নাট্য সমালোচনা

দীপদণ্ড

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা,২৫ নভেম্বর ২০১২

deepdanda

সে অনেককাল আগেকার কথা। ছবি- সৌভিক চক্রবর্তী।

সে অনেককাল আগেকার কথা। তখন বৌদ্ধ ধর্মের অভ্যুদয়ে খর্ব হতে শুরু করেছে ব্রাম্হণ্য আধিপত্য। শাস্ত্রকারদের লুকিয়ে শিখতে হচ্ছে আয়ুর্বেদ, শল্যচিকিৎসা। নইলে নিয়তিবাদ, বেদ এমনকি রাজার অস্তিত্বও যে বিপন্ন হয়। এমনই একটুকরো পৃথিবী ধরা দিল বহুরূপীর নাটক দীপদণ্ড-তে। এই পৃথিবীতে নীচতা আছে, তথাগত-ও আছেন। নিয়তিবাদ আছে এবং তাকে অগ্রাহ্য করাও বর্তমান। আছে আদর্শের লড়াই, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ পৃথিবীতে গণরাজ্যের প্রতিষ্ঠাও আছে, আবার দাস প্রথাও বর্তমান। আশ্চর্য এই আখ্যান রচনা করেছেন তীর্থঙ্কর চন্দ। নির্দেশনা করেছেন কুমার রায়। নাটকটি মঞ্চস্থ হল ১৭ নভেম্বর অকাদেমিতে।

ভারতবর্ষে সভ্যতা-সংস্কৃতি তখন মগধ, বৈশালী, পাটলিপুত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তক্ষশিলায় যাচ্ছেন নানা বিদ্যা অধিগত করতে। এই প্রেক্ষাপটে দুই বন্ধু কুমারভট্ট জীবক (অমিয় হালদার) এবং সুদত্তকে(দেবেশ রায়চৌধুরী) নিয়ে গল্পের শুরু। তারা আয়ুর্বেদে পারদর্শী হয়ে দেশে ফিরছে। সুদত্ত বৈশালীর এক শ্রেষ্ঠীর পুত্র এবং আরেক শ্রেষ্ঠী যশ-এর কন্যা বিপাশার (তুলিকা দাস) বাগদত্ত। আর জীবক পিতৃপরিচয়হীন জারজ সন্তান। অবাঞ্ছিত জন্ম তার। জন্মের পর বৈশালীর এক আস্তাকুঁড়ে তাকে ফেলে রেখে গেছিল তার মা। দাঁড়কাকের ঠোঁটে ক্ষত-বিক্ষত শিশুটিকে উদ্ধার করেছিল এক স্থানীয় রমণী। সেই রক্তাক্ত অপমানের ক্ষতচিহ্ন সারা শরীরে বহন করে জীবক। তাই আয়ুর্বেদাচার্য হয়ে মগধে প্রতিষ্ঠা লাভ তার কাছে আত্মমর্যাদার লড়াই। অন্যদিকে এত বৈভবের মাঝেও সুদত্ত নিস্পৃহ।

দেখুন গ্যালারি

সে চায় তার শিক্ষা আতুরের কল্যাণে নিয়োজিত হোক। তাই সে চলে যায় কুডা নদীর তীরে শালবতিকা গ্রামে। দরিদ্র গ্রামবাসীর সেবা করাকেই কর্তব্য মনে করে। সে চেয়েছিল নবপরিণীতা পত্নী বিপাশাও তার সঙ্গে যাবে। কিন্তু এখানেই বিরোধ বাধে রোমান্টিক চেতনার সঙ্গে বাস্তববোধের। বিলাসব্যসন, নবপরিণীতা পত্নীর বাহুডোর সব কিছু ফেলে একাই বেরিয়ে পড়ে সুদত্ত। সে আশা করেছিল জীবক অন্তত তার সঙ্গে থাকবে। কিন্তু ততদিনে আত্মপরিচয়ের গ্লানি কাটিয়ে উঠে স্বীয় প্রতিভায় যশস্বী হয়েছেন জীবক। তিনি মহারাজ বিম্বিসারের রাজসভার আয়ুর্বেদাচার্য এবং মগধের রাষ্ট্রদূত। তার সময় কোথায় গ্রামে গিয়ে চিকিৎসা করার? যে মগধবাসী একদিন তাকে জারজ বলে গালি দিয়েছিল, আজ তারাই যখন হাতজোড় করে- তখন আশ্চর্য এক তৃপ্তি পান জীবক। খুঁজে পান সাফল্য, জীবনের সার্থকতা। এই প্রতিশোধস্পৃহা তাকে মগধ ছেড়ে যেতে দেয় না। আর অনেক দুরে কুডা নদীর তীরে ক্রমশই একলা হয়ে পড়ে সুদত্ত। চম্পানগরীতে প্রেমিকের অপেক্ষায় কৃশতর হতে থাকেন বিপাশা। স্বার্থপরতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মনে হয় পরার্থপরতার মধ্যেই ঘুমিয়ে থাকে স্বার্থপরতার দৈত্য।

বহু চরিত্র এবং টুকরো টুকরো ঘটনা নিয়ে এই নাটক এগিয়ে চলে। এ নাটকে কোনো টানা কাহিনি নেই, বিভিন্ন খণ্ড দৃশ্যের মাধ্যমে নাট্যকার দেখিয়ে দেন সমকালীন যাপন। গনৎকার ব্রাম্হণের ভণ্ডামি থেকে আংটি বিক্রেতার বিচিত্র লোকঠকানো ফন্দি তার পরিচয় দেয়। ভগবান বুদ্ধের নির্বাণের পর সেই মৃতদেহ অধিকার করতে লড়াই বাধে রাজায় রাজায়। বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করে অসংখ্য সুবিধাবাদী মানুষ। এ সব কিছু নিয়ে ইতিহাসের হৃদস্পন্দন ছুয়ে ফেলে এই নাটক।

সুদত্ত এবং জীবকের ভূমিকায় প্রশংসনীয় অভিনয় করলেন অমিয় হালদার এবং দেবেশ রায়চৌধুরী। অনান্য চরিত্রের অভিনেতারাও যথেষ্ট সাবলীল। পরিমিতিবোধ এ নাটকের অন্যতম সম্পদ। প্রায় দু ঘন্টার নাটক মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে দর্শককে। যদিও মঞ্চ ভাবনা তাপস সেনের তবুও মঞ্চে এমন কিছু অভিনবত্ব দেখা গেল না। নাটকটির আলো করেছেন জয় সেন। পোশাক পরিকল্পনায় তুলিকা দাস ইতিহাসের দাবিকে মান্যতা দিয়েছেন।

সম্পর্কের টানাপোড়েন, চড়াই-উতরাই ভাঙতে ভাঙতে নানা গোলকধাঁধা পেরিয়ে আমরা নাটকের শেষ পর্বে পৌছে যাই। একদিন চম্পা নগরী থেকে রথ এসে থামে শালবতিকায়। সব অভিমানের উর্ধে উঠে বিপাশা এসেছেন সুদত্তর কাছে। এসেছেন মৃতদেহ রূপে। কারণ শল্যচিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে মৃতদেহ একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। জীবৎকালে যা করতে পারেননি মৃত্যুর পর প্রেমিকের সাধনাকে এভাবেই স্বীকৃতি দিলেন বিপাশা। মৃত্যুতেই পূর্ণতা পেল জীবনের ধারাপাত। উহ্য থেকে গেল হারজিতের কথা। আত্মসমর্পনে উদ্ভাসিত হলো দীপদণ্ড।
          
এরপর যদি আমাদের গায়ে কাঁটা দেয়, তার দায় কি বহুরূপী নেবে?

নাটক: দীপদন্ড
প্রযোজনা: বহুরূপী  
নাটক রচনা: তীর্থঙ্কর চন্দ
নির্দেশনা: কুমার রায়
অভিনয়ে: দেবেশ রায়চৌধুরী,অমিয় হালদার,তুলিকা দাস এবং অন্যান্যরা

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

জিৎ-শুভশ্রীর নতুন খেলা

রিলায়েন্স এন্টারটেনমেন্ট রিজিওনাল

দেখেছেন 26 জন

হিজড়াদের স্বীকৃতি সুপ্রিম কোর্টের

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 12 জন

অর্জুন-আলিয়ার ব্রেক-আপ

টি-সিরিজ

দেখেছেন 12 জন

মোহনবাগানের কোচ হবেন মরগ্যান?

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 9 জন

বৈশাখী ভোজন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 159 জন