পত্রিকা

শনিবারের নিবন্ধ

গাড়িতে ওঠো

শীতের উইক এন্ড। লং ড্রাইভ। তিন থেকে চার ঘণ্টায় টুক করে পৌঁছে যাওয়া অচিনপুরে।

সংযুক্তা বসু
কলকাতা, ১৫ ডিসেম্বর ২০১২

Long drive in winter.

বাতাসে শীতের আমেজ, তিন থেকে চার ঘণ্টায় টুক করে পৌঁছে যান অচিনপুরে। ছবি- গ্রাফিক্স

বাতাসে যে শীতের আমেজ।
সকাল না হতেই ঝলমলে রোদ।
বিকেল না হতেই হিমেল কুয়াশার চাদর।
রাত নামলে শিরশিরে ঠান্ডা। এ সব নিয়ে বাইরের জগৎটা যখন ডাকতে থাকে তখন হাতে স্টিয়ারিংটা ধরলেই তো হল।
নিজের গাড়ি, নিজের মনের মতো করে বেড়ানো। সঙ্গে বাছাই করা প্রিয়জন বা বন্ধুবান্ধব। প্রস্তুতি বলতে এইটুকুই। গাড়িতে যথেষ্ট পরিমাণে তেল ভরে নিতে হবে। দেখে নিতে হবে টায়ারগুলো বহাল তবিয়তে আছে কি না। সঙ্গে থাকবে স্টেপনি আর মেরামতির যন্ত্রপাতি। বলা তো যায় না, নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে গাড়ির টায়ার বিশ্বাসঘাতকতা করল। গাড়ি চালানো যাঁদের নেশা, তাঁদের কাছে এই ধরনের ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ বেড়ানোর নেশাই আলাদা।
মধ্যবিত্ত বাঙালির থোড় বড়ি খাড়া বেড়ানোর চেনা ছক ভেঙে গাড়ি নিয়ে উইক এন্ড কাটাতে যান এমন সেলিব্রিটির সংখ্যাও কম নয়। নানা কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে ঠিক টুক করে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা।

তাজপুরে মাছভাজা আর বিয়ার
অঞ্জন দত্ত

ট্রেনে করে কোথাও যাওয়ার চেয়ে আমার পছন্দ গাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। বিভিন্ন জায়গার পরিবেশ আর মানুষের সঙ্গে ভাল যোগাযোগ হয়। এবং নিজের ইচ্ছেমতো যে কোনও জায়গায় গাড়ি দাঁড় করানো যায়। চা খাওয়া যায়, নানা রকমের খাবার চাখতে চাখতে যাওয়া যায়।
বন্ধুবান্ধব নিয়ে দিন দুয়েকের ভ্রমণে গাড়িই ভাল। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার সময় গাড়ি নিয়ে একাই চলে যাই কলকাতার বাইরে। ঘণ্টা তিন চারের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় এমন সব জায়গায় যা আমার বিশেষ পছন্দের। পলক পড়তে না পড়তে চলে যাই শহুরে কোলাহলের বাইরে। এই সব যাত্রায় আমি নিজের গাড়ি না নিয়ে বড় গাড়ি ভাড়া করি। লং ড্রাইভে দূরে বেড়ানোর পক্ষে বড় গাড়িই ভাল। রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে, গানের কথা, সুরের কথা ভাবতে ভাবতে চলি। যখন স্ক্রিপ্ট লিখতে যাই, তখন তো মনটা সে দিকেই থাকে। বন্ধুবান্ধবের ছোট দল নিয়ে, অথবা স্ত্রীকে নিয়ে কিংবা একেবারেই একা হঠাৎ করে পৌঁছে যাওয়ার পক্ষে গড় পঞ্চকোট ভারী সুন্দর জায়গা। অনেকেরই এ জায়গা চেনা, তবু যত বারই যাই, নতুন লাগে। ঘণ্টা চারেকের পথ কলকাতা থেকে।
পুরুলিয়া জেলার মধ্যে পড়ে গড় পঞ্চকোট। কলকাতা থেকে রওনা হয়ে দিল্লি রোড ধরে সোজা আসানসোল পৌঁছে খানিকক্ষণের একটা ব্রেক নিয়ে চা-টা খেয়ে ফের রওনা দিই। আসানসোল থেকে ডান দিকে চলে গিয়েছে রাস্তাটা। পাঞ্চেত বাঁধ পেরিয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় পঞ্চকোটের জঙ্গলে। যে ক’বার গিয়েছি কলকাতা থেকে ফোন করে বাংলো বুক করে গিয়েছি। তাতে নিশ্চিন্তে যাওয়া যায়।
এক দিকে পুরোনো কেল্লা, অন্য দিকে নির্জন পাহাড়। শুনেছি কেল্লা বা গড় স্থাপিত হয়েছিল সিংহ দেও রাজাদের আমলে। অন্য মতে এই কেল্লা আরও অনেক প্রাচীন। সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীতে তৈরি। পুরোনো ভাঙা মন্দিরও আছে কয়েকটা। স্থাপত্যের স্টাইল দেখে মনে হয় নানা রাজার রাজত্বের সাক্ষী গড় পঞ্চকোট।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই গড় পঞ্চকোটে সিংহ দেও রাজাদের এস্টেটে কিছু দিন কাজ করেছিলেন। গড় পঞ্চকোটের পাশে খাড়াই পাঞ্চেত পাহাড়ে শালগাছের জঙ্গল। শীতকালে লালে লাল হয়ে যায় পাকা শালপাতায়। আরও অনেক গাছগাছালি আছে। তার সব কিছু আমার চেনা নয়। প্রচুর বাঁদর ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি জঙ্গলে। আর আছে নানা ধরনের আদিবাসীদের বসতি।
ফরেস্ট বাংলোগুলো খুব ছিমছাম। ওখানে বসে মননশীল কাজ করতে ভাল লাগে। ‘ম্যাডলি বাঙালি’ আর ‘ব্যোমকেশ বক্সী’র স্ক্রিপ্ট গড় পঞ্চকোটে বসেই লেখা। ‘কত কী করার ছিল যে’....এই গানটাও গড় পঞ্চকোটে লেখা।
মন্দারমণিতে আজকাল খুব ভিড় হয়, যদিও জায়গাটা ড্রাইভ করে যাওয়ার পক্ষে খুব সুন্দর। এক সময় গাড়ি নিয়ে শঙ্করপুরে বেড়াতে যেতাম। কিন্তু বিচটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সমুদ্র সৈকত হিসেবে এখন আমার প্রিয় হয়েছে তাজপুর। ভার্জিন বিচ। লোক সমাগম কম। গাড়ি করে বোম্বে রোড হয়ে কোলাঘাট পেরিয়ে, কাঁথি পেরিয়ে তাজপুর সমুদ্রতীর। সমুদ্রের পাড় ধরে সারি সারি ঝাউ গাছ পুরোনো দিঘার কথা মনে করিয়ে দেবে। সমুদ্রটা বিচের ভেতরে ঢুকে পড়ায় অদ্ভুত অন্য রকম দেখায়। সমুদ্রের তীরে প্রচুর লাল কাঁকড়া ঘুরে বেড়ায়। কাছে গেলেই ছুটে পালিয়ে যায়। তাজপুর বিচে মাছভাজা পাওয়া যায় নানা রকম। পানাসক্তি থাকলে মাছভাজার সঙ্গে জমে ভাল।
তাজপুরের হোটেলগুলো অনেকটা ক্যাম্পের মতো। খাবারদাবার খুব সাধারণ কিন্তু সমুদ্র আর তার তীর এত সুন্দর যে এই সব খামতি ঢাকা পড়ে যায়।
নিরিবিলিতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য গড় পঞ্চকোট আর তাজপুর আমার লেটেস্ট পছন্দ। চলো লেটস গো বলে বেরিয়ে পড়লে এ দু’টো জায়গার প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি নিবিড় তার নির্জনতা। বেড়াতে গিয়ে কি ভিড়ভাট্টা ভাল লাগে?

পাটালিগুড়ের গন্ধ মেখে
রূপঙ্কর

আমার সুইফট ডেজায়ার গাড়িটা নিয়ে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি। কখনও সপরিবারে, কখনও সদলবলে। তবে কী গাড়ি নিয়ে হাইওয়ে দিয়ে খুব সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করা উচিত। ওভারটেক করার নেশাটা যেন পেয়ে না বসে। মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে তা না হলে।
যিনি গাড়ির ড্রাইভার তাঁর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। যিনি ড্রাইভ করছেন তাঁর যদি ঘুম পায় তা হলে অন্য কাউকে স্টিয়ারিং ধরতে হবে। বা কোথাও থেমে চা খেয়ে নিতে হবে।
মাত্র আড়াই থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নিতে গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম একবার ‘আমার গ্রাম’-এ। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গিয়ে পানাগড় দার্জিলিং মোড় থেকে শান্তিনিকেতনের দিকে যেতে হবে। শ্রীনিকেতন পার হয়ে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই ‘আমার গ্রাম’। এটা আসলে একটা রিসর্ট। কিন্তু ঘরগুলো দেখতে কুটিরের মতো। ভেতরে আধুনিক সুযোগসুবিধার হোটেল। মাটির গন্ধ লেগে আছে হোটেলের উঠোনে। ‘আমার গ্রাম’ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকলে চারিদিকে গ্রাম, গাছপালা, পুকুর।
কোপাই নদীটাও খুব কাছে। শীতালে পরিযায়ী পাখিরা নদীর ধারে বসতি পাতে। তাদের দেখা পাওয়া একটা বাড়তি পাওনা। ‘আমার গ্রাম’এর কাছে প্রতি শনি-রবিবার আদিবাসীদের হাট বসে। সেই হাটে নানা ধরনের কুটিরশিল্পের জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে মেয়েদের সুন্দর-সুন্দর গয়না তো বটেই। কিছু কেনাকাটা না করলেও এই হাটের জমায়েত দেখতে বেশ লাগে। ছবি তোলার পক্ষে খুব বর্ণময়।
আমরা যে বার ‘আমার গ্রাম’ এ বেড়াতে গিয়েছিলাম এক রাত্রি ছিলাম। খুব মজা হয়েছিল। সেই সময় ‘অটোগ্রাফ’ রিলিজ করেছিল। অনুপম রায়ের গান মুখে মুখে ফিরছিল। আমরা রিসর্টে বসে রাত্রে মজা করে ফোন করে অনুপমকে বলেছিলাম, আমরা আপনার গানের ভীষণ ফ্যান তাই ফোন করছি। ও বুঝতে পারেনি প্রথমে। পরে বলেছিলাম আমি রূপঙ্কর বলছি।
‘আমার গ্রাম’ থেকে শান্তিনিকেতনের দূরত্ব আধ ঘণ্টার। এক পাক শান্তিনিকেতনেও ঘুরে আসা যায় গাড়ি নিয়ে।
লং ড্রাইভে যেতে হলে আর একটা জায়গা আমার খুব প্রিয়।
তার নাম ‘মনচাষা’। ‘মনচাষা’ একটা রিসর্ট। মেদিনীপুরে কাঁথি শহরের অদূরে এই পান্থনিবাস। মাটির গন্ধ লেগে আছে সেখানেও। হোটেলের চারধারে আদিগন্ত গ্রাম আর পুকুর। শীতকালে মাঠকে মাঠ চাষ হয় বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওল কপি, মটরশুঁটি। আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে বেশ গ্রামের মানুষ বলেই মনে হবে। ‘মনচাষা’ রিসর্টটা গড়ে উঠেছে পাঁউশি নামের গ্রামে।
বম্বে রোড ধরে যেতে যেতে হলদিয়া মোড় পড়বে। সেই মোড় থেকে বাঁ দিকে গেলে পড়বে নন্দকুমারের মোড়। সেখান থেকে দিঘার দিকে যেতে গেলেই পড়বে কাঁথি। কাঁথি পার হয়ে ডান দিকে গেলেই পাঁউশি গ্রাম।
পাঁউশিতে গুড় তৈরির কারখানা আছে। পাটালি গুড় কেমন ভাবে তৈরি হয় এক চক্কর ঘুরে দেখে আসা ইন্টারেস্টিং। কেনাও যেতে পারে সদ্য তৈরি খাঁটি গুড়।
শীতকালে লং ড্রাইভে বেড়াতে গেলে আমার পছন্দ বাংলার গ্রামের এমনই সব জায়গা যেখানে মেঠো সৌন্দর্য আছে। আছে গ্রামীণ মানুষজনের সারল্য।
শহুরে ইটকাঠের খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে হলে এই শনি-রবিবারই চলে যান ‘আমার গ্রাম’ কিংবা মনচাষা।

আনন্দবাজার পত্রিকা

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন