নাট্য সমালোচনা

জান-এ-কলকত্তা

অরিজিতা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা,২ ডিদসেম্বর ২০১২

Theater

দর্শকসংখ্যা ভরসা দিল পরম্পরার সাক্ষী হয়ে। ছবি- উত্তম মাহালি।

‘জান-এ-কলকাত্তা’... শুধু নামটুকু শোনার অপেক্ষা, আজও একবাক্যে সঙ্গীতরসিকদের কানে লহর তোলে, “ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি, উড়ে গেল আর এল না”, কিংবা “জিয়া জায়ে জ্বালায়ে সাতায়ে পিয়া...” আখর নাট্যদলের প্রযোজনায় কলকাতার থিয়েটারেও ধরা দিলেন ‘প্রাণের পাখি’ গওহর জান। সেই প্রযোজনার চল্লিশতম শো কিছুদিন আগে হয়ে গেল, এবং এখনও অভাবনীয় দর্শকসংখ্যা ভরসা দিল পরম্পরার সাক্ষী হয়ে।
 
১৮৫৭ সালে অযোধ্যার পতনের পর নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ কলকাতায় নজরবন্দী হলেন, সারাদেশের বিখ্যাত কলাবিদেরা তাঁর আকর্ষণে ভিড় জমালেন কলকাতায়। নগর কলকাত্তা হয়ে উঠল খেয়াল, দাদরা, ঠুমরি এবং কত্থক নৃত্যকলার অন্যতম পীঠস্থান। ১৮৮৩ সালে বেনারসের বড়ি মালকাজান দশ বছরের মেয়ে গওহরকে নিয়ে এসে উঠলেন কলকাতায়। শুরু হল গওহরের তালিম। শুধু হিন্দুস্থানি সঙ্গীতেই নয়, মালকাজান গওহরকে পাশ্চাত্য এবং আঞ্চলিক সঙ্গীতের শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও করেছিলেন। ভাষা শিক্ষাও চলেছিল নিয়ম মেনে, একাধিক ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন গওহর। সঙ্গে ছিল কত্থকের চোখ ধাঁধানো চমক এবং পোশাকের বাহার... প্রথম গওহর জান সঙ্গীতে পরিবেশনার একটা অন্য মাত্রা যোগ করেন তাঁর পোশাকের ছাঁদ পাল্টে। ভিন্ন রাগ পরিবেশনের আগে পোশাক বদল, এবং রাগ অনুযায়ী তাঁর রঙ নির্বাচন করতেন নিজে। সবটুকু মিলিয়ে গওহর জান হয়ে উঠেছিলেন নান্দনিকতার আইকন।

দেখুন গ্যালারি

আখর নাট্যগোষ্ঠী এই কিংবদন্তী আশ্রয় করে উপস্থাপন করলেন নাটক “জান-এ-কলকাত্তা”। গওহরের চরিত্রে তাঁর মেধার সঙ্গে মিশে ছিল অদ্ভুত ঔদার্য্য, খুব স্বাভাবিকভাবেই জীবনের প্রত্যেক বিশ্বাসের প্রতিদানে রক্তাক্ত হয়েছেন তিনি। শেষ অব্দি, গওহরকে পাই ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর মাঝখানে একার লড়াই-এর বৃত্তে, সঙ্গে শুধু ছিল শিল্পের বিশুদ্ধতা। গওহর জান নিয়ে কাজ করাটা খুব সুবিধার ছিল না, সবার আগে এমন আরেকটা গলা পাওয়াই কঠিন ছিল। আনন্দী বসু সেই চিন্তা দূর করেননি শুধু, চমকে দিয়েছেন দর্শকদের। অনবদ্য কণ্ঠস্বরে গাইলেন এবং অভিনয় করলেন গওহর জানের ভূমিকায়। মঞ্চে সঙ্গতে ছিল সারেঙ্গি, তবলা। গওহর জানের পোশাকি উপস্থাপনায় আনন্দী সেই সময়টায় পৌঁছে দিতে পারলেন সাবলীলভাবেই। ঘুরে ফিরে গাইলেন ভৈরবী তে বাঁধা “রস কে ভরে তোরে নয়ন”... নির্দেশক ভদ্রা বসু অসাধারণ এঁকেছেন দৃশ্য। ইতিহাসের কানাকানি গানের মুখড়াতে মাখামাখি হয়ে গেল। অনির্বচনীয় কিছু মুহূর্তে নীরবে নোনা জল মুছে নিলেন দর্শক। বর্তমান থিয়েটারের এই সহজ প্রাপ্তিটুকু আজকাল আর হয় না, হঠাৎ খুব গর্ব হল যেন। বেশ দাপুটে অভিনয় দেখলাম মালকা জানের ভূমিকায় কৃষ্ণা সিংহের। আলোর কাজে বাদল দাস যথাযথ। সব মিলিয়ে আখর-কে অভিবাদন জানাতে হয় এমন আদ্যন্ত ‘মিউজিক্যাল’ প্রযোজনার জন্য।

আমাদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য যে সময়টার উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটা প্রায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। শিকড়ের টানে ফিরতে পারি না বলেই বোধহয় অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে সংস্কৃতির ফুসফুসে। সেই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে না গিয়ে বেশ খানিকটা সাহস দেখালেন ভদ্রা বসু। ভবিষ্যতে আবার “জান-এ-কলকাত্তা’’-য় ভিড় সরিয়ে ঢুকতে মন্দ লাগবে না।

নাটক : জান-এ-কলকাত্তা
প্রযোজনা : আখর নাট্যগোষ্ঠী
ভাবনা, রচনা এবং নির্দেশনা : ভদ্রা বসু
অভিনয় : আনন্দী বসু, কৃষ্ণা সিংহ, দেবাদিত্য সরকার প্রমুখ
আলো : বাদল দাস
মঞ্চ : মদন-টিঙ্কু

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

সিনেমার মতো নাটক

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 12 জন

সেবির সতর্কবার্তা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 173 জন

মমতার ফেসবুক বার্তা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 158 জন

মেঘে ঢাকা তারা

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস

দেখেছেন 238 জন

সুদীপ্তর শুনানি: আদালতে বিক্ষোভ

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 114 জন