বইপাড়া

রবীন্দ্র-চিত্রাবলি

সম্পাদনা -আর শিবকুমার, প্রকাশক - ভারত সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রকের সহযোগিতায় প্রতিক্ষণ থেকে, দাম - ২০০০০.০০

আশিস পাঠক
কলকাতা, ৮ মে ২০১২

Rabindra chitravali

ছবি যখন এঁকেছেন তখন তা ভাষার অতীত। ছবি- গ্রাফিক্স।

কথা দিয়ে তিনি ছবি এঁকেছেন অনেক। কিন্তু ছবি যখন এঁকেছেন তখন তা ভাষার অতীত। অথচ সেই ছবি যে রীতিমতো চিত্রবিদ্যা শিক্ষার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয় সে কথা লিখেছেন নিজেই৷ ছিন্নপত্র থেকে, ১৭ জুলাই ১৮৯৩ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘ঐ-যে চিত্রবিদ্যা ব’লে একটা বিদ্যা আছে তার প্রতিও আমি সর্বদা হতাশ প্রণয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত করে থাকি কিন্তু আর পাবার আশা নেই, সাধনা করবার বয়স চলে গেছে।’ বয়স তখন ৩২। পুরোদস্তুর চিত্রচর্চা শুরু হল ৬৭তে। সেটা ১৯২৮৷ ১৯২৪-এ পূরবী-র পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি নকশাকে (ডুডলস) নিছক সলিতা পাকাইবার ইতিহাস হিসেবে ধরা যায় তবে এই বছরই প্রথম রবীন্দ্রনাথ পাণ্ডুলিপি-নির্ভর ডুডলস ছাড়িয়ে স্বাধীন পেন্টিংয়ে হাত দিয়েছেন।

কিন্তু সেই প্রথম যুগের রবিকেই পড়তে হয়েছিল তীব্র ব্যঙ্গমূলক সমালোচনার৷ ৪ ডিসেম্বর ১৯২৮ আনন্দবাজার পত্রিকার‘যত্‌কিঞ্চিত্‌’ সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘অগ্রহায়ণ সংখ্যার “বঙ্গলক্ষ্মী”তে আর্ট পেপারে ব্রোঞ্জ-ব্লু কালীতে ছাপা একটী ছবি দেখিয়া ভাবিতেছিলাম, সম্ভবতঃ এটী একটী সদ্য-উত্‌পাটিত পেঁয়াজ অথবা গোল মূলা; কিন্তু পরে নীচের লেখা দেখিয়া বুঝিলাম, এখানি কবি-সম্রাট রবীন্দ্রনাথ অঙ্কিত “গ্রামের মেয়ে!” “নাম পরতাপ” মাত্র আমাদের দিব্য দৃষ্টির উদয় হইল,আবিষ্কার করিলাম লীলায়িত হস্তযুগল, কুঞ্চিত লুলিত শাড়ী, ভঙ্গীভরে ধনু-বঙ্কিম দেহযষ্ঠি বুঝিলাম, গ্রামের মেয়ে বটে! কবির লেখনী যেমন জয়শ্রী বহন করিয়া আনিয়াছে, তুলিকাও তেমনি ভক্তজনকে রঙ্গের খেলা দেখাইয়া মুগ্ধ করুক।’

এই সমালোচনা রবীন্দ্রনাথের একটি ভয়কেই সপ্রমাণ করে৷ তাঁর ভয় ছিল, তাঁর সাহিত্য এবং গান দেশে যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, ছবি তেমন পাবে না। নির্মলকুমারী মহলানবিশকে ১৯৩০-এর ২৪ জুন লিখেছেন, ‘আমার চিত্রলীলার দিগন্ত এই পশ্চিম উপকূলেই অস্তগমনকালের শেষ বর্ণবিন্যাস। স্বদেশে একটু তার আভাসমাত্রেই যে রকম শব্দভেদী বাণের টঙ্কার শোনা গেল তাতে বুঝলুম এই চিত্রগুলির উপলক্ষ্যে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রূপের বৈচিত্র্য ঘটবে মাত্র।... আমি তাই মনে মনে সঙ্কল্প করে এসেচি আমার এই ছবিগুলির একটিও দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাব না সমুদ্রের এই ঘাটেই বোঝাই খালি করে দিয়ে চলে যাব।’

কিন্তু না, সে অভিমান পরে রাখেননি তিনি৷ তারই ফলে আজ সম্ভব হয়ে উঠেছে রবীন্দ্র-চিত্রাবলী-র মতো বই৷মুষ্টিমেয় শিল্প-সমালোচক ছাড়া সাধারণ শিক্ষিত মহলে রবীন্দ্রনাথের চিত্রদর্শন বলতে সাকুল্যে তিনশোটির মতো ছবি।চিত্রলিপি-র দু’টি খণ্ড, ললিত কলা অ্যাকাডেমির অ্যালবাম এবং অ্যান্ড্রু রবিনসনের বই দি আর্ট অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর এই মাত্র। আর রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির মোট সংখ্যা? হলফ করে কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাবে না, তবে মোটের উপর সংখ্যাটা দু’হাজার ছাড়াবে।

মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহ থেকে (রবীন্দ্রভবন, কলাভবন, ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট, ভারতীয় সংগ্রহালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস সংগ্রহ) রবীন্দ্রনাথের প্রায় দু’হাজার ডুডল, ড্রয়িং এবং পেন্টিং নিয়ে তৈরি হয়েছে পাঁচ খণ্ডের এই সংকলন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহই, প্রামাণ্যতা রক্ষার স্বার্থে।

এখনও পর্যন্ত নিঃসংশয়ে জানা রবীন্দ্র চিত্রাবলি-র দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ধরা থাকছে এই গ্রন্থের চারটি খণ্ডে। এ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে‘কম্প্যানিয়ন’ বা ‘সাপ্লিমেন্টারি’ খণ্ড, যেখানে থাকবে আনুষঙ্গিক তথ্য, নথি, টীকা-ভাষ্য। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বহু। সেই ধারারই আর একটি নয়, এ বই হয়ে থাকল রবীন্দ্র-চিত্রের এক আশ্চর্য সংকলন৷

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়