বইপাড়া

খাদ

লেখক – জয় গোস্বামী, প্রকাশক – প্রতিভাস, দাম – ১০০ টাকা

আবীর মুখোপাধ্যায়
কলকাতা, ১৫ এপ্রিল ২০১২

khad

মানব-মানবীর সম্পর্কের গোপন ও তীব্র টানাপোড়েন। ছবি- গ্রাফিক্স।

 

মার্গ সঙ্গীতে পৃথক পৃথক স্বরের ক্রমিক ব্যবহারের এক প্রকার চলন রয়েছে, যা অলঙ্কার বা পাল্টা নামে পরিচিত। রাগ বিস্তারের সময় ওস্তাদরা রাগের বিশেষ কোনও স্বরকে কেন্দ্র করে অন্য স্বরগুলিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে এই চলনের মাধ্যমে রাগের অন্তরমহলের প্রকৃত রূপটি প্রকাশ করেন। এমন চলনের বিচিত্র লয়-কারিতেই তৈরি করেন তান-তোড়, আন্দোলন! সদ্য সদ্য, এক কবির উপন্যাস শেষ করে, কেবল এই কথাগুলোই মনে হচ্ছিল আমার। মনে হচ্ছিল, কেন না ছোট এই উপন্যাসিকার কাহিনি কথনে ‘মানব-মানবীর সম্পর্কের গোপন ও তীব্র টানাপোড়েন’-এ আশ্চর্য সাংগীতিক বিস্ময়! পরদায় পরদায় তার সপ্তকে উঠে আবার মন্দ্র ষড়জের সমে ফেরার রীতি রেওয়াজ যেন রাগ সংগীতের মতোই এর আরোহ - অবরোহণে। লেখক কাহিনির ধরতাই থেকেই পাল্টার চালে ওস্তাদি চলনে এগিয়েছেন! এই সাংগীতিক আলাপ বিস্তারে বোঝা যায়, এ উপন্যাস নিশ্চয় কোনও কবির। সে কবির নাম, জয় গোস্বামী। আর উপন্যাসের নাম ‘খাদ’। 
 
অসাড় দাম্পত্য নিয়ে জয়ের লেখা নতুন নয়। এর আগে অন্য উপন্যাসে নিরুপায় ও অনুচ্চারিত ভালবাসার কথা পাই জয়ের সেই সব দাম্পত্যসম্পর্ক বিশ্লেষণে! চোদ্দোটি অধ্যায়ে ভাঙা জয়ের এই সাম্প্রতিক উপন্যাসিকার কাহিনিও তেমনই নিরুপায় এক প্রেমিকের। সে প্রেমিক রুণুকাকা। জয়ের আগের কয়েকটি উপন্যাসের মতোই এই উপন্যাসিকার নায়ক রুণুকাকাও অক্ষম, যৌন শীতল এক পুরুষ। কিন্তু ‘কনফার্মড বাঁজা’ স্ত্রীর জন্য তার প্রেম দুর্জয় হয়ে দেখা দিয়েছে কাহিনির পরতে পরতে। কাঠ দুপুরে তাই ‘অক্ষম’ রুণুকাকা হন্যি হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায় তার ভালবাসার সঙ্গিনীর সুখ- সঙ্গের জন্য, একটি পুরুষের সন্ধানে। আর তারপর সেই পুরুষকে কাকুতি-মিনতি করে বাড়ি ডেকে নিয়ে এসে স্ত্রীর মশারির মধ্যে রেখে ‘একটু কাজ আছে’ বলে কার্যত পালিয়ে যায়! আর তখনই গ্রন্থের ব্লার্বের কথা মনে পড়ে। 
 
বিস্ময় জাগে, ‘সম্পর্ক যে কত বিচিত্রই হয় জীবনে’! ভালবাসার কতো রূপ! সুদীপ্ত দত্তের শোভন প্রচ্ছদ ও পাতা জোড়া অলঙ্কিত উপন্যাসিকার পঞ্চম অধ্যায়টির জন্য জয় একটি পাতায় মাত্র দশটি বাক্য খরচ করেছেন। রুণুকাকার ধরে আনা পুরুষ পরিতোষ এক অনিবার্য টানে ‘কাকিমা’-র মশারির ভিতর ঢুকে পড়ে। লেখক অনেক কথাই বলতে পারতেন, কিন্তু বললেন না। বললেন, একটি অধ্যায় পরে, ফ্লাশব্যাকে। পরিতোষের নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায়। যেখানে দুঃস্বপ্নের অতলান্ত খাদের ধারে দাঁড়িয়ে মিলনান্তিক ঘোরে পরিতোষ ভয়ানক সে অভিজ্ঞতার কথা ভাবে। ‘দিত্বীয়বার যখন হয়, পরিতোষকে খাটতে হয়ই না বলা যায়। পরিতোষের মাথা এসময় পুরোটাই বিকল হয়ে যায়। আজও গিয়েছিল। জেগে ওঠে, জেগে থাকে শুধু শরীর। একত্রিশ বছরের খেলোয়াড় শরীর। আগুন আগুন মাথাটা থেকে স্রোত নীচের দিকে বয়ে যায়। নাকি উলটোটা। নীচের আগুন মাথায় ওঠে কিনা পরিতোষ বুঝতে পারে না। দ্বিতীয়বার পরিতোষ যখন তার সর্বস্ব নিয়েই নিক্ষিপ্ত হল খাদের অতলে তখনও পরিতোষ হেরে যাওয়া কুস্তিগীরের মতো চিত’। 
 
নিঃসন্দেহে কাহিনির এই পর্ব পড়ে মনে হয়, যে আগুনে পরি একদিন স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিল, সে দাবানলে বুঝি পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে! এখানেই পরিতোষের জন্য পাঠকের মনে জায়গা তৈরি হয়। পড়তে পড়তে একরকম ভয় লাগে রুণুকাকা চরিত্রটিকে ঘিরেও। নিজের অজান্তে আতঙ্ক তৈরি হয়। দিন দিন পুনরাবৃত্তির ফলে, কাহিনির বাঁকে একসময় পরিতোষের যেমন ভয় লেগেছিল। ভয় নয়, বলা ভালো আতঙ্ক। আর তাই সে, যখন সব বুঝতে পারে, মুক্তির জন্য মায়ের পরামর্শে বেপরোয়া হয়ে রুণুকাকাকে খুনের ভয়ও দেখায়। উপন্যাসের এই পর্বেই ভালবাসায় ভাস্বর রুণুকাকাকে আমরা চিনে ফেলি। মায়া হয় লোকটার জন্য। নিরুপায় প্রেমিক রুণুকাকা বলে, ‘আমাকে মেরো না পরি। আমি ছাড়া ওকে দেখার কেউ নেই। তুমি বিশ্বাস করো আমি ওকে ভালবাসি পরি। ...কিন্তু সেই ভালবাসার কোনও প্রমাণ দিতে পারি না। আমি অক্ষম। তাই ওকে যে আমি ভালবাসি তার এটাই একমাত্র প্রমাণ, যা ও বিশ্বাস করবে। যা ওকে খুশি রাখবে’। 
 
কাহিনির শুরুতে যে পাল্টার চলন, গল্প যত ফুরিয়েছে মীড় নয়, সমে ফেরায় সেই পাল্টারই ব্যবহার। একটানা পড়লে, রুণুকাকার নতুন ‘শিকার’ আর পরিতোষের নব দাম্পত্যের সমান্তরাল কাহিনি বিন্যাসে গমক তানের ছন্দ পাই। কোথাও আবার ছুটতান, জমজমায় যুগলবন্দী। এখানেই গদ্য নয়, পদ্যকার জয়ের জিত! আসলে এ কাহিনি কোনও রুণুকাকা বা পরিতোষের একার নয়। জটিল এ সময়ে নিয়ত এমনতো কত খাদই তো আসে আমাদের জীবনে পথের বাঁকে। কিন্তু খাদের অতলে পা ফেলে যেমন গুটিয়ে নিতে জানি, খাড়া খাদের মধ্যে পড়তেও জানি আমরা। পরি যেমন। ‘খাদ এগিয়ে এল পরিতোষের সামনে। আর পা বাড়িয়ে দিল পরিতোষ। তারপর পড়তে শুরু করল। এখনও পড়ছে...পড়ছে...’। পরির সঙ্গে হয়ত এখনও পড়ছি আমরা!

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন