নাট্য সমালোচনা

নানা ফুলের মালা

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা,১৮ নভেম্বর ২০১২

Natok Riview

নির্দেশনায় দেবেশ রায়চৌধুরী। ছবি- বহুরুপী।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ। হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেছেন যুধিষ্ঠির। পরাজিত দুর্যোধন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বনে বনান্তরে। পাণ্ডবদের চর খুঁজে বেড়াচ্ছে তাঁকে হত্যা করার জন্যে। এখান থেকেই শুরু বহুরূপীর নতুন নাটক 'নানা ফুলের মালা'। যদিও এর মূল নিহিত রয়েছে দুর্যোধন এবং পাণ্ডবদের আদর্শগত পার্থক্যে। নাটকটি মঞ্চস্থ হল গত ৭ নভেম্বর গিরিশ মঞ্চে। নাটকটি রচনা করেছেন অলখ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশনায় দেবেশ রায়চৌধুরী।

এই নাটকে মহর্ষি ব্যাস নতুন দেশের নতুন দেবতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, যিনি হ্রস্ব নন, দীর্ঘ নন, যিনি কিছুই ভোজন করেন না, কিছুই যাকে ভক্ষণ করে না- তখন দুর্যোধন বুঝতে পারেন এই সত্ত্বাটি আসলে দেবতা নন, তিনি রাষ্ট্র। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভারতবর্ষ ছোট ছোট ছোট রাজ্যসীমায় বিভক্ত ছিল। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার, সংস্কার নিয়ে গড়ে উঠেছিল রাজ্যগুলি। দুর্যোধন চেয়েছিলেন এই সব রাজ্যগুলি ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক বহু স্বর; এমনকি বিরুদ্ধ স্বরও। কিন্তু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর ছবিটা পাল্টে গেল। এই সব রাজ্যগুলি যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কেউ পাণ্ডবের পক্ষে, কেউ বা বিপক্ষে। যুদ্ধান্তে এই বিরাট ভূখন্ডের প্রধান রাজশক্তি হয়ে গেলেন পাণ্ডবরাই। রাজত্ব পাওয়ার পর রাজসূয় যজ্ঞ করলেন যুধিষ্ঠির। সমস্ত ভূখন্ডের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিকে একটি রাজশক্তির আওতায় আনার জন্যই এই প্রচেষ্টা। এই নাটকে তার বিরোধিতা করেছেন দুর্যোধন। এখানেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

দেখুন গ্যালারি

এই দ্বন্দ্ব আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশাল ভূখন্ডের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একটি ছাতার তলায় আনতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বহুস্বরের বিলুপ্তি ঘটে। ন্যাশনালিজম আর প্রাদেশিকতার বিরোধ দেখা দেয়। তাই অসম, তামিলনাড়ু আর পাহাড়ের সমস্যা ফিরে ফিরে আসে। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রভাষার কাঁটা মনের মধ্যে খচখচ করে সর্বদাই। আবার বিচ্ছিন্নতাবাদও কাম্য নয়। তাহলে এর সমাধান কোথায়? এ নাটকে একটি সমাধান খুজেছেন যুধিষ্ঠির। দুর্যোধনের দর্শনকেই অনুসরণ করছেন তিনি। খোঁজ শুরু হচ্ছে অখণ্ড জাতিসত্ত্বা এবং সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার। তিনি এক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কথা ভাবছেন যা ভিন্ন স্বরকে প্রতিষ্ঠা দেবে।

বিভিন্ন চরিত্রকে কেন্দ্র করে এই নাটক তার অবয়ব নিয়েছে ক্রমশ। দুর্যোধন এবং পাণ্ডবদের কথোপকথনে বারবার ধরা পড়েছে পাণ্ডবদের দৈন্য, কৃষ্ণের শঠতা। অজান্তেই কখন দুর্যোধনের পক্ষ নিয়েছি আমরা। এখানেই নাট্যকার নির্দেশকের মুন্সিয়ানা। খান্ডব বন পুড়িয়ে অরণ্যচারীদের গৃহহীন করেছিল পাণ্ডবরা। দুর্যোধন তাদের অত্যাচারী বলে চিহ্নিত করলে আজন্মলালিত সংস্কার ভেঙে আমাদের মন সায় দিয়েছে তাতে। বস্ত্রহরণের প্রসঙ্গে দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছেন, কোন ন্যায় বিচারে নিজের স্ত্রীকে পাশা খেলায় বাজি রাখা যায়? যদি রেখেইছিলেন তাহলে যথার্থ পুরুষের মত দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেননি কেন? তখন আমরাও মনে মনে বলেছি- ঠিকই তো! এমনকি দুর্যোধনের মৃত্যুতে থমথমে হয়েছে প্রেক্ষাগৃহ। নিঃশব্দে চোখের জল মুছেছেন আমার পাশের আসনের সহনাগরিক। এভাবেই নাট্যকার আমাদের সংস্কারের মূল ধরে নাড়া দিয়েছেন। অসামান্য নির্দেশনায় দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ হৃদয়কে প্রশ্রয় দিয়েছেন দেবেশ রায়চৌধুরী।

নাটকটিতে দুর্যোধনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দেবেশ স্বয়ং। তাঁর অবিশ্বাস্য অভিনয়ে নাটকটি দেবেশময় হয়ে উঠেছে। পরাজিত সিংহের মতো দুর্যোধন- তার আত্মগরিমা, অহংকার, অসহায়তা, আদর্শবোধ এবং এক যোদ্ধার যন্ত্রণাকে প্রতি পদে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন তিনি। অন্যান্য চরিত্রে গৌতম চক্রবর্তী (শবর), মনোজ গঙ্গোপাধ্যায় (কৃষ্ণ), গৌতম বসু (ব্যাসদেব), তুলিকা দাস (কুন্তী) এবং অমিয় হালদার (যুধিষ্ঠির) যথাযথ অভিনয় করেছেন। ময়ূখ-মৈনাকের আবহ এবং জয় সেনের আলো নাটকটিকে শক্তিশালী করেছে। তবে নাচ এবং যুদ্ধের দৃশ্যগুলি আরও একটু সংহত হলে ভাল হত। বহুরূপীর 'নানা ফুলের মালা' এসময়ের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা। অখণ্ড জাতিসত্ত্বা না প্রাদেশিকতা- রাষ্ট্রের কাছে এক অমোঘ প্রশ্ন রাখল এই নাটক। যদিও পৃথিবীর আপামর ক্ষুধার্ত মানুষের কোনও জাত নেই।

নাটক : নানা ফুলের মালা
প্রযোজনা : বহুরুপী
নাট্যকার : অলখ মুখোপাধ্যায়
নির্দেশনা : দেবেশ রায়চৌধুরী
অভিনয় : দেবেশ রায়চৌধুরী, গৌতম চক্রবর্তী, গৌতম বসু, মনোজ গঙ্গোপাধ্যায়, তুলিকা দাস, অমিয় হালদার প্রমুখ

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন