নাট্য সমালোচনা

বদনচাঁদ লগনচাঁদ

সৌভিক চক্রবর্তী
কলকাতা, ২১ ডিসেম্বর, ২০১২

badanchand laganchand

দৃশ্যগুলো এলোমেলো, কোরিওগ্রাফিটাও ঝকঝকে নয়। ছবি- সৌভিক চক্রবর্তী।

নাটকটা দেখে বেরনোর পর মনটা একটু খুঁত-খুঁত করবেই। মনে হবে সবই ঠিক আছে, কিন্তু কোথাও যেন কী একটা নেই। যেন ঠিকমতো পালিশ হয়নি। দৃশ্যগুলো যেন একটু এলোমেলো, কোরিওগ্রাফিটাও ঝকঝকে নয়। কিন্তু আসল মজাটা লুকিয়ে আছে এই আকরিক, না-পালিশ হওয়া ব্যাপারটায়। যেমন অবিন্যস্ততার মধ্যেই বুনোফুলের সৌন্দর্য। নাটকের নাম 'বদনচাঁদ লগনচাঁদ'। সম্প্রতি চেতনা নাট্য উৎসবে নাটকটির ১২৫তম অভিনয় হয়ে গেল। বীরভূমের দল 'আনন' নাটকটি প্রযোজনা করল। নির্দেশনা করলেন বাবুন চক্রবর্তী।

বীরভূমের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় লোক-আঙ্গিক হল লেটো। আমরা জানি যে, ছেলেবেলায় নজরুল লেটোর দলে গান গাইতেন। আজও বীরভূম, বর্ধমানের গ্রামে গ্রামে, মেলায়, হাটে, ঠাকুরদালানে এই লেটোর মাধ্যমে লোকশিক্ষা দেওয়া হয়। আর এই লেটোকেই শহুরে ছোঁওয়াচ বাঁচিয়ে একদম অবিকৃতভাবে মঞ্চে এনেছে বীরভূমের আনন। তাই সচেতন ভাবেই রক্ষিত হয়েছে এই অগোছালো রূপটান।

দেখুন গ্যালারি : বদনচাঁদ লগনচাঁদ

এ নাটক দেখার আগে একটা সাবধানবাণী, আপনার ভেতরে যদি আর ছিটেফোঁটাও শৈশব বেঁচে না থাকে, তাহলে এ নাটক আপনার ভাল লাগবে না। কারণ শৈশবের মতোই সরল এবং আশ্চর্য বদনচাঁদ-লগনচাঁদ। এখানে শুধু প্রাণখোলা হাসি আর কখনও একটু নোনা জল। বেশি বয়সে শেখা বিভিন্ন থিয়োরি প্রয়োগ করার জায়গা নেই মোটেই। কারণ হাসি আর কান্না দুটি যে সহজাত, থিয়োরির ধার ধরে না।
          
এবার গল্পটা একটু বলে নেওয়া যাক। গ্রামের ছেলে বদনচাঁদ (বদনা) আর লগনচাঁদ (লগনা)। তারা দুজনে ভারি বন্ধু। একসঙ্গে খেলা করে, সাঁতার কাটে, দুষ্টুমি করে আবার ইস্কুলেও যায়। তবে লগনার একটা পা খুঁতো, সে খুড়িয়ে হাঁটে। এই নিয়ে অনেক গঞ্জনা শুনতে হয় তাকে। বাপ থেকে শুরু করে কানু মাস্টার- সকলেই তাকে নিয়ে তামাশা করে। সত্যিই তো ল্যাংড়া ছেলে লেখাপড়া শিখে কি জজ হবে? তা সে জজ না হোক, একগুঁয়েমিতে কম যায় না লগনাও। সে পড়বেই। কানু মাস্টার পড়াতে বসে ঘুমিয়ে গেলে আর সকলে যখন খেলে, তখনও সে পড়বেই।

আবার বদনা একদম উল্টো। লেখাপড়ার মত শক্ত জিনিস তার কাছে নেই। ইস্কুল পালিয়ে মাঠে গিয়ে সে বসে থাকে। গাছ-গরু-আকাশ-পাখি-পাহাড় সক্কলকে জানিয়ে দেয়- সে আর পড়বে না। মা তাকে খুব ভালবাসে, কিন্তু বাপটা কথায় কথায় ঠ্যাঙা হাতে তেড়ে আসে যে! অতএব বদনা ঠিক করে গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় পালাবে। ওদিকে একদিন রাগের চোটে ঢিল মেরে কানু মাস্টারের মাথা ফাটিয়ে দেয় লগনা। সেও বদনার সঙ্গী হয়।
          
কলকাতায় এসে পৌঁছায় দু'জনে। কলকাতায় কত মানুষ, কত গাড়ি, কত দালাল আর ঘুষখোর পুলিশ। তাদের ভয় করে, আবার এত জাঁকজমক ভাল-ও লাগে। কলকাতায় সব আছে, কিন্ত ভালবাসার বড় অভাব। এখানে সবাই সবাইকে মাড়িয়ে দিয়ে ছুটছে। গাঁয়ের ছেলের তো দু'বেলা চাট্টি ভাত আর আদর না হলে পেট ভরে না; তাই ক'দিনেই মনটা বড্ড উচাটন হতে থাকে দু'জনের।
          
এখন এই কাহিনির ভিতরে তত্ত্ব খুঁজতে গেলে ঠকতে হবে। যা দেখলাম, আসলে তাই দেখলাম। মেকআপ, সেটের কোনও বাড়াবাড়ি নেই। মাঠ-গরু-আকাশ-পাখি-কলকাতার ভিড় রাস্তা- এত কিছুর সেট কোথায় পাবে 'মেঠো লেটো'-র দল? অগত্যা কল্পনা আর সেই কল্পনাও সারল্যে ঝলমলে। ঝুরো হাওয়ার মতো হাত বুলিয়ে দেয় চোখে সেই কল্পনা। প্রপস্-এরও অসাধারণ ব্যবহার দেখা গেল নাটকটিতে। প্রচলিত সুরে বদনা আর লগনার গানগুলিও মন ভরায়।
          
বদনার চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাবুন চক্রবর্তী স্বয়ং। তাঁর মধ্যে এখনও শৈশব অটুট। তাঁর অসামান্য অভিনয় এবং বলিষ্ঠ পরিচালনা আলাদা এক মাত্রা এনেছে নাটকটিতে। লগনার ভূমিকায় উত্তম চট্টোপাধ্যায়ও অসাধারণ অভিনয় করলেন। তাঁর বডি অ্যাকটিং চোখে পড়ার মতো। এছাড়া অন্যান্যদের অভিনয়ও সাবলীল।
          
শেষ দৃশ্যে বদনা আর লগনা ঘরে ফেরে। তাদের মাঠ-পাখি-আকাশ আর ইস্কুল-ও ডাকছে যে! আর আমরা ফিরে আসি একমুঠো হারিয়ে যাওয়া শৈশব নিয়ে।

নাটক : বদনচাঁদ লগনচাঁদ
প্রযোজনা : বীরভূমের আনন
নাটক, নির্দেশনা : বাবুন চক্রবর্তী
অভিনয় : বাবুন চক্রবর্তী, উত্তম চট্টোপাধ্যায় ও অন্যান্য

 

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন