নিশিঠেক


মধ্যরাতের ফুটপাত বদলানোর মোহিনী ইশারাকে কখনোই উপেক্ষা করেনি শহর কলকাতা। চরাচরের কালো শামিয়ানার নিচে, সহজিয়া মধুশালার সুলুকে রাত-জাগানিয়া মন পথে নেমেছে বারে বারে। এখনও এলোমেলো হাওয়ার উজানে নেশাতুর ঠোঁটে এসে লাগে সেই আতুর আসবতৃষ্ণার গোলাপি ছোঁয়াচ। নিয়নের নিচে বিলোল বণিতার নয়নঠার আর রাত-আখড়ার ধোঁওয়ার ছবিতায়, শহুরে রাখালের যামিনী আড় ভাঙে। রতি-রাত আর পাপী চাঁদ যত আড়মোড়া ভাঙে, নিশাচরীর সঘন সঙ্গে দারুশালার বিচিত্র কথকতা গড়িয়ে যায় অন্য রাতকুঠুরিতে। রসিকা নগরীর পানশালা আর রাত ঠেকের সেই সব নিশিকথা-ই নিশিঠেক।

সহজ ধারা সঙ্গ কর।

সহজিয়ায় মন মনফকিরা কলকাতার

আবীর মুখোপাধ্যায়

মিলন হবে কতদিনে।/ আমার মনের মানুষের সনে।।/
চাতক-প্রায় অহর্নিশি/ চেয়ে আছে কালো শশী/
হব বলে চরণ-দাসী/ ও তা হয় না কপাল-গুণে।।
 

বছর দু’য়েক আগের এক সুরধনী রাত্তিরের কথা। মুর্শিদাবাদের দ্বারকা নদীর চরে গোপ্য সাধনের রাত আখড়ায় বসে আছি রঞ্জাবতীর সঙ্গে। মাথার ওপর কার্তিকের কুয়াশা কেটে কেটে পূর্ণিমার চাঁদ জাগছে একটু একটু করে।

নরম আলোর চাঁদনিতে চরাচরের চারদিক বেশ অদ্ভুত- নির্জন! সেই নিভৃতিকে আরও একা করতেই যেন নদীচরের হাওয়ায় সুর তুলেছে জেল্লাদার আলখাল্লার মক্কেল ফকিরের এলেমদার সারিন্দা। দিব্য মনে আছে, মক্কেল ফকিরের সঙ্গে অন্ধ সুফি ফকিরানির অন্তগূর্ঢ় বাহাস আর পাল্লা গান শুনতে শুনতে রঞ্জাবতী উষ্ণতার আশ্রয়ে প্রথম বলেছিল সহজিয়া সংলাপে ভালবাসার কথা!

হয়তো সেই প্রথম ভালবাসা-বাসির মুহূর্তকে ছুঁতে বার বার সন্ধ্যার সারিন্দায় সুর বাঁধতে যাই আমরা কোনও সহজিয়া উৎসবের উদযাপনে। অন্যবারের মতো এবারও ঠিক তেমনই দুটিতে হাজির ছিলাম যাদবপুর বাউল ফকির উৎসবে। নিশিঠেক বসল সেখানেই।

মনে ছিল না আমার, রঞ্জা সত্যি-ই মনে রেখেছে তারিখটা। উৎসবের প্রথম দিন বিবিএমে ওর টেক্সট উড়ে এল, ‘তুমি আবার বেঁকে বসো না ফকির। বাউল ফকির যাচ্ছি আমরা’। আমি শুদ্ধ রসিক মনে লিখলাম, ‘সে কি! সহজিয়ায় মন মজল নাকি? না, দমের খেলায় জিকির দেখে মাতাল হল মনফকিরা কলকাতা’? উত্তরে ও লিখল, ‘যে জন রসিক চাষা হয়/ জমির জো বুঝে হাল বয়/ লালন ফকির পায় না ফিকির/ হাপুড় হুপুড় ভুঁই বোনে’!

লালন শা'র ফকিরি কথাগুলোয় আশ্চর্য উড়ান। ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে সেই টেক্সটাই দেখছিলাম আর ভর করে দিব্যি ফুরফুরিয়ে উড়ছিলাম। সঙ্গে রাতের রসদ, যথেষ্ট হুইস্কি রয়েছে বোতলে। ঝোলার দিকে হাত বাড়াতেই রাস্তার ওপারে ওকে নজরে পড়ল ওকে। সুকান্ত সেতুর মুখটায় রঞ্জা ওর গাড়িটা ছেড়ে দিল। রাস্তা পার হয়ে এপারে এল আমার কাছে।

কাছে আসতেই মালুম হল, নেশায় বেশ টালমাটাল ও, খানিকটা বিধ্বস্ত! কার সঙ্গে, কোথায় ছিল ও? এমন করে কে-ই বা নেশা চুরমার করল ওকে... এসব প্রশ্ন এখন অর্থহীন। এখন ওর কাছে জানতে চাওয়াটাই বৃথা! জানতে চাইলে, নিরুত্তরে থাকবে মৌন!  মনে মনে একটা লালন ঘুরছিল। রিকসায় উঠে মুখড়াটা গুনগুনাতে দেখে রঞ্জা সঞ্চারীতে সুর নামাল, ‘ত্রিবেণীর তীর-ধারে/ মীনরূপে সাঁই বিরাজ করে/ উপর উপর বেড়াও ঘুরে/ গভীরে কেন ডুবলে না’!

সুকান্ত সেতুর মুখ থেকে শক্তিগড়ের বাউল ফকির উৎসবের আঙিনা, এই সাড়ে ছ’ মিনিটের পথটুকু রিকসায় যেতে যেতে নিবিড় আলিঙ্গনে ওকে জড়িয়ে অপলক দেখছিলাম। ওর গানের গহনে ডুবতে ডুবতে মনে পড়ছিল দ্বারকার চরের সেই রসিক রাত্তিরের কথা। জুঁইফুলের সুগন্ধী আর কোহলে মাখামাখি ওর সঙ্গ-সুবাস আমার ভিতর যেন বশিষ্ঠের ক্ষুধা জাগিয়ে তুলল হঠাৎ করে। ঠোঁটের সবটুকু রঙ খেয়ে নিতে ইচ্ছে করল চুপিসাড়ে!

রতিসুখ রিকসার ঘেরাটোপ আর আঁধারি গলির গসিপকে উস্কানি দিতে, কামনা ও প্রেমের দুই উত্তাল চিত্তের মাঝে, খুব নিবিড় করে চুমু খেলাম। যেন বা মোচ্ছব! চুল সরিয়ে ঘাড়ে, লালি গালে। আসলে রঞ্জাতে আমি তো চিরকার মুগ্ধ, ওর ভালবাসার কাছে নতজানু, বিহ্বল। ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে তাই বললাম। শুনে ও দুষ্টুমি করে বলল, কতটা? উত্তরে আমি বললাম, ‘অর্জুন গাণ্ডীব তুলতে ভুলে গিয়ে যেমন বিহ্বল/ সে-রকমই বিহ্বলতা’!

উৎসবের মাঠে পৌঁছে রিকসা থেকে নামতে নামতেই কানে এল মনসুর ফকিরের গান। নদীয়ার গোড়ভাঙ্গার এই গুণী ফকিরের সঙ্গে সম্পর্ক আমার সহোদরার সূত্রে। ফকিরের ভাইপো তুষার ওর বন্ধু। মনসুর ফকিরের মতো এমন দোস্ত আগে কখনও দেখিনি। একটা রিফার ধরিয়ে রঞ্জাকে বললাম, 'চলো মাঠের ওপারে যাই। কিছুটা ফাঁকা হবে ভিড়টা'। ও বলল, 'এই সাত বছরে ভিড় যেন বেড়েই চলেছে। সবাই গান শুনতে আসে'?

ওর কথার জবাবে তক্ষুনি কিছু না বলে, হাত ধরে থই-থই ভিড় কেটে এসে দাঁড়ালাম একটেরে। ভিড় ঠেলতে ঠেলতে কানে এল, সন্ধেরাতে ওপার বাংলার শিল্পীরা মাতোয়ারা করেছেন। বললাম, অনেকে সু-সঙ্গ করতেও আসে এখানে। এই উৎসবের ট্যাগ লাইনেই তো আছে কথাটা, ‘সহজ ধারা সঙ্গ কর’। সেই যে ওপারের যাদুবিন্দুর পদ আছে না, ‘যাদের আছে সুসঙ্গ/ দেখে গঙ্গা গৌরাঙ্গ/ সময় সময় সুরধনীর বাড়ে তরঙ্গ’।

রঞ্জা আমার হাতে রিফারটা ধরিয়ে দিয়ে ঝোলা থেকে পাঞ্চটা বের করল। রাতটহলিয়া উৎসবমঞ্চের আলো এসে পড়েছে ওর চোখে-মুখে-সারা শরীরে। বেগুনিরঙা হ্যান্ড প্রিন্টেড মারফতি মুর্শিদাবাদ সিল্কের সঙ্গে কটন প্রিন্টেড ডিপ স্কোয়ার, ছোট হাতা কনট্রাস্ট ব্লাউজ পরেছে ও। যেন সুন্দরের সাক্ষাৎ অভিবন্দনা।

ওর চুল আজ এলো খোঁপায় ঢালা। ডোকরার ঘুঙুরালি কাঁটায়, কারিগর হাটের মিত ফ্যাশন জুয়েলারির বেগুনি আভায়, চোখের বেগুনি শ্যাডোর ওপরে কালো আইলাইনারের মিলমিশ যেন কন্ঠিবদলের নাগরালিতে আজ মোহিনী চাঁদ। কিছুটা কোহল গলায় ঢেলে ও বলল, ‘গৌর গৌর বলছ যারে/ সে গৌর তোমার সঙ্গে ফেরে’!

ক্রমশ...


এই বিভাগে অন্যান্য

হাতের অজান্তে ঘাসের ওপর পড়ে গেল বাংলার বোতল।
হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর

আবীর মুখোপাধ্যায়

আগুনের উল্কি এঁকে দেবে হাতে, বুকে।
চিবোতে দেবে লাল লবঙ্গ

আবীর মুখোপাধ্যায়

নির্বাক ভাষাগুলি স্বপ্নের কাছাকাছি হাঁটে।
হুল্লোড় দিয়েছে হাতছানি

আবীর মুখোপাধ্যায়

সহসা রঞ্জা ওয়ার্ডরোব উজাড় করে
নিভৃতে রঞ্জার জন্য লেখা

আবীর মুখোপাধ্যায়