তেলেভাজা

telebhaja

গনগনে আগুন আঁচে, ডুবো তেলে ওলট-পালট খেয়ে মনোহর বাদামি ত্বক নিয়ে তারা যখন স্নান সেরে উঠে আসে, তখন হাওয়া মাতোয়ারা মনমাতাল সুগন্ধে।কখনও আলু মোড়া, কখনও বা চিংড়ির শরীর ঘেরা কাটলেটের আস্তরণ, এই দৃশ্য কলকাতা ছাড়া আর কোথায়? কলকাতার অলিগলিতেই ফি-দিন নিয়ম করে এমন অগুনতি তেলেভাজার জন্ম এবং দ্যাখ না দ্যাখ হাপিশ হয়ে যাওয়া খদ্দেরের পেটে। ক্যালোরি-চিন্তাকে গুলি মেরে এখানে জিতে যায় কেবল সুস্বাদ। এহেন কলকাতার অলিগলির তেলেভাজা কিস্যা এবার থেকে নিয়ম করে হাজির পাঠকের দরবারে। খবর আমাদের; খাবার খুঁজে নেওয়া পাঠকের মর্জি।

বন্ধুদের জন্যই এই দোকানের জন্ম।

তেলেভাজার মিত্রতা

পরমা দাশগুপ্ত

বন্ধু সবুজ চিরদিন, বন্ধুত্বের বয়স বাড়ে না...

তা বলে বন্ধুত্বের ঠিকানার বয়স বাড়বে না নাকি? বাড়বে, নিশ্চয়ই বাড়বে। আর সেই বেড়ে ওঠার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকবে আরও আরও নতুন বন্ধুত্বের গল্প। বছরের পর বছর যে গল্পে আসবে নতুন নতুন মুখেরা। ভরবে টেবিল, চায়ের কাপে উঠবে তুফান। আর গল্পের তোড়ে ভেসে নিমেষে উধাও হবে থালাভরা সুস্বাদ। এসবই সম্ভব মিত্র কাফে-তে। ‘মিত্র’ অর্থাৎ বন্ধুদের জন্যই যে দোকানের জন্ম হয়েছিল সেই ১৯২০ সালের এক সকালে। তার পরে দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে যুগ যুগ ধরে যে দোকান আজও এ শহরটার বন্ধুত্বের ঠিকানা।

শোভাবাজার মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে গুটিগুটি যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ আর অরবিন্দ সরণির মোড়টায় গিয়ে দাঁড়ান। চারপাশ ম-ম করা সুবাসই পথ চিনিয়ে দেবে। ব্যস, আপনি সটান পৌঁছে গিয়েছেন দোকানের দোরগোড়ায়। সেই আদ্যিকালের চেহারা, আসবাব, স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল থেকে মেনুকার্ড— যার সবটা জুড়েই এখনও দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে পুরনো কলকাতা। ফ্রাই-কাটলেট-পুডিং-এর ব্রিটিশ সাহেবিয়ানাও আছে বহাল তবিয়তে। আর আছে মাছ-মাংসের যাবতীয় সুখাদ্যে মন ভরানোর চেনা ট্র্যাডিশন। এ দোকান তাই এক পলকে ফিরিয়ে দিতে পারে সেকালে। টাইম মেশিনের আর কী বা দরকার!

শুরুটা হয়েছিল সুশীল রায়ের হাত ধরে। সেই ১৯২০ সালে অবশ্য এখনকার মেনুকার্ডের মতো এত পদের বাহার ছিল না। অল্প কিছু সুখাদ্য আর চা-টোস্টের হাত ধরেই এ দোকান হয়ে ওঠে বন্ধুদের আড্ডার ঠেক। কলকাতার সুখাদ্যপ্রেমীদের সেরা ঠিকানা হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি তেমন। সুশীলবাবুর মৃত্যুর পরে দোকানের ভার নেন তাঁর স্ত্রী গীতাদেবী। অক্লান্ত চেষ্টায় টিকিয়ে রাখেন দোকানের ঐতিহ্য থেকে খাবারের স্বাদ সবই। প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি পৌঁছে এ দোকান নিজেই এখন কিংবদন্তির পর্যায়ে। গীতাদেবীর মৃত্যুর দোকানের দায়িত্বে এখন তাঁদের নাতি, তাপস রায়। বরাবরের ট্র্যাডিশন তবু এখনও অক্ষুণ্ণ।

বছর গড়িয়েছে একের পর এক। ক্রমেই লম্বা হয়েছে মেনুকার্ডে সুখাদ্যের তালিকাও। হাতেগোনা কয়েকটা পদ থেকে এখন প্রায় ষাট ছুঁয়েছে সুখাদ্যের সংখ্যা। সকালে চা-টোস্ট-ডিমের জলখাবার পর্বের পরে চারটে নাগাদ দোকান খোলা থেকেই শুরু হয়ে যায় তোড়জোড়। গুটিগুটি খাদ্যরসিকদের ভিড় জমাও শুরু তখন থেকেই।

তার পর? সমানেই চলতে থাকে খাওয়াদাওয়া। চিকেন-মাটন-ফিশ-প্রনের ফ্রাই, চপ, কাটলেট, কবিরাজি বা আফগানি, মোগলাই দোপেঁয়াজা, কারি, কষা, সবেরই অর্ডার আসতে থাকে দেদার। অর্ডার আসে একই মশলায়, একই পুরে নিরামিষ চপ-কাটলেটও। সামলে উঠতে হিমশিম খান কর্মীরা। ভিড়ের চাপে আটটা-সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই দোকানের ভাঁড়ার ধুয়েমুছে সাফ।

তবে এ দোকানের হিট যে এখনও ব্রেন চপ, ব্রেস্ট কাটলেট আর কবিরাজি— তা অতি বড় নিন্দুকও স্বীকার করতে বাধ্য। আর আছে স্যুপ। এতগুলো বছর পেরিয়ে যে স্যুপের দাম এখনও দু’টাকাই। বাজারদর সামলে দিতে দাম বাড়ে অন্য সব পদের। স্যুপের দাম এখনও কী ভাবে সেই আদ্যিকালের মতোই? ‘ট্র্যাডিশন,’ বলছেন তাপসবাবু। আর জানাচ্ছেন, বাকি সব পদে দামের হেরফেরে ওটুকু সয়েই যায়।

আর স্বাদ? ‘এত বছর পরেও এক্কেবারে আগের মতো,’ বলছেন বাগবাজারের প্রৌঢ় সমীর মুখোপাধ্যায় থেকে দক্ষিণের টালিগঞ্জের অনিমেষ সরকার। বাবা-মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে লোভ সামলাতে না পেরে ভিড় জমাচ্ছে‌ন কলেজপড়ুয়া অনির্বাণ, মেখলা, সন্দীপ্ত, ঋতিকারা। আর ধোঁয়া ওঠা ব্রেস্ট কাটলেটের স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে পিৎজা-বার্গার-মোমোপ্রেমীরাও বলে ফেলছে ‘পারফেক্ট’! তাই উত্তর থেকে দক্ষিণ, আঠেরো থেকে আটাত্তর তো বটেই, এ দোকানে যখন-তখন হাজির হন চেনা মুখের তারারাও।

উত্তমকুমারের প্রিয় ঠিকানা ছিল ছোট্ট দু’ঘরের এই মিত্র কাফে। আসতেন বন্ধুবান্ধব জুটিয়েও। তার পরে কেটে গিয়েছে এতগুলো বছর। পাল্টেছে কি কোনও কিছু?

নাহ, এক্কেবারে না। এ কালের ‘মিত্র’-রাও তো সেখানেই ভিড় জমায় এখনও।

আর গল্পের তোড়ে এখনও ভাসে সেই চেনা সুস্বাদ।

 

আরও

দোকানটাকে সব সময়েই ঘিরে থাকে তারার আলো।
রাধুবাবুর দোকান

পরমা দাশগুপ্ত

বড় অর্ডার আসে ভেজিটেবল চপ বা ডিমের ডেভিলের।
বাটুদার তেলেভাজা

পরমা দাশগুপ্ত

সেই দোকানটাই কিন্তু মাছ-মাংসের রাজা।
ফিশ ফ্রাইয়ের গলি

পরমা দাশগুপ্ত

?>