নাট্য সমালোচনা

রাজবাড়িতে খাসদখল রবি ঠাকুরের

অংশুমান ভৌমিক
কলকাতা,৬ নভেম্বর ২০১২

grihaprabesh

‘গৃহপ্রবেশ’ হল শোভাবাজার রাজবাড়ির নাটমন্দিরে। ছবি- অন্য থিয়েটার।

অকাদেমি বা রবীন্দ্রসদন নয়, ‘গৃহপ্রবেশ’ হল শোভাবাজার রাজবাড়ির নাটমন্দিরে।

কী, বুঝলেন না তো? রসুন, বলছি। দেড়শো ছাড়িয়ে একশো একান্ন পেরিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; কিন্তু এখনও তাঁর লেখালেখি থেকে নতুন নতুন নাটক জন্ম ক্রমবর্ধমান। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক ‘টেগোর কমেমোরেশন গ্রান্ট স্কিম’ নামে একটি লক্ষ্মীর ঝাঁপি খুলেছিলেন বছর কয়েক আগে। এই দানখয়রাতির দৌলতে মুড়িমুড়কির মতো রবীন্দ্রনাটক হয়েছে এই ক’ বছর। পরব ফুরিয়েছে, এখন ঝাঁপি তুলে রাখার সময় হল। আর এই হেমন্তের পড়ন্ত বেলায় একটি বিশুদ্ধ রবীন্দ্রনাট্যের সংস্পর্শ হল আমাদের। নাটক ‘গৃহপ্রবেশ’। বিভাস চক্রবর্তীর দল ‘অন্য থিয়েটার’-এর ডাকে এ নাটক নির্দেশনার দায়িত্ব নিয়েছেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। প্রসেনিয়াম স্টেজে নয়, ৩১ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ‘গৃহপ্রবেশ’ অভিনীত হল শোভাবাজার রাজবাড়ির নাটমন্দিরে। মশলা দিলচস্ত আর বাবুর্চি ওস্তাদ হলে সাইট স্পেসিফিক পারফর্ম্যান্স কত উপাদেয় হতে পারে, তারই উদাহরণ হয়ে রইল এই ব্যতিক্রমী নাট্য আয়োজন।

সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ থেকে ডান দিকে মোড় নিয়ে রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে ঢুকে যাঁরা শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো দেখতে এসেছেন, তাঁরা জানেন মুখোমুখি দুই তরফের বাড়িতেই দুর্গাপুজো হয়। বড় তরফের বাড়ি বাঁ দিকে, এলাকায় যার ডাকনাম বাগওয়ালা বাড়ি। এই বাগওয়ালা বাড়ির ঠাকুরদালান রাজা রাধাকান্ত দেব থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিসুরভিত। উনিশ শতকের বাবু কলকাতার অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র ছিল এই বাড়ি। বাড়ির নাটমন্দিরটিকে ধ্রুপদী গ্রিক স্থাপত্যের আদলে গড়েছিলেন রাজারা। বাবুয়ানির দিন তো কবেই ফুরিয়েছে, রাজবাড়ি ভেঙে কাতারে কাতারে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিট বরাবর। সুতানুটি পরিষদ আর কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন উঠে-পড়ে না লাগলে নাটমন্দিরের ডোরিক পিলারগুলিও হুড়মুড়িয়ে পড়ত এতদিনে। অত সাধের পঙ্খের কাজ বাঁচানো না গেলেও কয়েক বছর আগে নাটমন্দিরের হাড়-জিরজিরে দশা কেটেছে। মাঝেসাঝে মজলিসও বসে। একটু-আধটু গানবাজনা হয়। এবার নাটক হল। উত্তর কলকাতার কোনও বনেদি বাড়ির দালানকোঠায় এ নাটক করতে চেয়েছিলেন বিভাস; দায়িত্ব দিয়েছিলেন দেবেশকে। খুঁজেপেতে শোভাবাজার রাজবাড়ির নাটমন্দিরকেই মনে ধরল তাঁদের। পিরিয়ড ড্রামার জন্য পিরিয়ড ভেন্যু। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি ভবনের উঠোনেও অবশ্য মাঝেসাঝে নাটক হয়। দেখতে দেখতে গা-ছমছম করে। আবার বছর আটেক আগে বিডন স্ট্রিটের মোড়ে ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের বাড়িতে ‘গওহরজান’ করেছিলেল ঈশিতা মুখোপাধ্যায়ের ‘উষ্ণিক’। স্থানমাহাত্ম্যগুণে একশো বছর আগেকার কলকাতায় অনায়াসে উড়ান দেওয়া গিয়েছিল।

তো, এবারে হেমন্ত গোধূলিতে শোভাবাজার নাটমন্দিরের গাড়িবারান্দায় এসে পড়তেই দেখি- গৃহকর্তার মতো বিভাস অতিথি অভ্যর্থনা করছেন। অন্য থিয়েটার-এর একজন আবার বললেন, জুতোজোড়া খুলে ভিতরে আসতে। ঠিক যেমনটি গেরস্থবাড়িতে করি আমরা। করলামও। নাটমন্দিরে ঢুকবার মুখে অন্য একজন একটি হাতপাখা ধরিয়ে দিলেন। তৃতীয় একজন দেখিয়ে দিলেন আসন। সাদা-কালো চৌখুপিকাটা মার্বেলের মেঝের অর্ধেকটা জুড়ে ধবধবে সাদা ফরাস পাতা। মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে পথ। তার দু’ ধারে শতখানেক দর্শক সার সার বসে। বাবু হয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে। গুছিয়ে বসতে বসতে একেলে কলকাতার ধরাচুড়ো খুলে সেকেলে কলকাতার অন্তরাত্মার কাছে আত্মসমর্পণ করা গেল।

পর্দার আড়াল নেই। পুরো নাটমন্দিরই নাট্যমঞ্চ। আবছায়ায় দেখা যাচ্ছে তিন ফোকরের খিলানের বাঁ পাশে পালঙ্কে শুয়ে আছেন একজন। আবছায়া কেটে গেলে বোঝা গেল- ইনিই যতীন (সুতীর্থ বেদজ্ঞ); সওদাগরি পুঁজির কারবারি। স্ত্রীঅন্ত প্রাণও। অনেক সাধ করে ধারকর্জ করে সাবেক সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে একটি সুরম্য বাড়ি বানিয়েছএন। গৃহপ্রবেশের দিন পাঁজি খুলে বার করলেই হয়। কিন্তু মারাত্মক রোগ হয়েছে তার। মুমূর্ষের সেবাযত্নে স্ত্রী মণির (শর্মিষ্ঠা রায়) অবশ্য কোনও মতি নেই। রোগীর ঘরে তার পা পড়ে না। গাছগাছালি আর স্বজনবান্ধব নিয়েই মেতে আছে অল্পবয়সী মেয়েটি। পাড়াপড়শি (শিপ্রা দত্ত) এ নিয়ে কানাকানি করে। আমল দেন না যতীনের মাসি (কৃষ্ণা দত্ত)। এ বাড়ির রাশ তাঁরই হাতে। কতক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দাদাডর শুশ্রূষার দায়িত্ব নিয়েছে বোন হিমি (পৌলমী বন্দ্যোপাধ্যায়)। ডাক্তার (চন্দন সেনগুপ্ত) অবশ্য জবাব দিয়েছেন। রক্তের সম্পর্কের ভাই অখিল (শ্যামাশিস লাহিড়ি) ঋণের টাকা উশুল করতে মকদ্দমার ভয় দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতে হিমির গলায় গান যতীনের প্রাণভোমরা।

এ প্রযোজনারও প্রাণভোমরা গান। রবীন্দ্রনাথ অন্তত এমনটিই ভেবেছিলেন। সঙ্গীতপ্রয়োগে দেবেশের হাতযশ প্রশ্নাতীত। ‘অন্য থিয়েটার’ তাঁর হাতে এমন কয়েকজন আনকোরা কুশীলবকে তুলে দিয়েছিল, যাদের গলায় সুর আছে, শরীরে ছন্দ আছে। কিন্তু যতীন তো শয্যাশায়ী, চলচ্ছক্তিহীন। বাহাদুর দেবেশ করলেন কী, যতীনের এক অল্টার-ইগোকে (পার্থপ্রতিম পট্টনায়ক) এনে ফেললেন আমাদের মধ্যে। সুদীপ সান্যালের আলোর কারিকুরিতে নাটমন্দিরের আনাচকানাচ এ নাটকের চরিত্র হয়ে উঠছিল; এবার যতীনের অল্টার-ইগোর সঙ্গে কখনও মণি, কখনও বা হিমি ফ্ল্যাশব্যাকে গেল। দ্রোণ আচার্যের সঙ্গীত আয়োজন টাইম জোনগুলিকে শিথিল করে রাখল। পৌলমী, পার্থপ্রতিম, সুতীর্থ- তিনজনই রাবীন্দ্রিক গায়নে পটু। অভিনয়েও অপ্রতিভ নন। ফলে ‘গৃহপ্রবেশ’-এর বিষণ্ণ আবহে যৌবনের রঙ লাগলো। ভারী হয়ে চেপে বসা মৃত্যুচেতনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। প্রতিষ্ঠা করল জাগতিক সুখসমৃদ্ধ একটি অলীক স্বপ্নকে। ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি’-র দৃশ্যায়নে পার্থেনন গড়ার আকাশকুসুম কল্পনা আভাস পেলাম। উনিশ শতকের বাঙালি উদ্যোগপতির লক্ষ্মীমন্ত হবার ক্যাপিটালিস্ট ড্রিমকে ঠাট্টা করা হল, আবার সরস্বতীর দেনাও চুকলো। নাটক হিসেবে ‘গৃহপ্রবেশ’ আহামরি কিছু নয়, কিন্তু নির্মাণসৌকর্যে তার ফাঁকফোকর ঢাকা পড়ে গেল।

নাটমন্দিরের বারো আনাই কাজে লাগিয়েছেন দেবেশ। মেঝে হয়েছে বৈঠকখানা। মঞ্চস্থপতি হিরণ সেখানে দু’-চারটি পিরিয়ড ফার্নিচার সাজিয়ে দিয়েছেন। বিস্তৃত অন্দরমহল হয়েছে খিলানের সামনে, পেছনে, পাশের পরিসর তো বটেই, সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাওয়া ডান দিকের বারান্দাতেও। এই বহুতল গড়ার কেরামতি দেখিয়েছে সুদীপের আলোক পরিকল্পনা। পোড়খাওয়া মেক-আপ আর্টিস্ট শ্রীদাসের রূপসজ্জা অভিজাত অথচ অনাড়ম্বর পটভূমির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে।

জানি, ‘গৃহপ্রবেশ’-এর মতো সাইট স্পেসিফিক প্রোডাকশনের খরচাপাতি অনেক। আমাদের গ্রুপ থিয়েটারের পক্ষে হাতি পোষার সামিল। সহায়ক কলকাতা পৌরসংস্থাও ধনকুবের নয়। তবু সাধ ও সাধ্যের সেতুবন্ধন ঘটিয়ে ‘অন্য থিয়েটার’ যে সম্ভাবনাটিকে উন্মোচিত করলেন, তার জন্য তারা সাধুবাদ পাবেন। একটি হেরিটেজ প্রপার্টিকে সচলায়িত করার পথ তাঁরা কেটে দিয়েছেন, এবার এটির বিপণনের দায়িত্ব নিক পর্যটন দফতর বা কোনও বেসরকারি উদ্যোগ। দেশবিদেশের ভ্রমণার্থীদের জন্য সারা দিনের হেরিটেজ ট্যুরিজম কলকাতায় চালু হয়েছে। হপ্তায় একদিন কী দু’দিন তার গন্তব্য হোক শোভাবাজার রাজবাড়ির নাটমন্দির। এক লপ্তে রবীন্দ্রনাথ অনুভব ও টাইম মেশিনে চড়াই-উতরাই যাতায়াত দুইই হবে ভ্রমণার্থীদের। ভিক্টোরিয়ায় ‘সন-অ-লুমিয়ের’-এর চাইতে কিছু কম মনোহারি নয় এই ‘গৃহপ্রবেশ’- তা তো হলপ করে বলাই যায়।

নাটক : গৃহপ্রবেশ

প্রযোজনা : অন্য থিয়েটার

কাহিনি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নির্দেশনা : দেবেশ চট্টোপাধ্যায়

অভিনয় : চন্দন সেন, কৃষ্ণা দত্ত, শিপ্রা দত্ত, শ্যামাশিস লাহিড়ি, রবীন দাস, সুতীর্থ বেদজ্ঞ, পার্থপ্রতিম পট্টনায়ক, পৌলমী বন্দ্যোপাধ্যায়, শর্মিষ্ঠা রায়

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

"যাকেই বসাবে সে'ই হবে আমাদের লোক"

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 99 জন

পাক্কা ঘুঘুর মেয়েবাজি

এসকেমুভিজ

দেখেছেন 148 জন

হক কথা বললেন অনুব্রত

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 365 জন