল মহানগরে, সম্ভবত সে সময় থেকেই ‘এলিট’ নেশার খেতাব জুটল গ্রাম্য গঞ্জিকার। আর এখন তো এই নেশা বস্তুটি চর্চার বাড়-বাড়ন্তে রীতিমতো উচ্চমার্গে জায়গা করে নিয়েছে। সুখদার এ শুখা মশলার কথা এদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে থাকলেও এ কথা সবার জানা, মারিজুয়ানার অত্যধিক সেবনে স্মরণশক্তি হ্রাস হয়। তথাপি এও সুবিদিত তাবৎ দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিলোত্তমার বুকের খোন্দলে হালফিলের আড্ডা জপাতে জুড়ি মেলা ভার হজম-ফ্রেন্ডলি, সহজ সাধ্য এই মারিজুয়ানার।

উইকি-ইতিহাস বলছে, গঞ্জিকার রমরমা পৃথিবীর নানা দেশে, বিচিত্র নামে। গঞ্জিকার দেহ ও পল্লব এই উপমহাদেশে গাঁজা নামে পরিচিত হলেও, একই জিনিস পশ্চিমের দেশগুলিতে মারিজুয়ানা বা মারিহুয়ানা নামে পরিচিত। আবার একই গাছের পাতা বা ডালের আঠালো রস-কষ দিয়ে তৈরি বস্তুর নাম চরস। পশ্চিমে কোথাও কোথাও একে হাশিশ-ও বলে। এ থেকেই ‘হ্যাশ অয়েল’। এর বাইরে রয়েছে গাঁজার বিচিত্র নাম। পাট্টি, সব্জি, গ্রাস, মাজুন, পট, রকেট, শুকনো মশলা, ছিলিম, রিফার বা জয়েন্ট ইত্যাদি। অধুনা নিষিদ্ধ হলেও, পূর্ববঙ্গের নওঁগা জেলায় সমবায় সমিতির মাধ্যমে সরকারি নিয়ন্ত্রণে গাঁজার চাষ হত একসময়।

শুধু রজনীবিলাসের ঠেক নয়, খাস কলকাতা ও প্রায় সমস্ত জেলায় দ্বিপ্রহরেও পটের নেশা এখন দারুণ জনপ্রিয়। চট জলদি নেশা জমাতে ছিলিম ছেড়ে শুকনো মশলা শুয়েছে সফেদ স্বপ্ন সিগারেটের টানেলে। বিড়ি বা সিগারেটের মোড়কে মারিজুয়ানা কলকাতার ক্যাম্পাসে দিবা-নিশি পটের ঠেকে কদর বাড়িয়েছে যা জয়েন্ট, রিফার বা পট নামে। ‘গেট-ওয়ে ড্রাগ’,- এই গঞ্জিকা সেবনে অনেকে পাইপেও সিদ্ধ।

ফ্রান্সের বায়োমেডিকেল ইনস্টিটিউট- এর গবেষকরা ব্যথানাশক হিসেবে গাঁজা বা মারিজুয়ানাকে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াহীন ওষুধের শিলমোহর দিলেও এখনও বেশিরভাগ দেশেই এর বিকিকিনি ও সেবন নিষিদ্ধ। কেন না, গাঁজার মূল নেশা উদ্রেককারী উপাদান ডেল্টা-৯-ট্রেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল বা সংক্ষেপে টিএইচসিতে ক্ষতির দিকটিই প্রধান হিসেবে দেখছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। টিএইচসি-র পরিমাণই নাকি নেশার অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এদেশে গুণগত মানের নিরিখে এবং মশলার সাকিন হিসাবে অরুণাচল পাহাড়, দিল্লি এবং গুজরাটের গঞ্জিকা রয়েছে শীর্ষ তালিকায়। গোপনে রাজ্যের সুন্দরবন অঞ্চলেও কিছু চাষ হয়। কলকাতার গাঁজাড়ি বা স্কোরারদের গন্তব্য অবশ্য কালীঘাট, রাসবিহারী, বন্ডেল গেটে-ই সীমাবদ্ধ। অবশ্য, কেউ কেউ নর্থের হাড়কাটা গলিও যান। মেলে সুখা-সন্ধান।

সমঝদার শ্রোতা যেমন কালোয়াতি গানের ওস্তাদি চলনের কদর বোঝেন, সুখদার একটি সুখটানেই মহতী নেশাখোর সমঝে জান মারিজুয়ানার দ্রব্যগুণ। রসিক জনের কেউ কেউ আছেন, স্রেফ গন্ধ বিচারেই বলে দিতে পারেন গঞ্জিকার ঔরসজাত সাকিন, মণিপুরি নাকি মোরাদাবাদি! কেউ আবার শুখা পল্লবের যৌন-জড়ি প্যাঁচ দেখে দিব্য বলে দেন বুকের হাপড়ে পাতার দম! উইকি জানাচ্ছে, মারিজুয়ানার মধ্যে মাদক উপাদান টিএইচসি-র পরিমান গড়ে শতকরা ০.১ থেকে ৫.০ ভাগ, হাশিশে বা চরসে ০.২ থেকে ১০.০ ভাগ। অভিজ্ঞতা বলছে, এর সবটা আবার ঠিক নয়। রাত আখড়ায় বসে এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরতে থাকা ছিলিমের নেশায় দম কথাটাই আপেক্ষিক। কখনও তা ধুমকি জাগায় সঙ্গচারি মনে। কখনও নিঃসঙ্গতায় বুঁদ হতে বলে!

আমার নিজের বিশ্বাস, মারিজুয়ানা বা গাঁজার নেশা বেশিরভাগটাই নির্ভর করে বানানোর উপর। এখন বহুজনকে দেখি মারিজুয়ানার বানানোর সরঞ্জামের একটি পৃথক ডাব্বাও সঙ্গে রাখতে। সরঞ্জাম বলতে, একটি বড় টিফিন কৌটোর মধ্যে একটি ছোট কাঁচি, স্টিলের একটি ছোট্ট ছাঁকনি আর রান্না-বাটির মতো বেশ কয়েকটি ছোট ছোট কৌটো। এগুলোর ভিতর গাঁজার সঙ্গে মেশানোর জন্য রাখেন নানা ধরনের পচ্ছন্দসই ‘ইনগ্রেডিয়েন্টস’। মানে উপরি মশলা। দোকতা পাতা, তামাক, বিড়ি বা সিগারেটের মশলা, পিপার অয়েল, দু'-তিন ধরনের সুগন্ধী তেল, দীর্ঘ সময় সাদা মদে ভেজানো জটামাংসীর শিকড়ের রস, কিমাম, সুগন্ধী জর্দাগুঁড়ো, জায়ফল প্রভৃতি। এসবের মিললিশে শুখা নেশা হয় সুখদার!

এ প্রজন্মের অনেককে দেখি বাহারি ছিলিম সংগ্রহ করতে। তবে কলকে হলে অবশ্যই মাটির কথা প্রথম বলব আমি। সুদীর্ঘকাল ধরে যাঁরা এই নেশাটি করছেন, তাঁদের অভিমত, ‘কেতের জন্য কেউ কেউ ধাতব বা পাথরের কলকে ব্যবহার করেন, কিন্তু তাতে গরম হয়ে যায় পর পর ছিলিম সাজলে’। বহু সহজিয়া আউল-বাউল-ফকির-দরবেশকে দেখেছি মাটির কলকেয় একটুকরো পাথরের ঠিকরি দিয়ে লালশালুতে মুখ রেখে বেদম টানে দপদপিয়ে আগুন জ্বালাতে। আট কুঠুরি, নয় দরজা ঘুরেও সে আগুন নেভার নয়!  

সত্যি কথা কী, প্রথম দিনের সেই নবিশ-নেশার উড়ান ভূমি থেকে যে ওড়াউড়ি শুরু হয়েছিল সে নেশা অফুরান। দিক শূন্যপুরের দিকে নেশাতুর মনের উড়ান। হয়তো সেই কারণেই নেশার অনন্ত আকাশে উড়তে উড়তে এখনও স্বপ্নে অজয়ের স্রোত ছোঁওয়ানো গ্রাম থেকে পৌঁছে যাই জয়দেব-কেঁদুলির মকর সংক্রান্তির হিমভোরে। বাকিটা, অমরতাকে সাক্ষ্য করে কুয়াশা ঝরে পড়া একটি ফ্রেম। দেখি, পবিত্র নিশিভোরে যেই ফ্রেমে এক সাগরপারের বাউলানি চিনেবাদামের মতো বিশুষ্ক ঠোঁটে নিবিড় লোলুপতায় ঠোঁট রেখে ধোঁওয়া দিচ্ছে চৈতন্যে। কুহকী সাধনে বাউল-সঙ্গিনীর আলগা ঠোঁট থেকে আমার হাঁ-মুখের অলি-অন্দরে সেই ধোঁওয়ার সঙ্গে একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে সহজিয়া জীবনের বোধিমন্ত্র। কে বলতে পারে, সে হয়তো বা মতির ঘরে মারিজুয়ানার মহার্ঘ্য নেশামন্ত্র!

 

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

হক কথা বললেন অনুব্রত

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 248 জন

ইডি, কমিশনকে জ্ঞান দিলেন পার্থবাবু

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 163 জন

লাভপুর বিস্ফোরণে দায়ী ফব না তৃণমূল?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 160 জন