পত্রিকা

শনিবারের নিবন্ধ

চিরযৌবনের দূত

আগামী শনিবার তাঁর বয়স হবে দেড়শো। অথচ জনমানসে এখনও তিনি তরুণ।

শংকর
কলকাতা, ৫ জানুয়ারি ২০১৩

ছবি- ফাইল চিত্র

দেহাবসানের তারিখ (৪ জুলাই ১৯০২) ধরলে একশো দশ বছর। কিন্তু তিনি আজও বিস্ময়কর ভাবে বেঁচে আছেন। এই অসম্ভব কেমন করে সম্ভব হল? একটি কারণ বোধ হয় তাঁর প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, যেখানে আজও মৃত্যুকে কোনও স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। বরং বলা হয় বিদায় দিন থেকেই তো মহামানবদের নতুন করে বেঁচে থাকা। কৃষ্ণ, বুদ্ধ, শঙ্কর, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ তো এই ভাবেই বেঁচে আছেন। শেষজনের সম্বন্ধে তো বিশ্বাস, ১৫০০ বছর পর তিনি আবার ফিরে আসবেন। আর একজন তো বহু যুগ আগেই আশ্বস্ত করে গিয়েছেন ভক্তজনদের, যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানি....সাধুজনের পরিত্রাণের জন্য, দুষ্কৃতীর বিনাশের প্রয়োজনে তিনি সম্ভবামি যুগে যুগে।
দেড় হাজার বছর তো মস্ত বড় কথা। কিন্তু আমাদের বিবেকানন্দ যে মাত্র চল্লিশ বছরের জীবনকে সম্বল করেই ১৫০ নট আউট থাকবেন এই ভাবে, সেটাও কম আশ্চর্যের কথা নয়। মেনে নেওয়া ভাল, বেলুড়ে জুলাইয়ের রাত নটা বেজে দশ মিনিটে যে সন্ন্যাসী বিনা নোটিশে বিশ্বসংসার থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তাঁর দাপট আজকের বহুবন্দিত বিবেকানন্দের মতন ছিল না। বেলুড় মঠে বিদ্যুৎ না থাকলেও টেলিফোন ছিল, কিন্তু প্রয়াত বিবেকানন্দ পরের দিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, বিশ্বপ্রধানরাও তাঁর জন্য শোকবার্তা প্রেরণ করেননি। সব ব্যাপারটাই ছিল নিতান্ত সাধারণ, তাই কালের সংগ্রহে বীর সন্ন্যাসীর ডেথ সার্টিফিকেট নেই, কোনও আলোকচিত্র নেই, শেষকৃত্যের স্থান সম্বন্ধে অনুমতি দিতে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের দ্বিধা ও বিলম্ব রয়েছে এবং এই নগর কলকাতায় পরবর্তী সময়ে তাঁর বিদ্রোহিনী মার্কিনি সন্ন্যাসিনী শিষ্যার অন্য বিষয়ে বক্তৃতার দীর্ঘতর প্রতিবেদন রয়েছে সেই যুগকে লজ্জা দিতে।
তার আগেও সমকাল যথেষ্ট লজ্জা দিয়েছে তাঁকে। তাঁর পাড়ার লোক বিদেশে গিয়ে বিপুল উৎসাহে যথাসম্ভব নিন্দা রটিয়েছেন, তাঁর সন্ন্যাসজীবন সম্বন্ধে লজ্জাজনক কটাক্ষ করেছেন, ইঙ্গিত দিয়েছেন নারী সংসর্গ সম্পর্কে। বলেছেন, সন্ন্যাসীর বেশে জুয়াচোর, এক-আধটি নয়, ওঁর অনেকগুলি স্ত্রী ও একপাল ছেলে আছে। এই শহরের সংবাদপত্রেও অভিযোগ উঠেছে, শিকাগো বক্তৃতার ঠিক পরেই তিনি কি বিদেশের রেস্তোরাঁয় নিষিদ্ধ মাংসের অর্ডার দিয়েছিলেন? মৃত্যুর কাছাকাছি এসেও সেই সব যন্ত্রণার অবসান হয়নি। বেলুড় মঠকে নরেন দত্তর ‘প্লেজার হাউস’ বলে চিহ্নিত করে বালি মিউনিসিপ্যালিটি ট্যাক্স নির্ধারণ করেছে। বাধ্য করেছে বিপন্ন সন্ন্যাসীকে আদালতে যেতে এবং লোকমুখে বিবেকানন্দ শব্দটির সরস বিকৃতি ঘটেছে ‘বিবিকা আনন্দ’। রাজপুরুষরাও যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখে তাঁর ওপর নজর রেখেছেন। পরবর্তী কালে সংঘ জননী সারদামণি তো বলেই ফেলেছেন, বেঁচে থাকলে নরেনকে ইংরেজের জেলে পচতে হত।
শুধু শাসককে দোষ দেওয়া যাবে না, নগর কলকাতার নিষ্ঠাবান, নামীদামি নাগরিক তাঁর স্মরণসভায় যেতে চাননি। এমন কথাও বলেছেন, হিন্দু আমল হলে তাঁকে তুষানলে দগ্ধ হতে হত। সবাই অবশ্য ওই দলে নয়, কিন্তু যাঁরা স্মরণসভায় বিবেকানন্দ স্মৃতি তহবিলে কিছু দান করতে প্রতিশ্রুত হয়েছিলেন তাঁরাও কথা রাখেননি। রামকৃষ্ণ মিশনের ইতিহাসের আদিপর্বে এর বেশ কিছু বিবরণ রয়েছে। যেমন ইঙ্গিত রয়েছে সংঘের প্রথম প্রধান স্বামী ব্রহ্মানন্দের নোটবইতে স্বামীজির চিকিৎসার খরচ সম্বন্ধে। বিশ্ববিজয়ে বেরিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপে ভারতকে পরিচিত করে, কলকাতায় ফিরে যে বিবেকানন্দ-সংবর্ধনা সভা হয়েছিল, তার আয়োজনের বিল তাঁকেই ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নানা রোগে জর্জরিত স্বামীজিকে চেম্বারে দেখে খ্যাতনামা বাঙালি ডাক্তার (১৮৯৮ অক্টোবর) যে চল্লিশ টাকা নিয়েছিলেন তা আজকের হিসেবে কত? একশ নয়, তিনশ দিয়ে গুণ করলে একটা কাছাকাছি অঙ্কে পৌঁছানো যাবে। স্বামী ব্রহ্মানন্দের দিনলিপি অনুযায়ী ডা. রসিকলাল দত্তের চেম্বার ছিল ২ নম্বর সদর স্ট্রিট। চল্লিশ টাকা ছাড়াও ওষুধের বিল দশ টাকা।
অর্থাৎ বলা চলতে পারে মানুষের জন্য, দেশের জন্য, সেবার জন্য, সত্যের জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়ে তাঁর কীর্তি কতখানি সুদূরপ্রসারী হবে তা সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ তাঁর জীবনকালে আন্দাজ করে যেতে পারেননি। এ বিষয়ে তাঁর মাথাব্যথাও ছিল না। সন্ন্যাসীর জব ডেসক্রিপশন তিনি তাঁর অতুলনীয় বাংলায় লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। ‘বহু জন হিতায় বহু জন সুখায়’ সন্ন্যাসীর জন্ম। পরের জন্য প্রাণ দিতে, জীবের গগনভেদী ক্রন্দন নিবারণ করতে, বিধবার অশ্রু মোছাতে, পুত্রবিয়োগ বিধুরার প্রাণে শান্তি দান করতে আর ইতর সাধারণকে জীবন সংগ্রামের উপযোগী করতে শাস্ত্রোপদেশ বিস্তারের দ্বারা সকলের ঐহিক ও পারমার্থিক মঙ্গল করাতে এবং জ্ঞানালোক দিয়ে সকলের মধ্যে প্রসুপ্ত ব্রহ্ম-সিংহকে জাগরিত করতে সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছে।
সন্ন্যাসীর ভিশন ও মিশন স্টেটমেন্টের সবটুকুই যে এখানে লিপিবদ্ধ হয়নি তা তিরিশ বছর বয়সে আটলান্টিকের ওপারে ঝড় ওঠানো থেকেই বোঝা যায়। পশ্চিমের প্রতি তাঁর বাণী জগৎ সংসারে তাঁকে প্রথম পরিচিত করে এবং তার রেশ এসে পৌঁছায় সুদূর জন্মভূমিতে।
এই সুযোগে সন্ন্যাসীর ৩৯ বছরের জীবনকে কয়েকটা অংশে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। জীবনের প্রথম বড় ঘটনা শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে পরিচয়। ‘‘যিনি সবচেয়ে আধুনিক এবং সবচেয়ে পূর্ণ বিকশিত চরিত্র জ্ঞান, প্রেম, বৈরাগ্য, লোকহিতচিকীর্ষা, উদারতার পূর্ণ প্রকাশ’’। এই সময়টা মোটেই দীর্ঘ নয়, গুরু রামকৃষ্ণের প্রয়াণকাল উপস্থিত হল। দেহত্যাগের পর সকলে ছেলেগুলোকে হাভাতে গরিব ছোঁড়া মনে করে ত্যাগ করে দিল। স্বামীজির নিজের কথায়, “আমরা সংগ্রামে ঝাঁপ দিলাম। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম যে এই ভাবধারা একদিন সমগ্র ভারতবর্ষকে যুক্তিপরায়ণ করে তুলবে। এবং নানা দেশ ও নানা জাতির কল্যাণসাধন করবে।”
এর পরের পর্যায়টি বড় রোমাঞ্চকর। পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর ভারতসন্ধান। দুঃখী ভারতকে আবিষ্কার মস্ত এক ঘটনা। নতুন এক অনুভূতি যা আমাদের বিবেকানন্দকে অনন্য করে তুলেছিল। কিন্তু তাঁর বিচক্ষণতার অভাব নেই “ভারতের অসংখ্য নরনারী আমাকে বুঝতে পারে না।” কিন্তু একই সঙ্গে দুর্জয় মনোবৃত্তি, “আমি যতক্ষণ খাঁটি আছি, ততক্ষণ কেউ আমাকে প্রতিরোধ করতে সমর্থ হবে না।... যুবকদলকে সঙ্ঘবদ্ধ করতেই জন্মগ্রহণ করেছি। এরা দুর্দমনীয় তরঙ্গাকারে ভারতভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। যারা সর্বাপেক্ষা দীন হীন পদদলিত তাদের দ্বারে দ্বারে এরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, নীতি, ধর্ম ও শিক্ষা বহন করে নিয়ে যাবে। এটাই আমার আকাঙ্ক্ষা ও ব্রত। এটি আমি সাধন করব কিংবা মৃত্যুকে বরণ করব।
শ্রীরামকৃষ্ণের পদাশ্রিত হতে পৈতৃক সংসার ছেড়ে তেইশ বছর বয়সে সন্ন্যাসী হওয়াটাই যদি তাঁর কঠিনতম সিদ্ধান্ত হয় তাহলে পরবর্তী কঠিন সিদ্ধান্ত হল সপ্তসাগর পেরিয়ে মাত্র ৩০ বছর বয়সে নিতান্ত সামান্য অর্থ সম্বল করে আমেরিকায় উপস্থিত হওয়া।
তাঁর লক্ষ্য কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট “কারও কথায় আমি চলব না। আমার জীবনের ব্রত কী তা আমি জানি...আমি যেমন ভারতের তেমনি সমগ্র জগতের”।
পশ্চিমের বিরাট সাফল্য সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্যে অবিচলিত বিবেকানন্দের প্রবাস উপলব্ধি। “এই অপরিচিত দেশের নরনারী আমাকে যতটুকু বুঝতে পেরেছে, ভারতবর্ষের কেউ কখনও ততটুকু বোঝেনি। কিন্তু আমি সন্ন্যাসী এবং সব দোষত্রুটি সত্ত্বেও ভারতবর্ষকে ভালবাসি। অতএব দু’চার মাস পরেই দেশে ফিরছি এবং যারা কৃতজ্ঞতার ধারও ধারে না, তাদেরই মধ্যে আগেকার মতো নগরে নগরে ধর্ম উন্নতির বীজ বপন করতে থাকব।”
কিন্তু বিশ্বের দরবারে স্বামীজির মূল বাণীটি কী? কঠিন কাজ, সম্ভব হলে তাঁর নিজের বাণী থেকেই উদ্ধৃতি দেওয়া ভাল। ৭ জুন ১৮৯৬ লন্ডন থেকে স্বামীজি বলছেন, “আমার আদর্শকে অতি সংক্ষেপে প্রকাশ করা চলে, আর তা এই- মানুষের কাছে তার অন্তর্নিহিত দেবত্বের বাণী প্রচার করতে হবে এবং সব কাজে সেই দেবত্ব বিকাশের পন্থা নির্ধারণ করে দিতে হবে। কুসংস্কারের শৃঙ্খলে এই সংসার আবদ্ধ। যে উৎপীড়িত সে নর বা নারীই হোক তাকে আমি করুণা করি। আজ যে উৎপীড়নকারী, সে আমার আরও বেশি করুণার পাত্র। যাঁরা জগতে সবচেয়ে সাহসী ও বরেণ্য, তাঁদের চিরদিন বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় আত্মবিসর্জন করতে হবে। অনন্ত প্রেম ও করুণা বুকে নিয়ে শত শত বুদ্ধের আবির্ভাব প্রয়োজনীয়। আমরা চাই জ্বালাময়ী বাণী এবং তার চেয়ে জ্বলন্ত কর্ম। হে মহাপ্রাণ, ওঠো, জাগো! জগৎ দুঃখে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। তোমার কী নিদ্রা সাজে?”
প্রবাসে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের বিরাট সম্মান ও স্বীকৃতির কথাই শুনেছি আমরা। কিন্তু সংগ্রামী ব্যর্থতার কথাও এসে যায়। “স্বদেশবাসীদের কেউ কেউ তারস্বরে এই কথাই ঘোষণা করেছেন যে আমি একটি পাকা ভণ্ড এবং আমেরিকায় পদার্পণ করেই আমি প্রথম গেরুয়া ধারণ করেছি।” এর পরেই সেই দুঃখজনক স্বীকৃতি, “অভ্যর্থনার ব্যাপারে অবশ্য এই সব প্রচারের ফলে আমেরিকায় কোনও ক্ষতি হয়নি। কিন্তু অর্থসাহায্যের ব্যাপারে এই ভয়াবহ ফল ঘটেছে যে আমেরিকাবাসীগণ আমার কাছে একেবারে হাত গুটিয়ে ফেলেছে। কাজের জন্য সঙ্ঘের প্রয়োজন, সঙ্ঘের জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু এদেশে এক বৎসর ক্রমান্বয়ে বক্তৃতা দিয়েও আমি বিশেষ কিছু করতে পারিনি। অবশ্য আমার ব্যক্তিগত কোনও অভাব নেই। কিন্তু আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের জন্য অর্থসংগ্রহ করে উঠতে পারিনি।” এর পরেই অভিমানী সন্ন্যাসীর সেই বিখ্যাত উক্তি, “মানুষের সাহায্য আমি অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করি। যিনি গিরিগুহায়, দুর্গম বনে ও মরুভূমিতে আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন আমার বিশ্বাস, তিনি আমার সঙ্গেই থাকবেন।” আরও ব্যাখ্যা, “আমি মোটেই ‘ঝঞ্ঝাসদৃশ’ নই, বরং ঠিক তার বিপরীত। আমার যা কাম্য, তা এখানে লভ্য নয়।” তা হলে দুঃখী মানুষের কর্ম কী? তাও অকপটে জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের সন্ন্যাসী, “মুষ্টিমেয় কয়েকটি বড় আকারের মানুষ তৈরি করাই আমার ব্রত।”
চল্লিশ বছরের জীবনের পাঁচ বছর দু’টি পর্যায়ে দেশের বাইরে ব্যয় করে সন্ন্যাসী যে অসম্ভবকে সম্ভব করে গিয়েছেন তাঁর হিসেব নিকেশ আজও সম্পূর্ণ হয়নি। তিরিশ বছর ধরে একটানা অনুসন্ধান করে বিদেশিনী অনুরাগিণীরা যেসব তথ্য একুশ শতকের পাঠকের কাছে উপস্থাপিত করেছেন তা বিস্ময়কর। পশ্চিমের সেই অনুসন্ধানকার্য আজও শেষ হয়নি। এই বছরেও ভক্ত বিদেশিরা প্রায় হাজার পাতার বই লিখে ফেলে জানিয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম সন্ন্যাসী যিনি অনন্তকালের ভারতবাণীকে মহাসমুদ্রের অপর পারে নিয়ে গিয়েছেন। সামান্য কয়েক বছরের উপস্থিতি, কিন্তু শতবর্ষের ব্যবধানেও তা নতুন প্রজন্মের বিনম্র বিস্ময় অর্জন করে চলেছে।
দেশে ফেরা বিবেকানন্দ কিন্তু কিছুটা দিশাহীন। একবার তিনি বলছেন,“আমি স্বদেশবাসীর উন্নতিকল্পে যে কাজে হস্তক্ষেপ করেছি তা সম্পন্ন করবার জন্য প্রয়োজন হলে দু’শ বার জন্মগ্রহণ করব”, আবার অকপট ভাবে জানাচ্ছেন,“আমি দুনিয়া ঘুরে দেখলাম, এ দেশের মতো এত অধিক তামস-প্রকৃতির লোক পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাইরে সাত্ত্বিকতার ভান, ভেতরে একেবারে ইট-পাটকেলের মতো জড়ত্বএদের দ্বারা জগতে কী কাজ হবে? এমন অকর্ম, অলস, শিশ্নোদরপরায়ণ জাত কতদিন আর বেঁচে থাকতে পারবে?” তবু স্বদেশ সম্বন্ধে হতাশা নেই বীর সন্নাসীর হৃদয়েআমি নেড়ে চেড়ে এদের ভেতর সাড় আনতে চাইএজন্য আমার প্রাণান্ত পণ।”
যে ভারতবর্ষকে তিনি আবার দেখতে চান তার ছবিও সন্ন্যাসী মৃত্যুর আগে সযত্নে একে দিয়েছেন। “আমি সেই ভারতকেই আবার দেখতে চাই, যে ভারতে প্রাচীন যুগে যা কিছু শ্রেষ্ঠ ভাব ছিল তার সঙ্গে বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ ভাবগুলি স্বাভাবিক ভাবে মিলিত হয়েছে।”
পূর্ব-পশ্চিমের এই স্বাভাবিক মিলন থেকেই কি রামকৃষ্ণ মিশনের সৃষ্টি? বিবেকানন্দ তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। “আমেরিকায় এসে একটা মস্ত প্রলোভনে পড়ে গেছি। ঠিক এত বড় প্রলোভনের মুখোমুখি আর কখনও হইনি। না, না, কোনও মেয়ে নয়; আমি ভাবছি একটি সঙ্ঘ গড়ার কথা।”
শতাব্দীর দীর্ঘ দূরত্ব পেরিয়ে এই মঠ-মিশনকেই স্বামীজির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলতে লোভ হয়। সন্ন্যাসীও যে সম্রাটের থেকে বড় সংগঠক হতে পারেন এই দেশে তার প্রমাণ এই রামকৃষ্ণ নামাঙ্কিত সঙ্ঘ। তার পিছনে রয়েছে সন্ন্যাসীর বিশেষ চিন্তা“আমি এত তপস্যা করে এই সার বুঝেছি যে, জীবে জীবে তার অধিষ্ঠান হয়ে আছেন; তাছাড়া ঈশ্বর-ফিশ্বর কিছুই আর নেই।জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” রামকৃষ্ণের প্রকৃত যে সংজ্ঞা তিনি দিয়েছেন তা আসমুদ্র ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে অতি অল্প সময়ের মধ্যে। “যে রামকৃষ্ণের ছেলে, সে আপন ভাল চায় না, প্রাণ দিয়েও তারা পরের কল্যাণকাঙ্ক্ষী। যারা আপনার আয়েস চায়, কুঁড়েমি চায়, যারা আপনার জেদের সামনে সকলের মাথা বলি দিতে রাজি, তারা আমাদের কেউ না, তারা তফাত হয়ে যাক, এই বেলা ভালয় ভালয়।”
উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে একুশ শতকের এই সময় পর্যন্ত ভারত ইতিহাসের বড় কঠিন সময়। কী না ঘটেছে এই সময়কালেস্বাধীনতা আন্দোলন, মহাযুদ্ধ, মহামন্বন্তর, পৃথিবীর বৃহত্তম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁ, কোটি কোটি মানুষের ছিন্নমুল হওয়া, পার্টিশন, স্বাধীনতা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ, কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশনের বিকাশ ব্যাহত হয়নি।
সম্প্রতি পশ্চিম থেকেও শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্বীকৃতি আসা শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে, যে গৈরিকধারী বিশ্বসভায় ভাষণ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন তিনি সর্ব অর্থে সাগরপারে বেদান্তের বংশীধারী (পাইড্ পাইপার)। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সমস্ত বাধা অক্লেশে অতিক্রম করে দৈহিক মৃত্যুর পরেও তিনি কী ভাবে এত দিন বেঁচে রইলেন তার দীর্ঘ রিপোর্টও তৈরি হতে চলেছে এই সার্ধ শতবর্ষে। আর স্বদেশে কোন মন্ত্রবলে তিনি এত দিন বেঁচে রইলেন? এই অনন্ত বিস্ময়ের পিছনে কে রয়েছেন? তিনি কি বক্তা বিবেকানন্দ? আচার্য বিবেকানন্দ? সাধক বিবেকানন্দ? অনন্য লেখক বিবেকানন্দ? দরিদ্রের সেবক বিবেকানন্দ? না গত তিন’শ বছরের শ্রেষ্ঠ সংগঠক বিবেকানন্দ? যাঁরা কিছু খবরাখবর রাখেন তাঁরা বলছেন প্রেমিক যখন সংসার ত্যাগ করেও সংগঠক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর কোনও তুলনা থাকে না। বোধহয়, গুরুর নামাঙ্কিত মঠ ও মিশনই তাঁর অতুলনীয় উপহার। আরও একটা কথা মনে এসে যায় তাঁর প্রায় সমকালীন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গাঁধী ও অরবিন্দও তাঁদের নিজস্ব সাধনার সঙ্গে আশ্রমজীবনের স্বপ্নও দেখেছিলেন। মানবসভায় তাঁরা আজও বিশেষভাবে সন্মানিত, কিন্তু তাঁদের আশ্রম স্বপ্ন তেমন দীর্ঘস্থায়ী বা প্রাণময় থাকেনি, যা সম্ভব হয়েছে বিবেকানন্দের ক্ষেত্রে।
সংসারের সমস্ত মায়াবন্ধন ছিন্ন করেও তাঁর সমকালকে বলতে পেরেছিলেন ত্যাগভোগ সবই বুদ্ধির বিভ্রম; ‘প্রেম’ ‘প্রেম’ একমাত্র ধনতিনিই জন্মের সার্ধশতবর্ষে আশ্চর্য ভাবে বেঁচে আছেন এ দেশের সংখ্যাহীন মানুষের মনে।

আনন্দবাজার পত্রিকা

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন