নাট্য সমালোচনা
রাজার খোঁজে
সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা, ১৪ অক্টোবর ২০১২
১৮ জুলাই ১৯৪২, পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহর :
রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের পোলিশ অনুবাদের প্রথম এবং শেষ অভিনয়। অনুবাদক নাট্যকার তথা প্রযোজক ড: জানুস করচখ। পরিচালিকা মিস স্তেফানিয়া; অভিনেতা অভিনেত্রীরা সকলেই আওয়ার হোম অনাথ আশ্রমের আবাসিক। এই প্রযোজনাটি একটি বিশেষ কারণে তাৎর্যমন্ডিত। কারণ পরদিনই ইহুদি হওয়ার অভিযোগে আওয়ার হোম আশ্রমের সমস্ত আবাসিককে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ট্রেবলিন্কা গ্যাস চেম্বারে। হিটলারের আর্য বাহিনি যখন ঘৃণ্য ইহুদিগুলোকে ধরতে এসেছিল, আশ্চর্যভাবে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এসেছিল আওয়ার হোমের অবাসিকরা। চোখে জল ছিল না তাদের; কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার অবকাশটুকু দেয়নি তারা। মার্চ করতে করতে তারা উঠেছিল মৃত্যুহিম রেলগাড়িতে। শাসকের মুখে ঠাস করে গান ছুড়ে মারা বোধহয় একেই বলে!
পুনশ্চ: হিটলার শাসিত জার্মানিতে ডাকঘর নাটকটি নিষিদ্ধ ছিল।
৩ অক্টোবর ২০১২ :
অকাদেমি অব ফাইন আর্টস, কলকাতায় সন্ধ্যে ৬.৩০টায় মঞ্চস্থ হল বহুরূপীর নতুন নাটক 'রাজার খোঁজে'। ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটকটি; এবছর তার শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে নানা গবেষণাধর্মী প্রযোজনা মঞ্চস্থ হচ্ছে কলকাতায়। সুমন মুখোপাধ্যায়ের রাজার চিঠি, মনীশ মিত্রর জার্নি টু ডাকঘর তার উদাহরণ। বহুরূপীর 'রাজার খোঁজে' নাটকটি তেমনি একটি গবেষণা। নাটক লিখেছেন রঙ্গন চক্রবর্তী, নির্দেশনায় তুলিকা দাস।
পোল্যান্ডের ওয়ারশ-তে শুরু হচ্ছে নাটক। সময়কাল ১৯৪২, বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বারুদের গন্ধে ভারি হয়ে আছে বাতাস। এক উন্নাসিক আর্য রাজার অত্যাচারে ক্রমশই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে ইহুদিরা। ইউরোপে স্থাপিত হবে নতুন আর্য সাম্রাজ্য। কোনও দূষিত রক্তের মিশেল থাকবে না তাতে। মনোভাবটা এরকম ছিল ডার্টি নিগার আর বেজন্মা সমার্থক শব্দ, তাই শেষ করে দাও ইহুদিদের। এই ভয়াবহতার মধ্যে একদল ইহুদি শিশু-কিশোরকে আগলে রাখেন এক ডাক্তার তাঁর অনাথ আশ্রমে। একদিন তাদের গলায় তারা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়- দাগী হয়ে যায় তারা। অবশেষে আসে সেই চরম বার্তা, ট্রেবলিন্কা যাওয়ার ছাড়পত্র! তারপর কী হল, ইতিহাস জানে।
এই পটভূমির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর-কে মিলিয়ে দিলেন নাট্যকার। নাটকের অন্তরে বয়ে চলল সেই ছোট্ট ছেলেটার অদ্ভুত সব স্বপ্নগুলো যা একশ বছর ধরে অভিভূত করে রেখেছে আমাদের। ডাকঘর তো বলতে চায় মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই- মৃত্যু আসলে এক ধরনের আরোগ্য। তখন অমলের চার দেওয়াল আর ইহুদি শিশুদের ঘেতোয় পার্থক্য থাকে না কোনও। যেমন করে ড: করচখ আশ্রমের শিশুদের ভয়কে জয় করতে শিখিয়েছিলেন, তেমন করেই তো একদিন ঠাকুরদা অমলকে বলেছিল রাজার চিঠি এসেছে। এই রাজার কাছে আর্য অনার্য ভেদ নেই, নেই সাদা কালোর পার্থক্য।
এত বড় একটি বিষয়কে নাটকে ধরা বেশ শক্ত কাজ ছিল, কিন্তু তাতে সফল রঙ্গন চক্রবর্তী এবং নির্দেশক তুলিকা দাস। ডাক্তারের ভূমিকায় দেবেশ রায় চৌধুরী অসাধারণ অভিনয় করলেন। এরিয়েলের (অমল) চরিত্রে রিমিল সেন এর অভিনয় চোখে পড়ার মতো। বাকিরা অভিনয়ের ক্ষেত্রে আরেকটু যত্নবান হলে ভাল হত। নাটকটির আবহ রচনা করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র; অসামান্য আবহ সঙ্গীত নাটকটির অন্যতম সম্পদ। তবে জয় সেনোচিত আলোর ব্যবহার দেখা গেল না নাটকে!
রাজা আসে রাজা যায়, লাল জামা গায়- নীল জামা গায়! জামা কাপড়ের রঙ বদলায়, দিন বদলায় না। শাসকের মুখ একই থাকে, বদল হয় না দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। তাই এই নাটকের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় কাঁটাতারের সীমানা ভেঙে ফেলার অঙ্গীকার। 'আমাদের ঘর না থাকার ইতিহাস অন্যদের ঘরছাড়া করার অধিকার দেয় না'। তাই প্রতিবাদ ছড়িয়ে যায় পোল্যান্ড থেকে প্যালেস্টাইন. আফগানিস্তান থেকে আফ্রিকায়। বলে, ভরসা থাকুক... মানুষ একদিন রাজার সুরে গান গাইবে।
নাটক : রাজার খোঁজে
প্রযোজনা : বহুরূপী
নাটক : রঙ্গন চক্রবর্তী
নির্দেশনা : তুলিকা দাস













