নাট্য সমালোচনা

একটি কোলাজ

অরিজিতা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, ১৫ নভেম্বর, ২০১২

ekti kolaj

বিছিন্নতা, একাকিত্ব কেমন যেন গায়ে লেপটে গেল। ছবি- থিয়েটার নান্দীক

বিছিন্নতা, একাকিত্ব এই শব্দগুলো আজকে দাঁড়িয়ে কেমন যেন গায়ে লেপটে গেল। চল্লিশের দশক বীজমন্ত্রের মতো জপ করতে শিখিয়েছিল সংঘাত আর ছিন্নভিন্নতার ফ্যাকাসে গোঙানি । সমাজতত্ত্ব থেকে সাহিত্য, সিনেমা থেকে থিয়েটার সর্বত্র ছাপ ফেলে এই দূরত্বের সংজ্ঞা আজ আরও পরিণত। সম্প্রতি থিয়েটার নান্দীকের ‘একটি কোলাজ’-এর প্রযোজনা সেই গ্লানির একটা মানচিত্র এঁকে ফেলল মিনার্ভা থিয়েটারের মঞ্চে।

দেখুন গ্যালারি

যে কোনও কিছুর কোলাজ, সে ছবি হোক বা গান-কবিতা- মূলত বিভিন্ন অবয়বকে এক সুতোয় অন্য একটা বৃহত্তর অর্থে পৌঁছে দেয়। ‘একটি কোলাজ’-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। বেশ কিছু নাটক, কবিতা আর গান জুড়ে জুড়ে তৈরি হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার গল্প। তৈরি হল একেবারে সমকালীন রাজনৈতিক চাহিদার বিরুদ্ধে জেহাদ... আর পেলাম সমাজ মানসিকতার সংঘাতের ফাঁকে জিরিয়ে নেওয়া একাকিত্ব। কীভাবে জুড়ে গেল এতগুলো সমস্যা শুধুমাত্র বিভিন্ন সময়ের কবিতা, নাটক আর গানের কোলাজে? শব্দ প্রক্ষেপনের বিশেষ টেকনিক গোটা নাটক জুড়ে বিষয়বস্তুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে একটা 'মেন্টাল ট্রিটমেন্ট' দিচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিরোশিমা কাণ্ডের বেশ কিছু সাউন্ড রেকর্ডিং নাটক শুরুর প্রথম থেকেই তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করছিল মাথায়। ক্রমাগত সেই অস্বস্তিটাই ডালপালা বিস্তার করে জয় গোস্বামীর 'নুন' থেকে রবীন্দ্রনাথের 'আফ্রিকা' ছুঁয়ে 'রক্তকরবী' অব্দি, 'গুরু'-র সম্পাদিত খণ্ড হয়ে যখন প্রথমার্ধ শেষ হল তখন দিব্যি বুঝলাম- অনেকটা পথ কখন চলে এসেছি যেন। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ হয় বাদল সরকারের 'এবং ইন্দ্রজিৎ'-এর অংশ দিয়ে। কিন্তু তার প্রস্তুতি রচনা করতে নির্দেশক নীলাদ্রি চমৎকার বয়ন করেন যাত্রাপথ। ব্রেখট এর অনুবাদ 'ইতিহাস পড়তে শেখা জনৈক শ্রমিকের প্রশ্ন' আমাদের একটা নিদারুণ সমস্যায় ফেলে দেয়। সেই সমস্যা, যেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলে কফি হাউস থেকে বিমলের চায়ের দোকানে সকাল-সন্ধে মধ্যবিত্ত জীবনের হতাশা দূর করি এবং পরিচিত মহলের হাততালি কুড়িয়ে নিয়ে প্রবল তৃপ্তি চরিতার্থ করতে পারিবারিক ভোজের আয়োজন করি পাঁচতারা রেস্তোরাঁয়। এই শ্রমিকের প্রশ্নে হঠাৎ মুখ লুকোতে হয় অন্ধকারে। এখানেই শেষ নয়, সময় আঙুল তুলে সাবধান করে শক্তি চাটুজ্যের কলমে ভর করে, 'সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়/ পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে/ ফুটপাথ বদল হয় মধ্যরাতে'। পাশাপাশি কালের অভিশাপ চিহ্নিত করে কারা যেন আউড়ে যায় হালের কবিতা 'ক্রাইসিস' (শ্রীজাত) । ওই অভাববোধেই জারিত হয় সময়ের 'কথোপকথন'  (পূর্ণেন্দু পত্রী)। একে একে ত্রিংশ শতাব্দী ছুঁয়ে 'অবনী' আর 'অমলকান্তি'-র সন্ধান করে নান্দীক। ওদের কোলাজ প্রচেষ্টা শেষ হয় তারপর।

এই নাটকের শারীরিক অভিনয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে বাস্তবের সঙ্গে কাব্যের মাঝ বরাবর। আসলে শুরু থেকে শেষ অব্দি শুধু একটা অভাববোধ কাজ করেছে বললে ভুল হবে, এই কোলাজের মধ্যে একটা খোঁজ ছিল যেন। তাই অদ্ভুত সামঞ্জস্যে শক্তি থেকে রবীন্দ্রনাথ, জয় গোস্বামী থেকে বাদল সরকার মিলেমিশে যান হারানো চেতনার সন্ধানে, সঙ্গে ছিল নীলাদ্রি এবং সুখেন্দু চক্রবর্তীর নিজেদের লেখা গান। পোশাকেও অদ্ভুত নতুনত্ব ছিল। রবীন্দ্রনাথের নাটকের পোশাকে এই অভিনবত্ব বেশ বিরল। এভাবে নাটক তৈরি করা যায় কিনা সেটা নতুন প্রশ্ন নয়, কিন্তু এই চোখে উত্তরণের গল্প বলা যায়- সেটা প্রমাণ করল থিয়েটার নান্দীক। হতাশা আর অভাবের গল্প শহর জুড়ে, সেই নিদারুণ অভাবের বোধ টুকরো টুকরো অংশের মধ্যে দিয়ে একটা গোটা নাটককে সংক্রামিত করে দিল, জ্বরের আভাস পেলাম দর্শকেরাও। তবু শেষে প্রচণ্ড গ্লানির হলদে ছায়া ভেদ করে উদ্ধত মুঠোর মতো উঠে এল থিয়েটার নান্দীকের প্রযোজনায় 'একটি' 'কোলাজ' সাফল্য।
 
নাটক : একটি কোলাজ
ভাবনা ও পরিচালনা : নীলাদ্রি ভট্টাচার্য্য
প্রযোজনা : থিয়েটার নান্দীক
আলো : মনোজ প্রসাদ
পোশাক : অনির্বাণ সেনগুপ্ত
অভিনয় : কেশব ভট্টাচার্য, অনির্বাণ সেনগুপ্ত, মানস মুখোপাধ্যায়, মৃণ্ময় মণ্ডল, দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়, শর্মিষ্ঠা রায়, সুখেন্দু চক্রবর্তী

 

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বৃহস্পতিবারের ভোট কোলাজ

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 176 জন

মোদীর মনোনয়ন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 153 জন

ফুটন্ত কড়াই কলকাতা, মৃত দুই

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 222 জন

ঋষি-কাঞ্চির ঠুমকা প্রেম

মুক্তা আর্টস

দেখেছেন 258 জন