নাট্য সমালোচনা

একা তুঘলক

অরিজিতা মুখোপাধ্যায়।
কলকাতা,৫ অগস্ট ২০১২

bin tughlak

ইতিহাস পাতার মহম্মদ বিন তুঘলক। ছবি- নটধা।

ঐতিহাসিক নাটক মাত্রেই ইতিহাসের চরিত্র বা ঘটনার সাক্ষ্যে কাহিনির বুনন। প্রয়োজন মতো তাতে মেশে কাল্পনিক চরিত্রের চড়া রঙ। সেদিক থেকে বিচার করলে নটধার প্রযোজনায় নাটক 'একা তুঘলক' অন্য ট্রিটমেন্ট করল ইতিহাসের। মশলার রঙ বাদ গেল, বরং ৭০০ বছর আগে ফিরে দিল্লি মসনদের নেপথ্যের বহু অজানাকে ইতিহাসের অঙ্গে জড়িয়ে দিল এই নাটক।

এই নাটকের নায়ক ইতিহাস পাতার মহম্মদ বিন তুঘলক। ১৩২০ সালে এই দেশে সুলতানতের তক্তে বসে অভাবনীয় আধুনিক দেশশাসনের সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর। আমরা স্কুল পাঠ্য ইতিহাসের বইতে পড়ে ফেলেছি তাঁর সিদ্ধান্ত। রাজধানী দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে সরানো হয় তাঁরই সময়ে, রৌপ্য মুদ্রার বদলে চিনের মুদ্রানীতির অনুপ্রেরণায় চালু করেন তামার টাকা, দেশে প্রথমবার কৃষি সমবায় তৈরি হয়, বিদেশি বণিক এবং আমিরদের যথেচ্ছাচার অনেকটাই দমন করা হয়... কিন্তু, শেষ রক্ষা হল কই? ইতিহাসের পাতায় তুঘলকের নামের পাশে বসে যায় এক অদ্ভুত অভিধা, ‘পাগলা মহম্মদ’ ! পাগল রাজার শাসন কি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে মেনে নিয়েছিল দেশ? শুধু খামখেয়ালি স্বভাবই কি ছিল তাঁর চরিত্রের একমাত্র বৈশিষ্ট্য? এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজতে চেয়েছে নটধা। গিরিশ কারনাডের নাটকের অনুবাদ করতে করতে তাই উঠে এসেছে স্ট্যানলি লেনপুল, রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিকদের গবেষণার নির্যাস। কিন্তু এই প্রযোজনার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তুঘলকের বন্ধু কবি জিয়াউদ্দিন বারনির ‘আইন-ই-তুঘলকি’ গ্রন্থের চমৎকার  আত্তীকরণ। আসলে কি ছিল তুঘলকের পাগলামির অন্তরালে? ঘোর প্রতিকূল অবস্থায় মসনদে উঠেছিলেন সুলতান, চারিদিকে সন্দেহের তির ছিল তাঁর দিকেই। সুলতানি তক্তের লোভে নারকীয় হিস্রতায় মেতেছিল নিজেরই রক্ত... সিহাবুদ্দিনের বেইমানি না মানতে পেরে নিজের হাতেই প্রাণ নিয়ে ফেলেন প্রিয় অনুজের। অন্যদিকে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র ফিরোজ শাহ ছিলেন তুঘলকের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। অথচ ভুল রাজনীতির পাকচক্রে তিনিই সুলতানের অন্তিম দিনের পরিকল্পনায় মেতে উঠলেন। কিন্তু কোন্ ষড়যন্ত্রের জাল এমন বিদ্বেষ ভরে দিল? দেশের খাদ্যভান্ডার পুড়িয়েছিল কারা? কারা প্রথম তাম্রমুদ্রা নকল করার পরামর্শ দিয়েছিল, সেকথা বইয়ের পাতায় থাকেনা। কারণ আজও ২০১২ সালেও একই হাওয়া নষ্ট করে চলেছে মানুষের ভবিষ্যৎ, তাই ইতিহাসের কবলে চাপা পড়ে যায় মানবিকতা। প্রশ্ন ওঠে নাটকের সূত্রধরের বয়ানে, ‘বাজার আর মানবিকতার লড়াইতে কেন বাজারই জিতে যায় বরাবর?’ সাধারণের হয়ে কথা বলা শুধু ‘মানিফেস্টো’র অক্ষরে। বাস্তবিক. আজও তাঁদের একা হয়ে যেতে হয় যারা সমদর্শনের সন্ধানে নেমেছেন। থিয়েটারের কিছু দায়বদ্ধতা আজও আছে সেটা আবার প্রমাণিত হল। কারণ সবার বিপক্ষে দাড়ানো 'একা' তুঘলকের অনাবিষ্কৃত ইতিহাসের খোঁজ করল সংবেদনশীল নাট্যদল।

দেখুন গ্যালারি

নাটক নির্বাচনে এবং পড়াশোনায় কোন ফাঁক রাখেননি নাট্যকার রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু নির্দেশনায় কিছু দুর্বলতা ধরা পড়ল। ঐতিহাসিক নাটকে আমরা সময়ের ব্যাবধানে থাকি, তাই সময়ে ফেরার একটা তাগিদ থাকে। কিন্তু সেই কারণে সংলাপ বলার ধরনে অতিনাটকীয়তা প্রয়োগ করার খুব একটা দরকার পড়ে কি? তুঘলকের চরিত্রে অর্ণ মুখোপাধ্যায়, বারনির ভূমিকায় রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়, নাজিবের ভূমিকায় জয়দেব ঘোষ সংলাপে এবং অভিনয়ে সামঞ্জস্য রাখলেও অন্যান্য কিছু চরিত্রকে স্রেফ সংলাপে মনোযোগী মনে হল। শারীরিক কসরত এই নাটকের একটা বড় জায়গা দখল করে ছিল, অথচ সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের বিশেষত সিহাবের ভূমিকায় সুমিত পাঁজার বেশ নড়বড়ে উপস্থিতি থাকল মঞ্চে। নর্তকীর ভূমিকায় স্বাগতা রিতের উপস্থাপনার অনেকটা পরিমার্জন প্রয়োজন। এই নাটকের সংলাপ স্বাভাবিক কারণেই বিদেশি, বিশেষত উর্দু শব্দবহুল। উচ্চারণের সমস্যাও তাই বেশ কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয়। কিন্তু অসাধারণ কিছু দৃশ্য মনে থাকবে, সিহাবের দেহ আগলে তুঘলকের স্মৃতিচারণ, বারনির হাহাকারের মাঝে সেই বিখ্যাত শায়রি, ‘হামারা শহর উস বরষ...’।

নাটকের মঞ্চনির্মাণে দিল্লি এবং দৌলতাবাদের কেল্লার ভাবনায় যথাযথ নীলকণ্ঠ। সুদীপ সান্যালের আলোর নকশা ভাল লাগলেও মঞ্চে আলোর পরিচালনায় কিছু বিভ্রাট অসুবিধেজনক। সাঙ্গীতিক প্রয়োগে ভাল লেগেছে দেব কুমার পালের কাজ। পোশাকেও সময়ের সঙ্গে মানানসই নির্মাণ ঘটিয়েছেন বিমল মাইতি।
এই নাটক ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানকে দেখতে শেখায় ভিন্ন আঙ্গিকে। ‘নটধা’-র  এই নাটকে তরুণ প্রজন্মের ভীঁড় আছে। নতুন রক্তের থিয়েটার নেশা এবং অন্যরকম কাজ করার ইচ্ছা এই নাটকের কেন্দ্রমূল...তাই সঠিক পরিশোধনে ‘একা তুঘলক’ এর আর ভাল প্রযোজনা দেখার আশা রইল।   

নাটক : একা তুঘলক
রচনা : রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়
প্রযোজনা : নটধা
নির্দেশনা : অর্ণ মুখোপাধ্যায়
অভিনয় : অর্ণ মুখোপাধ্যায়, রুদ্ররূপ মুখোপাধ্যায়, জয়দেব ঘোষ, সুব্রত সাধুখাঁ, বেদান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য
 

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

দুই পুলিশের মারপিট

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 71 জন

নকল উকিলের প্রতারণা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 29 জন

ফোর জি পরিষেবা হাতের মুঠোয়!

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 43 জন

ভদ্দরলোকের খেলার বিষাক্ত মুখোশ

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 54 জন

মিসেস সেনের শরীর খেলা

অগ্নিদেব চ্যাটার্জি প্রোডাকশনস

দেখেছেন 1,378 জন