নিশিঠেক


মধ্যরাতের ফুটপাত বদলানোর মোহিনী ইশারাকে কখনোই উপেক্ষা করেনি শহর কলকাতা। চরাচরের কালো শামিয়ানার নিচে, সহজিয়া মধুশালার সুলুকে রাত-জাগানিয়া মন পথে নেমেছে বারে বারে। এখনও এলোমেলো হাওয়ার উজানে নেশাতুর ঠোঁটে এসে লাগে সেই আতুর আসবতৃষ্ণার গোলাপি ছোঁয়াচ। নিয়নের নিচে বিলোল বণিতার নয়নঠার আর রাত-আখড়ার ধোঁওয়ার ছবিতায়, শহুরে রাখালের যামিনী আড় ভাঙে। রতি-রাত আর পাপী চাঁদ যত আড়মোড়া ভাঙে, নিশাচরীর সঘন সঙ্গে দারুশালার বিচিত্র কথকতা গড়িয়ে যায় অন্য রাতকুঠুরিতে। রসিকা নগরীর পানশালা আর রাত ঠেকের সেই সব নিশিকথা-ই নিশিঠেক।

ঠাণ্ডি হাওয়ায় বুকেও কাঁপন ধরে।

হৃদকমলে হ্যাং আউটের হুলিয়া

আবীর মুখোপাধ্যায়

...শুধু চোখে নয়, চোখে চোখে চোখ,
বাহু দিয়ে বাহু, নাভি দিয়ে নাভি;
চাবি দিয়ে তালা খোলা দেখিয়াছি,
তালা দিয়ে খোলো দেখি চাবি ? (নির্মলেন্দু গুণ)

কলকাতার রক্তে এখন টগবগে ঘোড়ার দাপাদাপি। হ্যাং-আউটের হুলিয়ায় কখনও সে মারফতি মাতোয়ারা। তো কখনও বা, আদর বিলাস সৌজন্যের নিষ্ঠ সীমাবদ্ধতায় ‘এটিকেটি’ ফিরিঙ্গি ফরিস্তা। বছর শেষের ধুলোটিয়া কলকাতা তাই যেন রতি-রাগ-রেণুর নিরন্তর ওড়াউড়ি মেখে আলগা ইশারার শরীর বিছিয়ে দিয়েছে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর উলুখুলু সুখ পালঙ্কে। নিশিঠেকে যেতে যেতে দেখি হিম হাওয়ায় হাওয়ায় সেই রাগ-রেণু রঞ্জার এলোমেলো চুলের নিভৃতেও বসত করেছে দিব্য। রঞ্জার দুষ্টুমিতে সাঁই-সাঁই বরফি বাতাসের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে আমি মুগ্ধ হয়ে বলি, ‘গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,/ অমনি জ্যোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী।/ সুখের নাগরদোলায় এইভাবে অনেকদিন’!

রঞ্জার খপ্পরে পড়ে শেষ ডিসেম্বরের শীতকালীন কার্নিভ্যালে আজ চৌখুপিতে বসতে ইচ্ছে করছে না। মনের মধ্যে কেবলই প্রিয় পানশালাগুলোকে নিয়ে ভাললাগা আর না-লাগার হলক তান চলছে। হয়তো মনে হল, সিজলারের সঙ্গে ‘ফিশফাশ’ কানাকানি সারতে পিটার ক্যাট যাই আবার। বাসনা কুসুম জানাতেই, রঞ্জা বেয়াড়া হয়ে বাতিল করে দিল! তাহলে ট্রিংকাজের পুরাতনী প্রেম? রঞ্জা কি চোখে চোখে মাপল ফকিরকে!

ওর চাহনি বিলাসে ঠাণ্ডি হাওয়ায় বুকেও কাঁপন ধরে। রঞ্জার ঢাকা-আঢাকা শরীরকে নিবিড় করে টেনে নিয়ে ওর উৎসব চোখে যতবার চোখ রাখি, এমনি করেই ভেঙে যায় গূঢ় শৃঙ্খলা। ইন্দ্রিয়ে আঁচ ধরাতে ওর রাঙা ঠোঁটে ইচ্ছেপ্রদীপ জ্বেলে মুখ-মালাই চুমু খাই! রঞ্জিত ঠোঁট খেয়ে বলি, বালিগঞ্জ ফাঁড়ির মুক্তি ওয়র্ল্ডের কথা। লাউঞ্জ বারে বিনীত স্পর্শ সুখের মিনারে বসে ব্রায়ান অ্যাডামস শোনার কথা। নাকচ হয়ে যায় আবারও!

অথচ, কে না জানে- বড়দিনে এ শহরের রাত জপাতে এইসব দারুশালা এখন দারুণ মহার্ঘ্য! মনে পড়ে গেল এক তরুণ কবির কাব্যের নাম-ই ছিল ‘মোহময় পেষ্ট্রির দিন’! কিছুদিন আগেই ঘুরে আসা পার্ক স্ট্রিটে আমার প্রিয় মধুশালা ওয়ান স্টেপের কথা বলি। ওয়ান স্টেপের ব্লাডি মারি অনন্য অভিজ্ঞতা! অলির অলি অন্দর ফেলে দমকা সামপ্লেস এলসের কথা এসে পড়ে। কিন্তু, এমন হিমঝুরি দিনে ক্লাব ইংলিশে কলকাতাকে মাত করানো ক্রসউইন্ডজেও আপত্তি রঞ্জার। আসলে সত্যি কথা কি, কোথাও না! মায়াসুরের দোলনমায়ায় ‘তন্ত্র’-র সাধন সঙ্গিনীও হতে চাইল না আজ।

এতোক্ষণ যে পাঞ্চটা সঙ্গে ছিল, শেষ! রামানুজ মন বলল, অনর্গল কথা আর উপকথনে রঞ্জা বড্ড বখে গেছে যেন আজ! ফকিরের মতির ঘরেও যেন তুমুল তুষার ঝড়। সঙ্গতে সাহসী তেহাই ঠোক্কর দিচ্ছে মন-মতি কেবলই। কোমরের দোদুলস্পর্শ আবেশ ছিঁড়ে ওকে একলা করে, নিজের করে দেখলাম পথের ভিড়ে সঙ্গোপনে। ডেনিম জিন্সের ওপর ব্রাউন লেদার ওভার কোট পড়েছে রঞ্জা। সঙ্গে ব্রাউন লেদার বুট। হাতের অনামিকায় একটা গোল নকশার ব্রাউন গার্নেট স্টোন। চোখে ডিপ ব্রাউন লাইনার! ওর চোখ দেখে কেন জানি না বুদ্ধদেব বসু মনে পড়ল,

- ‘কাল চিল্কায় নৌকোয় যেতে-যেতে আমরা দেখেছিলাম,/ দুটো প্রজাপতি কতদূর থেকে উড়ে আসছে/ জলের উপর দিয়ে।/ - কী দুঃসাহস’! রঞ্জা আজ তোমার খপ্পরে সত্যিই পথে পালানোর নেশায় পেয়েছে আমাকেও। এ শহরের কোনও চৌখুপি মধুশালায় নয়... চলো দু’ পাত্তর ওয়াইন খেয়ে এলোমেলো পথ হাঁটি নিশিঠেকে।

- শুধু ওয়াইন নয়, সঙ্গে চকোলাভা!

- ডমিনোজের চকোলাভা না, ফ্লুরিজে বসে ওয়াইনের সঙ্গে ব্ল্যাক ফরেস্ট... তারপর আবার পথে পথে নিশিকথা। এবং মধ্যরাতের একটু আগে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের ক্যারলে দুজনের সম্মিলিত প্রার্থনা!

- কী চাইবে ক্যারলে?

- বলতে নেই। চাওয়াটা মিথ্যে হয়ে যায়! আপাতত, একটুকরো পেস্ট্রি আর কোহল... যদিও আমার খিদের কাছে এসব নস্য! তোমার আগুনে পুড়তে পুড়তে, অভুক্ত থাকতে থাকতে কোনদিন দেখবে এ শহর পুড়বে দাবানলে! তার চেয়ে, ‘আজ থেকে তোমাকে ডাকবো/ চুল্লী।/ কেন জানো? কেবল পোড়াচ্ছ বলে’।

শুভঙ্করের মতো আমার দিন দিন রাক্ষুসে খিদেয়, রঞ্জা তুলকালাম প্রতিরোধের দেওয়াল তোলে আজকাল। শেষ ডিসেম্বরের প্রায় প্রতিটি মিঠে দুপুর অথবা, ‘প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’-র কুটির শান্তিনিকেতনী-সন্ধ্যায় ওকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি এই তালিবানি প্রতিরোধ ভাঙতে ভাঙতে মোক্ষম আক্রমণে! ক্ষণিকের জন্য ওর সেই চির-চেনা সুখি ঠোক্কর প্রতিহত করল আমাকে। ঝিলমিলে ফ্লুরিজে ঠেলতে ঠেলতে নন্দিনীর মতো শাসালো রঞ্জা!

- ‘উত্তরোত্তর অত্যন্ত যা-তা হয়ে উঠছো তুমি/ আজ থেকে আমিও তোমাকে ডাকবো/ জল্লাদ’!

(ক্রমশ)...

এই বিভাগে অন্যান্য

অধরেতে থরে থরে চুম্বনের লেখা।
প্রেম, রক ও রোদচশমা

আবীর মুখোপাধ্যায়

অগম্যাগমন পাপে আমারও কি জ্বর আসবে...
দহনবেলার ক্যাফেলা

আবীর মুখোপাধ্যায়

দু’জনে শান্তি-সায়রের জল-কিনার নলবনে।
খাম ছিঁড়লে ঠোঁট খুলে যাবে

আবীর মুখোপাধ্যায়

আমি যেন মেঘে জলে মেশা!
লাল পাড়, ডুরে তাঁত

আবীর মুখোপাধ্যায়

পাহাড়চুড়োয় হিমস্পর্শের ইচ্ছে।
চেয়ে দেখি বরফের রাশি

আবীর মুখোপাধ্যায়