নাট্য সমালোচনা

অয়দিপউস

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২

riview

অনির্বানবাবু না চাইতেও রিভিউটা বেরিয়েই গেল। ছবি- সৌভিক চক্রবর্তী।

দৃশ্যপটের নাটক অয়দিপউস দেখার জন্য কয়েকটা বাধা পেরোতে হল। প্রথমে যখন মধুসূদন মঞ্চে ফোন করে সংরক্ষিত আসনের কথা বললাম, ওঁরা বললেন সংরক্ষিত আসনের ব্যাপারে নির্দেশকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। অতঃপর নির্দেশক অনির্বান ভট্টাচার্যকে ফোন করে জানালাম আমি নাটকটির রিভিউ করতে চাই। অনির্বানবাবু সাফ জানিয়ে দিলেন উনি এই নাটকটির রিভিউ করাতে চান না। তখন তাঁকে অনুরোধ করলাম আমার নামে দুটো অগ্রিম টিকিট রেখে দিতে। আশ্বাস দিলেন অনির্বানবাবু। পরদিন মধুসূদন মঞ্চে টিকিট আনতে গিয়ে দেখি এরকম কোনও টিকিট রাখা নেই। অনির্বানবাবু হয়তো বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। যাই হোক, শেষপর্যন্ত এক্কেবারে পেছনের সারিতে বসে দেখতে হল দৃশ্যপটের নাটক অয়দিপউস। আর যেহেতু ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, তাই অনির্বানবাবু না চাইতেও রিভিউটা বেরিয়েই গেল।

সেটা ছিল ১৯৬৪ সালের ১২ জুন; নিউ এম্পায়ার প্রেক্ষাগৃহে প্রথমবার মঞ্চস্থ হয়েছিল বহুরূপীর নাটক 'রাজা অয়দিপাউস', শম্ভু মিত্রর নির্দেশনায়। তারপর বহুদিন কেটে গেছে; প্রায় ৫০ বছর পরে বাংলা থিয়েটারে আবার ফিরে আসছেন অয়দিপউস। দৃশ্যপটের নতুন নাটক 'অয়দিপউস'-এ। ইতিহাসবিদদের মতে অয়দিপউস কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, কিংবদন্তি। এই কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে গ্রিক নাট্যকার সফোক্লেস লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ট্র্যাজেডি। তবে সফোক্লেস এর আগে এবং পরে অনেক নাট্যকারই অয়দিপাউসকে নিয়ে নাটক রচনা করেছেন।

তো, থিবস এর রাজা লাইয়ুস একদিন দৈববাণী শুনতে পান- তাঁর ছেলে তাঁকে হত্যা করবে। এই ছেলেই অয়দিপাউস। রাজা তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু রাজার নির্দেশ ঠিকমত পালিত হল না। অয়দিপাউস বড় হলেন করিন্থে; সেখানেও দৈববাণী হল তিনি তাঁর বাবাকে হত্যা করে তাঁর মাকে বিয়ে করবেন। ভয়ে করিন্থ ছেড়ে পালালেন তিনি। পথে অজান্তে হত্যা করলেন লাইয়যুসকে এবং থিবস এর রাজা হলেন; বিয়ে করলেন লাইয়ুসের পত্নী ইয়কাস্তাকে। ক্রমশই সব জানতে পারলেন অয়দিপউস। নিজেকে অন্ধ করে অনিচ্ছাকৃত পাপের শাস্তি দিলেন; আত্মহত্যা করলেন রানি ইয়কাস্তা। মোটের ওপর কিংবদন্তি এটাই- পরবর্তীকালে নাট্যকারদের চেতনার রঙে সেজে উঠেছেন অয়দিপউস। শম্ভু মিত্র যে নাটকটি লিখেছিলেন, তা ছিল সফোক্লেসের ইয়েটসকৃত অনুবাদ নির্ভর। কিন্তু দৃশ্যপটের প্রযোজনার মূল ভিত্তি রোমান নাট্যকার সেনেকা এবং কয়েকটি জায়গায় নাট্যকার হর ভট্টাচার্য নিজস্ব চিন্তা ভাবনার প্রয়োগ করেছেন। ফলে দৃশ্যপট এবং বহুরূপীর নাটক দুটির মধ্যে মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। সম্পূর্ণ অন্যভাবে ইয়কাস্তার মৃত্যু দৃশ্য উপস্থাপিত হয়েছে এ নাটকে। এখানে ইয়কাস্তা দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস দিচ্ছেন না; বরং অন্ধ অয়দিপউস এর কথা বলতে বলতে নিজের চুলের কাঁটাটি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যোনিতে- যে পিচ্ছিল সুড়ঙ্গ দিয়ে পুত্র এবং স্বামীর জন্ম দিয়েছেন; সেই অভিশপ্ত পথেই ডেকে নিলেন মৃত্যুকে।

এমন একটি ধ্রুপদী নাটককে যথাযথভাবে মঞ্চস্থ করা একটি চ্যালেঞ্জ ছিল এবং তাকে সফল ভাবেই অতিক্রম করল দৃশ্যপট। এ নাটকে অয়দিপউস এর ভূমিকায় অভিনয় করলেন দেবশঙ্কর হালদার। শম্ভু মিত্রের অয়দিপাউস দেখিনি, কিন্তু দেবশঙ্কর অনন্য। থিবস এর পরাক্রমশালী রাজা এবং দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত অয়দিপউস, এই দুই বিপরীত মেরুর মানসিক অবস্থা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা দেবশঙ্করের পক্ষেই সম্ভব। সব কিছু জানার পর পাগলের মতো হাহাকার করছেন অয়দিপউস; দেবশঙ্করের মেঘমন্দ্র কন্ঠস্বর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে কান্না, প্রেক্ষাগৃহের অদ্ভুত বিষণ্ণ নিস্তব্ধতা সঙ্গত করছে তাকে- এ এক আশ্চর্য মনখারাপের দুনিয়াদারি। ইয়কাস্তার ভূমিকায় সেঁজুতি মুখোপাধ্যায় সাবলীল অভিনয় করলেন; স্ত্রীসত্তা ও মাতৃসত্তার দ্বন্দে যথার্তই ক্ষতবিক্ষত লাগল তাঁকে। নাটকটির মঞ্চ সজ্জা এবং আবহ সঙ্গীতও অনবদ্য; ময়ূখ-মৈনাকের আবহে বারেবারেই আভাসিত হলো ট্র্যাজেডির আসন্ন দুর্যোগ। নাটকের অন্যতম সম্পদ জয় সেনের আলো; গোটা নাটকটিকেই ধরে রাখলেন তিনি।
 
অনির্বান ভট্টাচার্যর অয়দিপউস ইতিমধ্যেই বাংলা থিয়েটারে সাড়া ফেলে দিয়েছে! তবে কোরাস অংশগুলির ক্ষেত্রে আরেকটু যত্নবান হলে নাটকটি সম্পূর্ণতা পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

নাটক : অয়দিপউস
প্রযোজনা : দৃশ্যপট
নাটক : হর ভট্টাচার্য
নির্দেশনা : দেবশঙ্কর হালদার
অভিনয় : দেবশঙ্কর হালদার, সেঁজুতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখ

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

জিৎ-শুভশ্রীর নতুন খেলা

রিলায়েন্স এন্টারটেনমেন্ট রিজিওনাল

দেখেছেন 232 জন

হিজড়াদের স্বীকৃতি সুপ্রিম কোর্টের

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 87 জন

অর্জুন-আলিয়ার ব্রেক-আপ

টি-সিরিজ

দেখেছেন 149 জন

মোহনবাগানের কোচ হবেন মরগ্যান?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 106 জন