বাংলা ব্লগ

দূরের মোমবাতিরা

শ্রীজাত

মোটেই উৎসবে বাড়ির বাইরে বেরোতে ভাল লাগে না আমার। যতদূর চোখ যায় মানুষের ব্যস্তসমস্ত মাথা আর শরীর-ঠাসা রাস্তাঘাট, চূড়ান্ত আলোয় টইটম্বুর শহরের প্রত্যেকটা গলি, এন্তার অনুষ্ঠান-ঘোষণা-বাজনা-বাজি। একদম ভাল লাগে না আমার। বরং যে-সময়টা বাইরে উৎসব চলছে, ততক্ষণ বাড়িতে চুপচাপ বই পড়া, ছবি দেখা বা খুব বেশি হলে বন্ধুরা কোথাও একটা জড়ো হয়ে আড্ডা মারা – এই হল আমার অভ্যেস এবং দৌড়। ভাল অভ্যেস, এমনটা দাবি করছি না। উৎসবের কতখানি দরকার প্রত্যেক সমাজে, সে-নিয়ে আমার কোনও দ্বন্দ্ব নেই। আমি কেবল নিজের মুদ্রাদোষে আলাদা করে নিয়েছি নিজেকে, একটু চুপচাপ করে রেখেছি। যদিও বইমেলার গিজগিজে শনি-রোববারে যখন ভিড় ঠেলি অথবা ফেস্টিভ্যালে নতুন মখমলবাফ দেখার জন্যে সুদীর্ঘ লাইনের শেষে উদ্যম নিয়ে দাঁড়াই, তখন উৎসব বিষয়ক আমার অভ্যেসের বিচ্যুতি ঘটে নিঃসন্দেহে এবং সে-কারণে বহু তর্কের মুখেও পড়তে হয় আমাকে। সেইসব তর্কের রেশ যাতে কমে আসে, বেরোলাম এবার বড়দিনের সন্ধেবেলায়। দূর্বা খুব ভালবাসে বেড়াতে। দূরে দূরে তো বটেই, শহরের ঝলমলে দিনরাতগুলোও ওকে বেশ টানে। এবার বড়দিনে অবশ্য আমিই ভেবেছিলাম, সন্ধেবেলায় একটু বেরিয়ে পড়ব। বহুদিন পর জাঁকিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে কলকাতায় ... এই তো ক’টা দিন। আর বড়দিনের একটা সুবিধে এই যে পুজোর মতো সারা শহর-জুড়ে ভিড় থাকে না। তাই রাস্তাঘাটে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার বিরক্তিটা এড়ানোই যাবে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। বেরিয়ে পড়লাম সন্ধেবেলা। ছোট্ট ট্যুর – সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রাল হয়ে পার্ক স্ট্রিট। বাঁধা গৎ, কলকাতার প্রায় সকলে যে-রুটে যায়, সেটাই নেব মনস্থির করলাম। সেলিমপুর থেকে ঢাকুরিয়া লেক হয়ে মনোহর পুকুর পেরিয়ে মিন্টো পার্ক – মোটামুটি ফাঁকা। উৎসবমুখরতা টের পেলাম থিয়েটার রোড ধরার পর। গাড়ির পর গাড়ির লম্বা লাইন, লোকের পর লোকের উৎফুল্ল হেঁটে চলা। শীতের বাহারি সাজপোশাকে বেরিয়ে পড়েছেন কত কত মানুষ। বছর-শেষের ঠাণ্ডাকে হাতে হাত ঘষে স্বাগত জানাতে। একটা দিন একটু আলোতে আর উষ্ণতায় বেঁচে নিতে।

বড়দিনের সন্ধেবেলায় এর আগে কখনও কি ক্যাথিড্রাল-এ এসেছি? আবছা মনে হল হয়তো এসেও থাকব ... পরিষ্কার মনে পড়ল না। এপাশে অ্যাকাডেমি থেকে ওপাশে বিড়লা তারামণ্ডল – গোটা এলাকাটা থিকথিক করছে মানুষ আর গাড়িতে। মোড়ে মোড়ে মুড়ি-ফুচকা-বেলুন-টুপির রংচঙে পসরা, রাস্তার দু’ধারে দেদার পার্কিং আর পুজোর রাস্তার মতোই মানুষজনের হাঁটার জন্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি আলাদা পথ। কাতারে কাতারে মানুষ ঢুকছেন ক্যাথিড্রাল-এ, আলোয় আলো হয়ে আছে পুরো চত্বর। আমরাও ভিড়ের মধ্যে হাতে হাত ধরে পায়ে পা মিলিয়ে ঢুকে পড়লাম পুরনো বুড়ো চার্চের ঠাণ্ডা, ঝলমলে উঠোনে। গির্জার দরজার অভিমুখেই মানুষের ঢল, প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিলাম, ওদিকটায় যাব না। একবার গির্জায় ঢুকলে সময় নিয়ে দাঁড়ানোটাই উচিত, এদিকে পার্ক স্ট্রিট হয়ে বাড়ি ফেরার তাড়াও আছে। সুতরাং বাইরে থেকে দেখে বেরিয়ে পড়ব আবার। হঠাৎ দেখলাম দূর্বা পকেট থেকে ক্যামেরাটা বার করে ডান দিকে কিছুদূর এগিয়ে গেল। ওখানে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছেন। আমি জটলা দেখলে একটু গুটিয়ে যাই বরাবরই। এক্ষেত্রেও চট করে এগিয়ে যেতে পারলাম না। দূর্বা ততক্ষণে সামনের দিকে চলে গেছে, ছবি তোলার চেষ্টাও করছে। একটু এগোতেই দেখি পাশাপাশি রাখা দু’টো লম্বাটে চৌকো বেদির ওপর মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখছেন সকলে। বিকেল থেকেই চলছে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা, কারণ ততক্ষণে বহু মোমবাতি জ্বলতে জ্বলতে ছোট হয়ে গেছে, নিভে গেছে, নানা রঙের গলে-যাওয়া মোমে ঢেকে আছে বেদিদু’টোর অনেকখানি। দিল্লির গণধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদ? মুহূর্তের জন্যে মনে হল আমার। কমবয়েসি কত কত মেয়ে চুপচাপ মোমবাতি জ্বালিয়ে গেঁথে রেখে তাকিয়ে থাকছে, তারপর পেছন ফিরে হেঁটে ফিরে যাচ্ছে। তা-ই মনে হল আমার। বড়দিনেও ছিন্নভিন্ন মেয়েটির কথা ভেবে কিছু মানুষ তাঁদের নীরব প্রতিবাদ জাহির করছেন গির্জার উঠোনে – ভালই তো। কথাটা দূর্বাকে বলতেই সামান্য কটমট করে তাকাল, কানে কানে বলল এগুলো প্রার্থনার মোমবাতি, যিশুর জন্মদিনে তাঁর প্রতি প্রণাম ও শুভেচ্ছার প্রতীক। আমার সামনে পাল্টে গেল গোটা ছবিটাই। প্রতিবাদ, না প্রার্থনা? দূরের মোমবাতিদের দেখে কীভাবে বুঝবে একজন? না, বোঝার কোনও উপায় নেই। মার্কিননিবাসী বোনকে পাঠাবে বলে মোম-ঝলমলে বেদি আর তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের যে-ছবি তুলেছে দূর্বা, কয়েক হাজার মাইল দূরে বসে তার বোন দেহলী কীভাবে বুঝবে – ধর্ষণ নয়, যিশু? বুঝবে, কারণ বলে দেওয়া হবে তাকে। যেমন দূর্বা এই এক্ষুনি বলে দিল আমাকে। নইলে কয়েক হাজার মাইল দূর কেন, কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়েও তো প্রতিবাদ আর প্রার্থনা গুলিয়ে যাচ্ছিল আমার।

কেমন একটা ধাঁধা নিয়ে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলাম। মোমবাতি তো এখন বুমিং ইন্ডাস্ট্রি। ভাল বিক্রি, দুরন্ত টার্ন ওভার। দূরের মোমবাতিরা তাই এটুকু ছলনা ভালই পারে।