প্রবন্ধ
বিশ্ব উত্তরাধিকারের গাঁধী
গৌতম চক্রবর্তী
কলকাতা,১৯ জানুয়ারি ২০১৩
গাঁধীর অবস্থাটা দাঁড়াবে গোতম বুদ্ধের মতো। ভারত ওঁকে ভুলে যাবে, প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু বাকি এশিয়া তাঁকে জড়িয়ে ধরবে। ... মহাত্মা গাঁধীর পৌত্র, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গাঁধী এক আড্ডায় রামচন্দ্র গুহকে এ রকমই ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়েছিলেন।
ভবিষ্যদ্বাণীটি আডবানির রথযাত্রার সময়ের। বাবরি মসজিদ তখন ধূলিসাৎ, দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। বিতর্কিত কাঠামোয় আরও কয়েকজন গাঁধীবাদী নেতানেত্রীকে নিয়ে চলে গিয়েছেন গাঁধী-শিষ্যা সুশীলা নায়ার। গাঁধীর ব্যক্তিগত সচিব প্যারেলাল নায়ারের ছোট বোন সুশীলা জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন।
বৃদ্ধা সুশীলার নেতৃত্বে গাঁধী-ভক্তরা তখন অযোধ্যার বিতর্কিত কাঠামোয় বসে গাঁধীজীর প্রিয় ভজন গাইছেন, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম।‘ পরের লাইন ‘ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম’-এ আসতেই সামনে থেকে চপ্পল এবং কলার খোসার বৃষ্টি। হতবাক বৃদ্ধা কোনওক্রমে জানালেন, ‘আমরা গাঁধীজির ভক্ত, দাঙ্গাহাঙ্গামা রুখতে চাইছি'। প্রত্যুত্তরে ভেসে এল জোরালো কণ্ঠ, ‘আমরা নাথুরাম গডসের ভক্ত।‘ ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহকে সেই ঘটনাটা শুনিয়েই গোপালকৃষ্ণ ওই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সেই ঘটনার পর এক দশক পেরিয়ে গিয়েছে। এবং এই দীর্ঘ ব্যবধান পেরিয়ে ‘ইন্ডিয়া আফটার গাঁধী’-র লেখকের মনে হয়, গোপালকৃষ্ণ ভবিষ্যদ্বাণী দুর্ভাগ্যজনকভাবেই সত্যি হতে চলেছে। গাঁধীর উত্তরাধিকার যাঁরা প্রতি মুহূর্তে দাবি করেন, সেই কংগ্রেস দলের সঙ্গে আজ গাঁধীর কোনও সম্পর্ক নেই। কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গাঁধী থেকে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সকলেই গাঁধীর বৃত্তের বাইরে। অন্না হাজারে যতই দুর্নীতি আর ভ্রষ্টাচারবিরোধী আন্দোলনের কথা বলুন, তাঁর মধ্যেও স্বৈরাচারী মানসিকতা। বরং মায়ানমারের আং সান সু কি দীর্ঘ কারাবাস ও অন্তরীনদশা সহ্য করেও জননেত্রী। নিজের পুত্রকন্যাকে নেতা বানানোর মানসিকতা তাঁর নেই, উল্টে সকলের কথা বলার সমান অধিকার। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও হিংস্র প্রত্যাঘাত তিনি চান না। নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস সে দেশে বর্ণবিদ্বেষ ঘোচাতে দীর্ঘকাল সত্যাগ্রহ চালিয়েছে, ক্ষমতায় আসার পরেও শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করেনি। নির্বাসিত তিব্বতি ধর্মগুরু চতুর্দশ দলাই লামা আজও গাঁধীর পথেই তিব্বতে স্বায়ত্তশাসন চান। ভারতে যাই হোক, এশিয়া, আফ্রিকা তথা সারা বিশ্বে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী আজও উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। গত ১২ জানুয়ারি, স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনে জাতীয় গ্রন্থাগারের ইতিহাসঋদ্ধ বেলভেডেয়ার হাউসের সিঁড়িতে এইভাবেই গাঁধীকে নিয়ে চমকপ্রদ এক বক্তৃতা দিয়ে গেলে রামচন্দ্র গুহ। ‘কী রকম এশীয় ছিলেন গাঁধী?’ শিরোনামে তাঁর সেই বক্তৃতা পদে পদে প্রমাণ করে দিল, মোহনদাস কর্মচন্দ্র গাঁধী শুধুই ‘জাতির পিতা’ নন। বরং ‘এশীয় সংহতি’র পুরোধা ও পথিকৃৎ।
গাঁধীর নেতৃত্বে এই এশীয় সংহতি শুরু হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাতেই। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তিনি বের করেছিলেন তাঁর অমোঘ অস্ত্র ... ‘সত্যাগ্রহ’। গাঁধীর নেতৃত্বে শুধু ভারতীয় নন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী চিনারাও মেনে নেন এই অস্ত্রের ব্যবহার।
ওয়ারেন হেস্টিংসের স্মৃতিবিজড়িত বেলভেডেয়ারের সোপানে দাঁড়িয়ে সেই সন্ধ্যায় জোহানেসবার্গের এম্পায়ার থিয়েটারের কথা টেনেছেন রাম। এম্পায়ার থিয়েটার, সেপ্টেম্বর ৯, ১৯০৬। তিন হাজার এশীয় মানুষের জমায়েত। সেখানেই বিলেতফেরত ভারতীয় ব্যারিস্টার ঘোষণা করলেন তাঁর নতুন কর্মসূচি। আবেদন-নিবেদন নয়। সশস্ত্র সংগ্রহ নয়। সত্যের জন্য স্বেচ্ছায়, অহিংস পদ্ধতিতে জেল ভরাবেন তাঁরা। গাঁধী সঙ্গে প্রস্তাবের পক্ষে সাক্ষর করলেন আরও দুই জন। দক্ষিণ ভারতের তাম্বি নাইডু আর ট্রান্সভালের ‘চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর তৎকালীন কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান লেওং কুইন। ‘প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন তাই চিনা এবং ভারতীয়দের প্রথম সহযোগিতা,’ বললেন ইতিহাসবিদ।
শুধু সহযোগিতা? জোহানেসবার্গে তখন হিরের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। ডাচ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা নিজেদের মধ্যে সেই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগি করে রাখতে চায়। অন্য দিকে মরিশাস থেকে দলে দলে এশীয় পাড়ি জমিয়েছে নাটালের দিকে। কিন্তু নাটাল থেকে ট্রান্সভাল বা উল্টোপথে এশীয়দের বিনা অনুমতিতে আসা বারণ।
ট্রান্সভালে তখন প্রায় ১১ হাজার চিনার বাস। গাঁধীর ডাকে সাড়া দিয়ে এশীয় জনগণের ৩৫ শতাংশই তখন কারাগারে। অনাবাসী গুজরাতি ব্যবসায়ীরা সেভাবে সত্যাগ্রহের ডাকে সাড়া দেননি। ‘সাহস ও উদারতায় চিনারা ভারতীয়দের ছাপিয়ে গিয়েছেন,’ ১৯০৮ সালেই লিখছেন গাঁধী। তাঁর আইনজীবী বন্ধু ও সহকর্মী হেনরি পোলকও গাঁধী-জীবনী লেখার সময় ভারতীয় হিসেবে নয়, এশীয় নেতা হিসাবেই তাঁকে উজ্জ্বল করে রাখেন, ‘গাঁধীর নেতৃত্বে এশীয়রা আজ লড়ছে। ক্রীতদাস হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে সমানে সমানে বিবেচিত হয় তারা।’ চিনে ফেরার পথে জাহাজে চেপে মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই) শহরে নেমেছেন নিয়ং কুইন। ‘এশিয়ার সম্মান ধুলোয় লুটোচ্ছে দেখেই গাঁধীর ডাকে আমরা যোগ দিয়েছি,’ বলে গেলেন তিনি।
গাঁধীর উত্তরাধিকারকে তিন ভাগে ভাগ করছেন রামচন্দ্র। প্রথম, রাজনৈতিক গাঁধী। চিন, ভিয়েতনাম থেকে মায়ানমার অবধি যেখানেই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ চলছে, বেঁচে আছে গাঁধীর উত্তরাধিকার। আর, সেই প্রসঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী লিউ জিয়াওবো-র কথা টেনে আনলেন রাম। লিউ-এর লেখায় যত না মাওয়ের উল্লেখ, তার চেয়েও বেশি গাঁধীর কথা। ‘লিওং কুইন যদি প্রথম গাঁধীবাদী চিনা নেতা, লিউ জিয়াওবো তার সাম্প্রতিক সংস্করণ,’ বলছিলেন রাম।
দ্বিতীয়জন, প্লুরালিস্ট বা বহুত্ববাদী গাঁধী। এই যে ভারতে বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া, গুজরাতি, মারাঠি-সহ ১৮টি বিধিবদ্ধ ভাষা, অঙ্গামি, আও, লদাখিসহ ৯৬টি ‘নন স্পেসিফায়েড ল্যাঙ্গুয়েজ’, এ গাঁধীরই উত্তরাধিকার। ব্রিটিশের দেখানো দেশীয় রাজ্যর মানচিত্র বেয়ে নয়, ভাষার ভিত্তিতেই তিনি ভারতকে চিনতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর আগের বছর তাই বেলেঘাটার বাড়িতে বসেও বাংলা শেখেন, দেওয়ালে কাঠকয়লায় লিখে রাখেন, ‘আমার জীবনই আমার বাণী'।
তৃতীয়জন, পরিবেশবাদী গাঁধী। বড় বাঁধ, নির্বিচার নগরায়ণ আর প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠতরাজের বিরুদ্ধে যেখানেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে, গাঁধীর উত্তরাধিকার। স্বাভাবিকভাবেই এই তিন গাঁধীর রাজপাট ভারত ছাড়িয়ে আরও বহুধাবিস্তৃত।
ইন্টাকের সহযোগিতায় ন্যাশনাল লাইব্রেরি ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজের উদ্যোগে রামচন্দ্র গুহ এই বক্তৃতার শেষে চমৎকার ভঙ্গিতে ইতি টানল বর্কা ও ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডিরেক্টর জেনারেল স্বপন চক্রবর্তীর কথোপকথন। টেক্সট ব্যাখা করার যে ‘হেরমেনিউটিক্স’ পদ্ধতি, সেখানে গাঁধীর লেখালেখি ও বক্তব্যকে আমরা কীভাবে দেখব? ‘হেরমেনিউটিক্স অব ট্রাস্ট’, বলছিলেন স্বপনবাবু।
সন্দেহ, সংঘাত নয়। বরং বিশ্বাস! বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর অবিশ্বাস ও সন্দেহের বাতাবরণে সুশীলা নায়ারকে আক্রমণের কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু সেটিই তো শুরু ছিল না। লং মার্চের সময় ১৯৩৭ সালে মার্কিন সাংবাদিক এডগার স্নোর সঙ্গে চিনে মাও জে দং-এর সাক্ষাৎ। পরে এই সাক্ষাৎ নিয়েই স্নো-র বিখ্যাত বই ‘রেড স্টার ওভার চায়না’। ১৯০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে লিওং কুইন ও গাঁধীর সমঝোতার কথা মাওকে বলতে গিয়েছিলেন এডগার স্নো, মাও প্রায় নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তাঁকে। ঘটনাচক্রে গাঁধীর মৃত্যুর ছয় সপ্তাহ পরেই কলকাতায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গোপন মিটিং, মাওকে আদর্শ করে সদ্যোজাত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সঙ্ঘর্ষের ডাক দিলেন কমিউনিস্ট নেতা বিটি রণদিভে। মাওবাদের সেই ট্রাডিশন আজও চলছে।
সোজা কথা একটাই। মহাত্মা গাঁধী শুধু ভারতের সীমায় আবদ্ধ নন। তিনি তামাম এশিয়ার। কিংবা আরও বেশি। গাঁধী-জীবনী লেখার কাজে দক্ষিণ আফ্রিকায় বেশ কয়েক মাস কাটাতে হয়েছে রামচন্দ্র গুহকে। আগামী বছরেই বেরোবে সেই বই। এই গবেষণার সময় দক্ষিণ আফ্রিকার এক ইতিহাসবিদ রামচন্দ্রকে মোক্ষম একটি কথা বলেছেন। শনিবার সন্ধ্যায় বক্তৃতায় সেই কথাটাও শুনিয়ে গেলেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার ভদ্রলোক বলেছিলেন, তোমরা আমাদের একজন আইনজীবী দিয়েছিলে। আমরা কিন্তু তার বদলে মহাত্মাকে পাঠিয়েছি।
ভারতাত্মা নন, মহাত্মা। ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে আজও এশীয়, আফ্রিকি সকলের প্রেরণা!













