নাট্য সমালোচনা
কোকিল স্যার
সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা,১২ অগস্ট ২০১২
শারদীয়া আনন্দমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল প্রচেত গুপ্তর উপন্যাস 'কাঞ্চনগড়ের কোকিল স্যার'। তারই নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হল ১ অগস্ট, বুধবার, গিরিশমঞ্চে। উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছেন রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী। নির্দেশনায় সৌমিত্র মিত্র। প্রচেত গুপ্ত শক্তিশালী লেখক, তাঁর কলমে উপন্যাসটি যে বাস্তবতা পেয়েছিল, তাকে মঞ্চে উপস্থিত করা বেশ শক্ত কাজ। কিন্তু সেটাই অবলীলায় করে দেখালেন হাওড়া শিল্পীসংঘের কলাকুশলীরা। অদ্ভুতুড়ে সিরিজ দিয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে যে নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন, এই উপন্যাসটি অনেকটা যেন সেই শ্রেণীরই প্রতিনিধিত্ব করে। নাটকেও ধরা পড়ল সেই অদ্ভুত ভেলকি; যেন ম্যাজিকওয়ালার রঙবেরঙের ঝোলা- পায়রা থেকে গোলাপফুল হাজির এক নিমেষেই। যাই হোক গল্পটা ছোট্ট করে বলে নিই।
মফস্বল শহর কাঞ্চনগড়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে উদ্বেগ নেই কোনও। এই কাঞ্চনগড়ের হাইস্কুলে অঙ্কের মাস্টারমশাই সুশীলবাবু। তাঁর ভয়ে হেডমাস্টার থেকে ছাত্র সবাই থরহরি কম্পমান। অঙ্ক ছাড়া তিনি আর কিছুই বোঝেন না; কঠিন কঠিন অঙ্ক দিয়ে ছাত্রদের বোকা বানাতেই তাঁর আনন্দ। তিনি খাতা দেখলে কোনও ছাত্রই দশের বেশি পায় না। স্কুল পরিদর্শকের কাছে আবেদন করেন যাতে ইতিহাস,বাংলার বদলে অঙ্কের ক্লাস নেওয়া হয়। এহেন সুশীলবাবু হঠাৎ এক আশ্চর্য রোগ বাধিয়ে বসলেন- কথা বলতে গেলেই তাঁর গলা দিয়ে কোকিলের ডাক বেরিয়ে আসে। যাঁর ভয়ে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত, তাঁর গলা দিয়ে যদি কুহু কুহু আওয়াজ বেরোয়, ভাবুন তো কী বিপদ! ইমেজের তো দফারফা। স্বাভাবিক ভাবেই নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেললেন তিনি। হোমিওপ্যাথি থেকে হেকিমি সবরকমের চিকিৎসাই হল, কিন্তু রোগ সারে না কিছুতেই। মনমরা সুশীলবাবু চুপচাপ বসে থাকেন। এমনই একটা মনখারাপ করা বিকেলবেলায় তাঁর মুখে এসে পড়ল কনে দেখা আলো। কোথাও কোনও রেডিওতে বেজে উঠল একটা পুরনো গান। সুশীলবাবু দেখা পেলেন এক অদ্ভুত লোকের; যে লোকটা পাখি দেখে বেড়ায়। নাম সালিম আলি। নামটা চেনা চেনা হলেও কোথায় শুনেছেন মনে করতে পারলেন না সুশীলবাবু। তাতে কী এসে যায়; লোকটি বলল এটা কোনও রোগই নয়। পাখিরা নানান সময়ে নানান কারণে ডাকলেও বেশিরভাগ সময়েই ডাকে মনের আনন্দে; শুধুই আনন্দে। আশ্চর্য রূপান্তর ঘটল সুশীলবাবুর; কী হল তারপর? সেটুকু নাহয় নাটকের স্বার্থে নাই বা বললাম।
ফ্যান্টাসির মোড়কে হালকা চালে এই নাটক একটি সমকালীন সামাজিক সমস্যার কথা বলে। প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখতে পাই শিক্ষকের হাতে ছাত্র নিগৃহীত। আজকের এই শিক্ষা ব্যবস্থায় কোলের খোকাও স্কুলে যায়। লেখাপড়ার চাপ লেগেই থাকে লোম ফোঁড়ার মতো বিরক্তিকর হয়ে। তার উপরে শিক্ষকদের শাসন তো আছেই। রোজকার ফ্রাস্ট্রেশন উগরে দেওয়ার জন্যে ছাত্ররা তো আদর্শ টার্গেট। কিছু বলবে না, মুখ বুজে মার খাবে। মানসিকভাবে ধর্ষিত হবে প্রতিনিয়ত। সুশীলবাবুও এরকমই একজন শিক্ষক ছিলেন; অবশেষে শাস্তি পান তিনি। কিন্তু এই শাস্তির রকমটা আলাদা। শাস্তিদাতাও অমোঘ; যে বা যারা নির্মল শৈশব নষ্ট করতে চায়, প্রকৃতি তাদের ছেড়ে কথা বলে না। মধুর প্রতিশোধ নেয় সে। তাই তো সুশীল বাবু কোকিলের মত ডাকতে থাকেন। ডাক্তাররা যেভাবে সাধারণ মানুষকে হয়রান করে, তারও টুকরো ছবি ফুটে ওঠে এই নাটকে। অস্বস্তি আর হাসিকে একসঙ্গে সাজিয়ে দিলেন সৌমিত্র মিত্র এই নাটকে।
সুশীলবাবুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন সমর চন্দ্র। কথা বলতে বলতে কুহু কুহু করে ডাকা এবং তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল; সাবলীলভাবেই সেটা করলেন তিনি। হেডমাস্টার শশাঙ্কবাবুর ভূমিকায় শঙ্কর ঘোষ শক্তিশালী অভিনেতা। অন্যান্য অভিনেতা অভিনেত্রীরাও যথাযথ। তুলনায় কাজের মেয়ে মায়ার চরিত্রে সিলভিয়া শর্মার অভিনয় যথেষ্ট নয়। নাটকটির আলো করেছেন বাদল দাস. তাঁর কথা নতুন করে আর কী বা বলার আছে? কৃত্রিম ভাবেও যে সত্যিকারের কনে দেখা আলো তৈরি করা যায় আগে জানতাম না; এই মন্ত্রগুপ্তি বাদল দাসই জানেন। মঞ্চ ভাবনায় নীলাভ চট্টোপাধ্যায় এবং নির্মানে বিলু দত্ত মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। মঞ্চ ভাবনায় নতুনত্বের স্বাদ পাওয়া যায়। আবহ সঙ্গীতে গৌতম ঘোষাল. নেপথ্যে স্বয়ং নির্দেশকের গুরুগম্ভীর গলায় চন্ডীপাঠের ঢং এ 'এ প্লাস বি হোলস্কোয়ার ইজুক্যাল্টু....' এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করে দেয়। আজকাল তো আমাদের সবচেয়ে পছন্দের খাদ্য ব্র্যান্ডনেম; তাই ছাইয়ের নিচেও যে আগুন থাকে সেকথা ভুলে যাই। শিল্পী সংঘের কোকিল স্যার তেমনই আগুন! এই নাটক দেখতে দেখতে মনে হয়- মন ভাল করে দেওয়া কত সহজ কাজ।
নাটক: কোকিল স্যার
প্রযোজনা: হাওড়া শিল্পীসংঘ
নাটক: রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী
নির্দেশনা: সৌমিত্র বসু













