তেলেভাজা


গনগনে আগুন আঁচে, ডুবো তেলে ওলট-পালট খেয়ে মনোহর বাদামি ত্বক নিয়ে তারা যখন স্নান সেরে উঠে আসে, তখন হাওয়া মাতোয়ারা মনমাতাল সুগন্ধে।কখনও আলু মোড়া, কখনও বা চিংড়ির শরীর ঘেরা কাটলেটের আস্তরণ, এই দৃশ্য কলকাতা ছাড়া আর কোথায়? কলকাতার অলিগলিতেই ফি-দিন নিয়ম করে এমন অগুনতি তেলেভাজার জন্ম এবং দ্যাখ না দ্যাখ হাপিশ হয়ে যাওয়া খদ্দেরের পেটে। ক্যালোরি-চিন্তাকে গুলি মেরে এখানে জিতে যায় কেবল সুস্বাদ। এহেন কলকাতার অলিগলির তেলেভাজা কিস্যা এবার থেকে নিয়ম করে হাজির পাঠকের দরবারে। খবর আমাদের; খাবার খুঁজে নেওয়া পাঠকের মর্জি।

বড় অর্ডার আসে ভেজিটেবল চপ বা ডিমের ডেভিলের।

বাটুদার তেলেভাজা

পরমা দাশগুপ্ত

গড়িয়া মোড়টাতেই ছোট্ট একটেরে এক গলি। দোকানপাটে ঘিঞ্জি। রাজ্যের গাড়ি, অটো, সাইকেলে জবরজং। কিন্তু বিকেল গড়ালেই কোন এক অমোঘ টানে সেই গলিতেই ঢুকে পড়েছেন আপনি।

কীসের সে টান, ভাবছেন তো? এ টান আসলে প্রাণকাড়া এক সুবাসের, যে সুবাস ছড়ালে বাঙালিকে আটকে রাখে কার সাধ্য! কারণ সরু গলিটা ধরে একটু এগোলে আপনারই অপেক্ষায় গরম গরম তেলেভাজা। ছোট্ট দোকানটার এক্কেবারে সামনে বিশাল কড়াইয়ে যারা জন্ম নিচ্ছে একের পর এক। আগুন আঁচের সেই জাতকেরা এর পরে ঝুড়িতে পড়ার সময়টুকু পাচ্ছে শুধু। তার পরেই নুন মেখে সেজেগুজে ঠোঙায় চড়ে খদ্দেরের হাতে ওঠার পালা।

নয় নয় করে প্রায় তেতাল্লিশ বছর হতে চলল প্রতাপ ঘোষ ওরফে বাটুদার তৈরি দোকানটার। চা-তেলেভাজা দিয়ে যে দোকানের শুরু। পাড়া-পড়শি তো বটেই, এখন এ পাড়ার লোকেদের পরিচিত-আত্মীয়স্বজন মারফত টালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট, ভবানীপুর, এমনকী দমদমেও পৌঁছে গিয়েছে বাটুদার দোকানের তেলেভাজার সুখ্যাতি। পাতলা খোলে মশলাদার আলুর চপ বা বড় বড় টোম্যাটোর টুকরোয় ঠাসা টোম্যাটোর চপ, কিংবা আলতো নোনতা মোচার চপে যে মন মজেছে গড়িয়া থেকে দমদমের, তা বলাই বাহুল্য।

প্রথম থেকেই পাওয়া যেত আলুর চপ, বেগুনি, ফুলুরি, পেঁয়াজি, মোচার চপ বা ভেজিটেবল চপ। প্রতাপবাবুর ছেলে সঞ্জয় দোকানের দায়িত্বে আসার পরে সে তালিকায় যোগ দিয়েছে টোম্যাটোর চপ আর ডিমের ডেভিলও। খদ্দেরের ভিড়ে এখন আর সামলে ওঠা যায় না বিকেল-সন্ধে। অগত্যা চায়ের পাট উঠেছে। ছোট্ট দোকানটা এখন শুধুই তেলেভাজার।

সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় জোগাড়যন্ত্র। লাগোয়া গড়িয়াবাজার কিংবা হাটের বাজারের থেকে বরাবরই বাজারটা নিজের হাতেই করেন সঞ্জয়বাবু। বাবার মতোই। তেল, মশলাপাতি আনেন তিরিশ বছরের চেনা দোকান থেকেই। স্বাদে, গুণে-মানে যাতে একই রকম ধরে রাখা যায় ঐতিহ্য। বাজার আসার পরে বাকিট সামলানোর দায়িত্বে কাশীনাথ সরকার। এ দোকানের তিরিশ বছরের কর্মী। বললেন, ‘প্রথম দিনটা থেকেই সবটুকু নিজের হাতে করি। কাটাকুটি, মশলাপাতি তৈরি, চপ গড়া, সব। সেই করতে করতেই তিনটে-সাড়ে তিনটে বেজে যায়।’

পাঁচটা বাজতে না বাজতেই দোকান খোলে। ইতিইতি খদ্দেরের আসা শুরু তখনই। তার পরে সকলের চোখের সামনেই অর্ডার মতো ভেজে ফেলা চপ। এই চলতে থাকে রাত অবধি। শীতে কিংবা বর্ষায়, বাঙালির তেলেভাজা-পার্বণের দিনগুলোতে সাতটা-সাড়ে সাতটার মধ্যেই ঝাঁপ ফেলতে হয়। কারণ দেড়শো-দুশো খদ্দেরের আব্দার মেটাতে ততক্ষণে ফুরিয়ে গিয়েছে যাবতীয় জোগাড়যন্ত্র। বছরের বাকি সময়টায় রাত ন’টা, দশটা অবধি চলে দোকান। তবে খদ্দেরের ভিড়ে ভাটা পড়ে, ভাববেন না যেন! সংখ্যাটা বড়জোর কমে দাঁড়ায় একশো কুড়ি-তিরিশে। সঞ্জয়বাবু জানালেন, এমনিতে আলুর চপের বিক্রিটাই সবচেয়ে বেশি। তবে বড় অর্ডার আসে ভেজিটেবল চপ বা ডিমের ডেভিলের। আর তার পরেই সগর্বে যোগ করেন, ‘আমার দোকানের তেলেভাজা খেয়ে অম্বল হয় না কিন্তু। আমি না, খদ্দেররাই বলেন এ কথা। তেল-মশলায় সে জন্যই কোনও আপস করি না। সব্জি, মশলাপাতির দাম বাড়লে চপের সংখ্যা কমিয়ে দিই বড়জোর। তাতেই পুষিয়ে যায়। কিন্তু চপের দাম বাড়ে না, কোয়ালিটিও একই রাখি।’

সায় দিচ্ছেন এলাকার দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা দিলীপ মণ্ডলও। ‘বিকেলবেলা এই গলিতে এলে তেলেভাজা নেবই। স্বাদটা এত ভাল যে ছাড়তে পারি না। বাড়ির সকলেরই এই দোকানের তেলেভাজা খুব প্রিয়।’

আর বলছেন নাকতলার বছর তিরিশের সুজয় হাজরা। ছোটবেলায় দেখতাম, এই তেলেভাজার দোকানটা ঘিরে একটা বড়সড় আড্ডা বসত পাড়ার লোকেদের। এখন আর আড্ডাটা বসে না বটে, গলিটা ঘিঞ্জি হয়ে গিয়েছে। তা বলে তেলেভাজা নিতে আসা ভিড়টা কমেনি একটুও। এত বছরে একই রকম রয়ে গেল!’

একটেরে গলিটা তাই রোজ বিকেলেই রঙ পাল্টায়। থুড়ি, রঙ নয়, সুবাস। আর ঘুরেফিরে আসে চেনা মুখের ভিড়।

 


এই বিভাগে অন্যান্য

দোকানটাকে সব সময়েই ঘিরে থাকে তারার আলো।
রাধুবাবুর দোকান

পরমা দাশগুপ্ত

বন্ধুদের জন্যই এই দোকানের জন্ম।
তেলেভাজার মিত্রতা

পরমা দাশগুপ্ত

সেই দোকানটাই কিন্তু মাছ-মাংসের রাজা।
ফিশ ফ্রাইয়ের গলি

পরমা দাশগুপ্ত