নাট্য সমালোচনা

উৎসবের অন্বেষণ

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১২

Anweshan Natya Utsav at Presidency College

ভবিষ্যতের জন্য প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিল এই নাট্য উৎসব। ছবি- সৌভিক চক্রবর্তী

সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘অন্বেষণ’ আয়োজিত নাট্য উৎসব অনুষ্ঠিত হল ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু’ দিনে মোট ৬টি নাটক মঞ্চস্থ হল এখানকার ডিরোজিও সভাগৃহে।

৩ সেপ্টেম্বর তিনটি নাটক মঞ্চস্থ হল। প্রথম নাটক ‘জাতিস্মর’-এর প্রযোজনায় ‘চোখের ভুল ভেবে ক্ষমা করে দেবেন’। কিছুদিন আগেই সাহারা ইন্ডিয়া ড্রামা কম্পিটিশনে এই নাটকটি প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। প্রত্যেকদিন খবরের কাগজ খুললেই যখন ধর্ষণের খবর দেখি, তখন সমকালকে বড্ড নগ্ন করে দেখিয়ে দেয় এই নাটক। যদিও এটি পথনাটকের ফর্মে তৈরি, তবুও মঞ্চে দাপিয়ে অভিনয় করলেন অভিনেতারা। ধর্ষিতা হওয়ার পর একটি মেয়েকে সমাজ কীভাবে দাগী করে দেয়, তাই দেখাল এই নাটকটি। নাটকটি লিখেছেন সৌম্য পাকড়াশি, নির্দেশনায় সাগ্নিক সাহা। আর পরিকল্পনায় প্রজ্ঞা দেবনাথ।

দেখুন গ্যালারি : অন্বেষণ নাট্য উৎসব

 

পরবর্তী নাটক এম.এ.ডি-র প্রযোজনায় ‘ক্লিভেজ ক্রনিকলস্’। সমকামিতা বিষয়ক অনেক অস্বস্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাল নাটকটি। আদতে এ এক স্বামী স্ত্রীর গল্প; সমকামী স্বামীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে স্ত্রীও কীভাবে সমকামিতাকে আশ্রয় করে- তারই উপাখ্যান ‘ক্লিভেজ ক্রনিকলস’। কাহিনিসূত্রে অভিনবত্ব আনার চেষ্টা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো উত্তরণে পৌঁছাতে পারল না এই নাটক।

এদিনের শেষ নাটক ‘অন্বেষণ’ প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’। রূপক সাঙ্কেতিকতার ধারায় ‘রক্তকরবী’ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক; এসময়ে থিয়েটারে ‘রক্তকরবী’-র আঙ্গিক নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। ‘অন্বেষণ’-এর ‘রক্তকরবী’-ও এমনই একটি গবেষণা। এ নাটকে নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করলেন তিনজন অভিনেত্রী; মানসিক অবস্থা পরিবর্তনের ভিত্তিতে নন্দিনীকে আলাদা চরিত্র হিসেবে তৈরি করলেন নির্দেশক। চিরকালীন এই নাটকটিকে নতুন ভাবে উপস্থাপিত করল ‘অন্বেষণ’। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়- ক্লাসিকাল রীতির পোশাক পরিচ্ছদের সঙ্গে মঞ্চভাবনা এবং গানের ব্যবহার সামঞ্জস্য রাখতে পারল না। রঞ্জনের মৃত্যুর পর অনুষে অনাদিলের ‘এখন বোধহয় ফুল ঝরানোর পালা’ গানটি বড়ই ফ্যাকাশে লাগল। মঞ্চসজ্জায় অভিনবত্ব থাকলেও উইংসের পাশ দিয়ে উঠে যাওয়া মইটির প্রয়োজনীয়তা বোঝা গেল না। অবশ্য রাজার চরিত্রে দেবর্ষি চক্রবর্তী বারবার মুগ্ধ করলেন।

নাট্য উৎসবের দ্বিতীয় দিন ৪ সেপ্টেম্বর মঞ্চস্থ হল আরও তিনটি নাটক। এদিনের প্রথম নাটক ‘দামিন ই কো’। রচনা ও নির্দেশনা সৌম্যরূপ ভট্টাচার্য। একদিন বেদ পড়ার অভিযোগে শুদ্র শম্বুককে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন রাজা রাম, আর এ সময়ে ‘দামিন ই কো’-তে পুলিশি অত্যাচারে মারা গেল দশ বছরের মন্টু মাহাতো। এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে নাট্যকার দেখালেন- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোষণের ধরন পাল্টে যায় মাত্র, তার চরিত্র একই থাকে। কিন্তু শম্বুকের মৃত্যুর সঙ্গে মন্টু মাহাতোর এই মৃত্যুকে যেন অনেকটা  জোর করে মিলিয়ে দেওয়া! দুটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু যদিও ঘটেছে; কিন্তু কার্যকারণ তো আলাদা। যাই হোক, দর্শকের যথেষ্ট প্রসংসা পেল নাটকটি।

পরবর্তী নাটক ‘তারপর’; প্রযোজনায় ‘জাতিস্মর’। নাটক রচনায় সৌম্য পাকড়াশি, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সাগ্নিক সাহা। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়’। রাজা উলঙ্গ; তাঁকে ঘিরে স্তাবকবৃন্দের ভিড়। তাদের কেউ ক্ষমতালোভী, কেউ প্রবঞ্চক। সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, কিন্তু সবাই বলছে সাবাস সাবাস। শেষমেষ ভিড়ের ভেতর থেকে একটি শিশু বেরিয়ে এসে বলল, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’? তারপর কী হল? সেই নিয়েই নাটক ‘তারপর’। কবিতার শিশু নাটকে হয়েছে একটি ছেলে। অদ্ভুত স্যাটায়ার ছড়িয়ে আছে নাটকটির পরতে পরতে। শাসকবিরোধী থেকে শুরু করে গা বাঁচিয়ে চলা প্রতিবেশী- কাউকেই রেয়াত করলেন না নাট্যকার। ছেলেটির মৃত্যুর পর হাততালি আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মনে হল, এভাবেই হয়তো বিপ্লব আসে। আগাগোড়া ছন্দে লেখা এই নাটক প্রসেনিয়ামের রীতিপ্রথাকে সহজেই অস্বীকার করল। পুরো সভাগৃহ ব্যবহার করে চলল অভিনয়; প্রায় এক ঘন্টা দর্শককে পলক ফেলার অবকাশ দিলেন না নির্দেশক। মঞ্চসজ্জায় দেবজিৎ ঠাকুর এবং আবহে সাম্যদীপ সাহা, সূর্য বসু মুন্সিয়ানার পরিচয় দিলেন। আলোয় উত্তীয় জানা এক অন্য মাত্র যোগ করলেন নাটকটিতে। কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ বাদ দিলে নজর কাড়ল ‘তারপর’।

এদিনের শেষ নাটক ‘ফোর্থ বেল’ প্রযোজিত ‘১৫ মিনিটস টু ফেম’; নাটক ও নির্দেশনায় অনিরুদ্ধ দাসগুপ্ত। এদিন এই নাটকটির চতুর্থ অভিনয় ছিল। আগেই এই বিভাগে নাটকটির সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে; বাকি কিছু বলার নেই। অবশ্য চতুর্থ অভিনয়ে আরও পরিণত লাগল ‘ফোর্থ বেল’-কে। ‘তারপর’-এর মতো একটি রাজনৈতিক নাটকের পর দর্শককে রিলিফ দিল এই মন ভাল করা নাটকটি।

অন্বেষণ আয়োজিত নাট্য উৎসবের এটি ছিল প্রথম বর্ষ। ভিন্ন স্বাদের ৬টি নাটক ভিড় করে দেখলেন দর্শকরা; ভবিষ্যতের জন্যও প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিল এই নাট্য উৎসব।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

সারদার বাস্তু ঘুঘু

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 72 জন

ইতিহাসের পাতায় ছন্দা-টুসি

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 52 জন

ক্রিকেটার না ক্রিমিনাল?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 104 জন

ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 83 জন

সিনেমার মতো নাটক

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 146 জন