নাট্য সমালোচনা

জীয়নকাঠি

অরিজিতা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা,৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২

drama riview

আর্শিনগরে ঠিক খুঁজে পাবে হারিয়ে ফেলা নিজেকে। ছবি- থিয়েলাইট।

সত্যিই তো, এই যে শহরে এত এত নাটক চলছে, রবীন্দ্রনাথ থেকে শেক্সপীয়ার হয়ে পুরাণ অব্দি... কিন্তু কই, রাক্ষস-খোক্কস, সোনার কাঠি-রূপোর কাঠি, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীরা সব গেল কই? সেই কবে এক মেঘবালিকা বলেছিল জানি, 'সেই তো একই রাজার কুমার পক্ষিরাজে... শুনব না আর।/ ওসব বাজে'। কিন্তু যতদূর জানি, 'ঠাকুমার ঝুলি'-র বাজার আজও ঈর্ষনীয়... রাক্ষস কমিউনিটি নাই বা দিল ভোট, কিন্তু আরও কিছু দায়িত্ব কি থেকে যায় না রূপকথার রাজত্তি নিয়ে? বিলেতে যদি হ্যারি পটারের সিনেমা হতে পারে আমাদের রূপকথা কমতি কিসে? নিদেনপক্ষে থিয়েটার গণ্ডির মধ্যেও ব্রাত্য কেন আমাদের 'পরীকথন'?

সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে ছোটদের ঠোঁটফোলানো অভিমান একটু হলেও কমানোর চেষ্টা করল 'থিয়েলাইট' নাট্যদল। দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদারের 'ঠাকুরমার ঝুলি'-র গল্প জুড়ে জুড়ে বেশ একখানা ঝলমলে নাটকের উপস্থাপনা দেখলাম বহুদিন পর। কলকাতায় এর মধ্যে কবে রূপকথা নিয়ে নাটক হয়েছে মনে পড়ছে না।  বরং শান্তিনিকেতনের শারদোৎসবে ছোটদের করতে দেখেছি নাটক 'ঘ্যাঁঘাসুর'। ব্যক্তিগতভাবে জানি, বিশ্বভারতীর শিক্ষাসত্রের অধ্যাপক মহঃ মোঝারুল হামিদ অনেকদিন কাজ করেছেন রূপকথাকে মঞ্চে তুলে আনার জন্য। বহু প্রচলিত আখ্যানকে নাট্যরূপ দিয়েছেন অনবদ্য শৈলীতে... কিন্তু কলকাতার নাট্যদলের মধ্যে ইদানিংকালে শুধু থিয়েলাইট এগিয়ে এল নাটক 'জীয়নকাঠি' নিয়ে। গপ্পোটা সেই তিন বন্ধু রাজপুত্র, মন্ত্রিপুত্র আর সদাগরপুত্রকে নিয়ে। সেই যে তারা একদিন ঘুরতে ঘুরতে অদ্ভুত জঙ্গলে এল... তারপর সেই দুষ্টু রাক্ষসী, তার মায়াজাল... অন্য রাজার রানি হয়ে রাক্ষসী বাধাল হাড় মড়মড়ি রোগ, আর রাজাকে বলে রাজপুত্রকে দিয়ে আনতে পাঠালে তার ওষুধ 'বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি'... তারপরের গল্পটাও কে না জানে? রাজপুত্তুর গেল ঘুমন্তপুরীতে ওষুধ খুঁজতে, সেখানে এক রাজকন্যা ঘুমিয়ে থাকে সোনার কাঠি আর রূপোর কাঠির অদলবদলে... বাকিটা যদিও জানা, তবু গল্প বলে দেব না।

দেখুন গ্যালারি

সবটুকু জানার পরেও কি উৎসাহ ছিল পুরোটা দেখার? আসলে ছোটবেলায় রূপকথাই তো ছিল আমাদের জীয়নকাঠি... এই আবেগটা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বইছে, আর এমন একটা জিনিস কিনা নাটকে হয় না! এই নাটকের নাট্যরূপ দিয়েছেন সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়, খুব ভাল লাগল তাঁর গাঁথুনির কাজ। নিখুঁতভাবে কেবল যে গল্প জুড়ে গিয়েছেন তাই নয়, অনেক প্রচলিত ছড়া, প্রবাদকে স্ক্রিপ্টের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন সাবলীলভাবে। সমাজ বাস্তবতার একটা ছাপ বরাবরই এই গল্পগুলোতে এসেছে, নাট্যরূপ দেওয়ার সময় সঞ্জয় সেটাকে মাথায় রেখেছেন বোঝা যায়। আসলে লোকশিক্ষার আদিম উপকরণ হিসেবে আমরা অনেকেই রূপকথা বা লোককথা বা উপকথাকে চিনি না। রূপকথা শুধু অলীক কল্পনাবিলাস তো নয়, নেহাত ছোটদের জন্য তৈরি আষাঢ়ে গপ্পোও নয়। অক্ষর আসার অনেক আগে এই সব গল্প তৈরি হয়ে গিয়েছে মুখে মুখে। 'বাংলার উপকথা' ( Folk Tales of Bengal গ্রন্থের অনুবাদ) বইয়ের নিবেদনে লীলা মজুমদার লিখছেন, এই গল্পগুলো 'আমাদের প্রাণের ইতিহাস, ইচ্ছার কিংবদন্তী'। আর তাই আজকের জটিলবাস্তবের বিভ্রান্তিতে শেক্সপীয়ার-সার্ত্র-রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দাবি করেন দক্ষিনারঞ্জন বা রেভারেন্ড লালবিহারী দে। নির্দেশক অতনু সরকার সাহস দেখালেন বটে... আরও ভাল লাগল- নির্দেশনার কোথাও অকারণ ভাবগম্ভীর 'প্রতীক'-এর ব্যবহারে রূপকথার সারল্য নষ্ট করেননি অতনু। নামটা শোনামাত্র ঠিক যে রংচঙে রাজা-রানি, কথা বলা গাছ, ভীষণদর্শন রাক্ষসদের মনে পড়বে, তাদেরকেই যেন মঞ্চে তুলে আনল 'জীয়নকাঠি' কোন রকম ভণিতা না করেই। অভিনয়েও প্রত্যেকে বেশ জমিয়ে দিলেন। বেশ ভাল লাগল রাজপুত্রের ভূমিকায় ঋষভ বসু আর বিদূষকের ভূমিকায় দিব্যেন্দু দাসকে। অসাধারণ অভিনয় করলেন রাক্ষসীর চরিত্রে শম্পা দাস সরকার। আলো আর শব্দের কাজেও ছিল মায়াজালের আবরণ। শুধু বেশ কিছু জায়গায় বাইরে থেকে রেকর্ড করা গান এবং সংলাপের শব্দ প্রক্ষেপণে একটু অসামঞ্জস্য ছিল। এছাড়া সাজপোশাক, ঘোড়া-গাছ, শুকপাখির বুকের মধ্যে রাক্ষসীর প্রাণ সবটুকু মিলিয়ে জীয়নকাঠির আরও দর্শক সংখ্যা আশা করি।

শেষ নিবেদন জানাই শহর কলকাতার প্রতি, এত বুড়িয়ে যেও না, যে না বুঝলেও বোঝার ভান করে কঠিন দাঁতভাঙা বিষয়ে আত্মবিসর্জন দিতে হয়। এই শহরে আজও আছে 'জীয়নকাঠি'। একবার হদিশ করে দেখে এস... ওই আর্শিনগরে ঠিক খুঁজে পাবে হারিয়ে ফেলা নিজেকে।

'আমার কথাটি ফুরোল
নটে গাছটি মুড়োল...'

নাটক : জীয়নকাঠি
প্রযোজনা : থিয়েলাইট
নাট্যরূপ : সঞ্জয় চট্ট্যোপাধ্যায়
নির্দেশক : অতনু সরকার
আলো : মনোজ প্রসাদ
অভিনয় : ঋষভ বসু, শম্পা দাস সরকার, দিব্যেন্দু দাস, জেনি শ', শঙ্কু কুমার দাস, দেবরাজ গঙ্গোপাধ্যায় ও অন্যান্য।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন