নাট্য সমালোচনা

সেভেন ডেথস অ্যান্ড আ ফিউনারেল

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা, ২৬ অগস্ট, ২০১২

Review of Seven Deaths And A Funeral

সাতাশ বছরের জন্মদিনে পাঁচ জন পেশেন্টকে নিমন্ত্রণ করেন পুরুষোত্তম। ছবি- সৌভিক চক্রবর্তী

এক সময়ে থিয়েটার ছিল কলকাতার বাবুদের বিলাস। সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল তাতে। তার পর একদিন হাজির হল কিছু উটকো ছেলে, বাবুদের কব্জা থেকে টেনে হিঁচড়ে থিয়েটারকে নিয়ে এল আমজনতার ছানাবড়া চোখের সামনে। তবে এখন যে কথাটা বলতে বসেছি তার সঙ্গে যদিও সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের সরাসরি যোগাযোগ নেই, তবুও পুরনোর বদলে নতুনকে প্রতিষ্ঠার অনুষঙ্গ তো আছে!

এ সময়ে কলকাতার থিয়েটারে তথাকথিত পুরনো এবং বড় নাট্যদলগুলির পাশাপাশি উঠে এসেছে একঝাঁক অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এরা এবং তারই সঙ্গে চলে এদের নিরলস থিয়েটার সাধনা। কয়েকটি দল যেমন, ফোর্থ বেল, হিপোক্রিটস, এমএডি ইতিমধ্যেই দর্শক মহলে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। থিয়েটারকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে দিচ্ছে এরা। প্রতিটি প্রযোজনাতেই ভেঙেচুরে একাকার করে দিচ্ছে প্রসেনিয়ামের যাবতীয় ব্যাকরণ। আবার এরা বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারও নয়। এ এক সম্পূর্ণ অন্য ঘরানা। বোদ্ধারা হয়তো এই ব্যাকরণবিমুখ মেলামেশা দেখে বিরক্ত হবেন কিন্তু আমজনতা হাততালি দিতে কার্পণ্য করছে না।

দেখুন গ্যালারি : সাতটি মৃত্যুর খতিয়ান
         
গত ৬ অগস্ট জ্ঞানমঞ্চে মঞ্চস্থ হল এমএডি-র নাটক ‘সেভেন ডেথস অ্যান্ড আ ফিউনারেল’। নাটক ও নির্দেশনায় অরিত্র সেনগুপ্ত। এই নাটকটিকে অনেকাংশে সাইকো থ্রিলার বলা যায়। মূলত ছটি চরিত্র এই নাটকে। ড. পুরুষোত্তম রায় একজন সাইকোলজিস্ট। তিনি তাঁর সাতাশ বছরের জন্মদিনে পাঁচ জন পেশেন্টকে নিমন্ত্রণ করেন। এই পাঁচ জনেরই দৈনন্দিন জীবনযাপনের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য এক সত্তা। প্রথমজন ইংরেজির অধ্যাপক দুঃশাসন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একজন ভ্যাম্পায়ার, না না ড্রাকুলার মতো গলা কামড়ে রক্ত তিনি খান না- পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের অজ্ঞান করে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করে নেন। দ্বিতীয়জন দেবব্রত ঘোষ; এক সময়ে নকশাল কর্মী। একাত্তর সালে তিরিশ হাজার টাকার বিনিময়ে ধরিয়ে দেন তাঁর দুই বন্ধুকে। এখন তিনি বড় নেতা। তৃতীয়জন রেভারেন্ড জয়দ্রথ বিশ্বাস। দিনে কলকাতার এক চার্চে সম্মানীয় বিশপ তিনি আর রাতে পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে হাঁটুতে রুমাল বেঁধে দাঁড়ানো এক যুবক। যে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রি হওয়ার প্রত্যাশায়। চতুর্থজন যাজ্ঞসেনী দেবী; ইরোটিক উপন্যাস লেখিকা। প্রেম করে তাঁর বিয়ে। বিয়ের পর যখন জানতে পারলেন তিনি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম, শ্বশুরবাড়ির লোকজন অত্যাচার করে তাড়িয়ে দিল তাঁকে। পুরুষের প্রতি এক অদ্ভুত ঘৃণা তাই পোষণ করেন তিনি। শেষজন কর্ণ আদবানি; বিখ্যাত সুরকার। আসলে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের চর। সারাজীবন মিথ্যের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন তিনি। এর পর শুরু হয় জন্মদিনের পার্টি। এক অদ্ভুত ট্রুথ গেম; সেখানেই পাঁচজনকে হত্যা করেন ডাক্তার। শেষে নিজেও আত্মহত্যা করেন। এ তো গেল ছটি মৃত্যুর খতিয়ান। সাত নম্বর মৃত্যুটি জানতে হলে নাটকটি দেখতে হবে।

নাটকটিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে আশ্চর্য কিছু অনুষঙ্গ। যেমন ডাক্তারের সাতাশ বছরের জন্মদিন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই সাতাশ বছরেই মৃত্যু হয়েছিল জিম মরিসন, কার্ট কবেনের। আবার দেবব্রত রায় যখন তিরিশ হাজার টাকার বিনিময়ে ধরিয়ে দেন বন্ধুদের, মনে পড়ে যায় জুডাসের কথা। যিশুকে ধরিয়ে দিতে সেও তো তিরিশটি মুদ্রাই নিয়েছিল। মনস্তাত্ত্বিক এই নাটকে প্রতিটি চরিত্রই অন্তরের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত; প্রত্যেকেই জানে তারা পাপী অথচ পাপকে একই সঙ্গে লালন এবং ঘৃণা করার বিষম প্রয়াস তাদের মধ্যে। স্বয়ং ডাক্তারবাবুও তার ব্যতিক্রম নন। অবশেষে মৃত্যুতেই সব দ্বন্দ্বের অবসান।
         
টানটান উত্তেজনায় ভরা দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) এই নাটকটির আলো এবং মঞ্চেও নতুনত্বের আভাস। স্পট লাইটের অসাধারণ ব্যবহার দেখা গেল। অভিনয়ও যথেষ্ট পরিণত। যদিও চিন্তাভাবনায় আরও অভিনবত্ব আনার অবকাশ ছিল, তাও এমএডি-র এই নাটক থিয়েটারে এক নতুন ইঙ্গিত। তবে এ সময়ের ইয়ুথ অফ কলকাতা সেদিনের বাগবাজার অ্যামেচার হয়ে উঠবে কি না সেটা ভবিষ্যৎই বলবে।

প্রযোজনা: এমএডি
নাটক ও নির্দেশনা: অরিত্র সেনগুপ্ত
অভিনয়: সৌমেন্দ্র ভট্টাচার্য, অরিত্র সেনগুপ্ত, সৌম্য মুখোপাধ্যায়, অগ্নি দেববর্মণ, শর্মিষ্ঠা পাণ্ডে, সোহম মজুমদার, সায়ন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়
আলো: আদিত্য কৌর
মঞ্চ: অর্ক সেনগুপ্ত

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

মোস্ট ওয়ান্টেড জামাই

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 132 জন

মহাকরণে মুরগি চমক

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 63 জন

বিষ রঙে 'বিষাক্ত' সবজি

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 90 জন

ফিরে আসছে সুপারম্যান

ওয়ার্নারব্রাদ্রার্সপিকচার্স

দেখেছেন 165 জন

কলকাতার ভিড়ে নাকাল রণবীর

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 132 জন