চলতি হাওয়া

মিঠে পিঠে পুলি

পৌষ সংক্রান্তির চলতি হাওয়ায় আজ যখন বাঙালির ঘরে ঘরে পিঠে-পায়েসের উষ্ণ সুবাস, ঠিক তখনই স্মৃতিতে ফিরে এল এই রন্ধনশিল্পের পালিকাদের স্মৃতি। বাঙালি যে মিষ্টিমুখের এই ঘরোয়া উপায় পাতে বেড়ে দিতে এখন প্রায় অক্ষম। লিখছেন কল্লোল লাহিড়ী।

কল্লোল লাহিড়ী
কলকাতা, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৩

poush sangkranti pithepuli

ছোট নাতির জন্যে তখন এক এলাহি আয়োজন করে ফেলেছে দিদা। ছবি- ফাইল চিত্র।

সর্ষে ক্ষেত যখন নীল দিগন্তে ফুলের আগুন ছড়িয়ে দিত, সজনে গাছগুলো যখন বরফ ঝরার নিস্তব্ধতায় সাদা ফুলের পাপড়ি ওড়াত, মাধু বৈরাগী নিকানো উঠোনে এসে যখন লালনের গান গাইত, ঠিক তখনই গফুর চাচার আসার সময় হত। ইচ্ছামতীর তীর ধরে সেই শীতের কুয়াশাভরা সকালে গফুর চাচার সাইকেলের পেছনে বসানো থাকত একটা বড় মাটির কলসি। নিজের কাঠের হাতা দিয়ে মেপে মেপে সেই কলসি থেকে গফুর চাচা গলানো সোনা রঙের মৌঝোলা গুড় তুলে দিত দিদার পদ্মকাটা কাঁসার বাটিতে। আমি পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতাম কখন এক ফোঁটা দু'ফোঁটা পড়বে কলসি থেকে, বাটি থেকে, কাঠের হাতার নিখুঁত পরিমাপের নিক্তি থেকে। আর আমি সেই গুড় চেটে খাওয়ার আনন্দ পাব। তখন নিজেকে বাড়ির জানলার কোণের গভীর সুড়ঙ্গে থাকা ডেঁয়ো পিঁপড়েটার মতো মনে হত। হা-পিত্যেস অবশ্য করতে হত না। শীতের ছুটিতে মামার বাড়িতে আসা সবচেয়ে ছোট নাতির জন্যে তখন এক এলাহি আয়োজন করে ফেলেছে দিদা। আর করবে নাই বা কেন? দিনটা যে পৌষ পার্বণ। মিঠে পিঠে পুলি খাওয়ার দিন। তাই সময় নেই মুর্শিদাবাদের লালবাগের গঙ্গার ধারে থাকা পঞ্চাশ পেরনো সেই মেয়ের। যে একদিন তার বাবার বিশাল কোঠাবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল আড়বেলিয়ার মতো অজ গাঁয়ে, পোর্টের এক কেরানিকে নিজের বর হিসেবে মেনে নিয়ে। চলে তো এসেছিল দিদা; কিন্তু সঙ্গে নিয়ে এসেছিল আমাকে আদর করে খাওয়ানোর জন্যে সরু চাকলি, চিতল পিঠে, পাটি সাপটা, রস বড়া, আনন্দ নাড়ু, আরও কত কত রকমের রান্নার সহজ সরল গেরস্থালি।

ফুলেভরা সজনে গাছের নিচেই দিদার ছোট্ট মাটির উনুন। অল্প অল্প করে দেওয়া শুকনো খেজুর আর নারকেল পাতার আগুনে লোহার চাটু তেতে উঠছে। আর সেই ঢিমে আঁচের উনু্নে দিদা আমার একের পর এক ভেজে চলেছে পাটি সাপটা। ঢেঁকিতে কোটা, জাঁতাতে ভাঙা নতুন চালের প্রলেপের ওপর ঘন হয়ে পড়ছে নারকেলের পুর। পিঠের ছ্যাঁক-ছুঁক আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিদা বলে চলেছে উমনো ঝুমনোর গল্প। সতর্ক নজর থাকছে, এঁটো হাতে পিঠের কৌটো ধরছি কিনা সেই দিকেও। কারণ পুজোর পিঠে তুলে রাখার আগেই তো সব আমার পেটে যাচ্ছে। মোক্ষদা গরু দুইয়ে, গা মুছিয়ে, গোয়াল ঝাঁট দিয়ে বলে যাচ্ছে, ওবেলা আমাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবে। সে ‘আষ্টে পিঠে’ করেছে। 'এমা, আষ্টে পিঠে জানো না? মৌঝোলা গুড়ে ডুবিয়ে খেতে হয়'। দিদা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছে 'পেট ব্যথা করছে না তো টুকনু'?

'পেট ব্যথা? ফুঃ! সবে ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে উঠেছি আর কিছুদিন পরেই দাদার মতো গোঁফ হবে। তখন দেখো, আমি নিজেই কেমন তড়বড় করে উঠে যাব নারকেল গাছে পাঁচু কাকার মতো। একা একাই তোমায় নিয়ে যাব আমাদের বালীতে। মাকেও আসতে হবে না। দাদাকেও না। বাবাকেও না'। দিদা হেসে লুটোপুটি খায় আমার কথা শুনে। দিদার ইচ্ছা ছিল, থাকুক টুকনু আমার কাছে। আড়বেলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ুক। কিন্তু সেটা কী করে হয়? ওদিকে রিলিফ ক্যাম্পে ছানি কাটিয়ে এসে আমাকে যে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে আর এক বুড়ি। আমার ঠাকুমা।

আমার আর অপু হয়ে বেড়ে ওঠা হয় না সজনে গাছটার সঙ্গে। উমনো ঝুমনো, পিঠে চুরি করা দুষ্টু রাখাল আর চিলেকোঠায় মাঝ রাতে ভয় দেখানো সেই মামদো ভূতটাকে টাটা করে আমাকেও চলে আসতে হয় বালীর বাসায়। পেছনে পড়ে থাকে গফুর চাচা, বসিরহাটের পাটালি, বেনেপাড়ার কাঁচা গোল্লা, দিদার ছলছল চোখ। 'গরমের ছুটিতে আসবি তো টুকনু'? দিদার উত্তরে 'হ্যাঁ' বলে এসেছিলাম। আর যেদিন অনেক ভোরে বাবা, মা, মামা, দাদার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে এলাম আড়বেলিয়া? সেদিনও দিদা পুকুরে চান করতে গিয়েছিল। সেদিনও দিদা সজনে গাছের নিচে উনুন ধরিয়ে ছিল। কিন্তু সেখান থেকে আর উঠতে পারেনি। আস্তে আস্তে বড় জামরুল গাছটার লম্বা ছায়ায়, গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ নিয়ে দিদা চুপটি করে চোখ বুজে শুয়ে পড়েছিল নিকানো মাটির উঠোনে। মোক্ষদা দেখেছিল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বিড়বিড় করে কিছু বলছে দিদা। মোক্ষদা শুনেছিল, দিদা নাকি আমাকে ডাকছিল। উনুনের পাশে চুবড়িভরা ছিল কুমড়ো ফুল। আমি জানতাম, সেদিন দিদা কুমড়ো ফুলের বড়া ভাজত মিঠে পিঠের মতো করে। ওপরের আস্তরণে থাকতো ফুটকি ফুটকি পোস্তর প্রলেপ। দিদা ডেকেছিল, আমরা কেউই তখন সাড়া দিতে পারিনি। এখন যখন কান সজাগ করে পেতে রাখি, তখন আর কেউ ডাকে না।
 
দিদার সঙ্গে সঙ্গে পিঠে-পুলির পাট চুকল পৌষ সংক্রান্তির দিনে। ঠাকুমা কোনও দিন পৌষ পার্বণ উদযাপন করেনি। উদ্বাস্তু পরিবারে আবার বাস্তু পুজো কী? না, হয়নি কোনও দিন লক্ষ্মীপুজো। গভীর অভিমান ছিল নবদ্বীপের মেয়ের। দেশ ছেড়ে আসার পরে আর একদিনও ঢোকেনি রান্না ঘরে। একটিবারের জন্যেও কোনও পছন্দের পদ রান্না করেনি; পিঠে-পুলি তো দূরের কথা। তাই বলে কি পিঠে-পুলি হত না বাড়িতে? হত। কিন্তু দিদার মতো নয়। সেখানে আড়ম্বর ছিল না। উৎসব ছিল না। শুধু হরিণঘাটার দুধের বোতল বাড়তি আসত একটা বা দুটো। আমি হা-পিত্যেস করে বসে থাকতাম তোলা উনুনের পাশে। পাটি সাপটার ছ্যাঁক-ছুঁক আওয়াজে মার দিকে তাকাতাম। মা হেসে বলত, 'কী, হচ্ছে না তো দিদার মতো'?

না, সত্যিই হয়নি দিদার মতো কোনও দিন। হতে পারে না। কেউ চলে গেলে অন্য কেউ তার জায়গা ভরাট করতে পারে না যে। তবু সময় চলে তার নিজের খেয়ালে। সজনে গাছটা এখনও ফুল ফোটায়। টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ে ভাঙা উনুন, মনুষ্যহীন মামার বাড়ির উঠোনে। আর দিদাহীন সকাল বিকেলগুলোয় মিষ্টির দোকানের র‍্যাকে ভর্তি হতে থাকে পাটি সাপটা, মিঠে পিঠে পুলির নানান চমক। কিন্তু সেখানে নেই উমনো ঝুমনো, নেই সেই দুষ্টু রাখালটা। নেই দিদার মন কেমন করা হাসি।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বৃহস্পতিবারের ভোট কোলাজ

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 117 জন

মোদীর মনোনয়ন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 108 জন

ফুটন্ত কড়াই কলকাতা, মৃত দুই

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 160 জন

ঋষি-কাঞ্চির ঠুমকা প্রেম

মুক্তা আর্টস

দেখেছেন 188 জন