বইপাড়া

স্মৃতি

অনুলিখন ও সম্পাদনা- শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, প্রকাশক-প্রতিভাস, দাম- ১০০ টাকা

আশিস পাঠক
কলকাতা,১৭ ডিসেম্বর ২০১২

smriti

ঢাকতে চেয়েও ঢাকতে পারলেন না সর্বজয়া। ছবি- প্রতিভাস।

পথের পাঁচালী-র সেই দৃশ্যটা মনে আছে?

সেই যে, হরিহর প্রবাসে। সর্বজয়ার সংসারে হাঁড়ি চড়ে না। অগত্যা ঘটি-বাটি বন্ধক দিতে চললেন তিনি। অভাবের সংসারের ভাঙা দরজাটা ঠেলে ঘটি-বাটি শাড়ির আঁচলে কোনওক্রমে ঢেকে দরজাটা ভেজিয়ে সর্বজয়া যেই বেরোলেন পথে, দরজাটা খুলে গেল। ক্যামেরা ঘরের ভেতর, যেন ঢাকতে চেয়েও ঢাকতে পারলেন না সর্বজয়া।

মনে পড়ে গেল দৃশ্যটা। মনে পড়ল, নতুন রূপে প্রকাশিতব্য রবিশঙ্করের অনুলিখিত আত্মকথা 'স্মৃতি' পড়তে পড়তে। রবিশঙ্কর বলছেন, 'দুটো ট্রাংক ছিল মায়ের। আগেকার দিনের সেই বিরাট তোরঙ্গ না কী বলে যেন, সে দুটো একেবারে ভরতি। কতরকম জিনিস কী বলব! কাজ করা মোমবাতিদান, ব্রোঞ্জের জিনিস সব দামি দামি। যখন টাকার ঘাটতি পড়ত জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই আমি দেখেছি মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে মাথায় সিল্কের চাদর-টাদর ঢেকে ওই দুঃখী তেলির কাছে যেতেন। দুঃখী তেলি খুব বয়স্ক ছিলেন এবং আমার মাকে মা বলতেন। ...তা যা বলছিলাম, মা প্রত্যেকবার হয় একটা শাড়ি, নয় নাকের ফুল এইসব দুঃখী তেলির কাছে বাঁধা দিয়ে টাকা নিয়ে আসতেন। এই করে উনি আমাদের মানুষ করেছেন, কাউকে জানতে দেননি।' রবিশঙ্করের বাবা শ্যামশঙ্কর তখন বিদেশে। কাশীতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকেন মা। ওই কাশীতেই রবিশঙ্কর থাকতেন, জ্ঞান হওয়া থেকে প্যারিস যাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু ওই যে অভিজ্ঞতাটা, তার সঙ্গে অপুর অভিজ্ঞতার খুব বেশি ফারাক আছে কি? কে জানে, হয়তো প্রবাসী পিতা, কাশী, মায়ের কষ্ট সব মিলে রবিশঙ্করের ছোটবেলার সঙ্গে অপুর ছোটবেলার এত মিল বলেই অপু-ট্রিলজির সঙ্গীত এমন আশ্চর্য রকম হতে পেরেছিল।

'বেণীমাধবের ধ্বজা থেকে আইফেল টাওয়ার' এ বইয়ের কাশীপর্বের লেখাটির নাম। তার পরে বাবা আলাউদ্দিন, উদয়শঙ্করকে নিয়ে স্মৃতিচারণ যেমন আছে, তেমনই আছে তাঁর দেখা নানা ছবির কথা। আর আছে কলকাতা। আট দশক আগে এই শহরের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, যেন অনেক ঘুইরা শেষে... রবিশঙ্কর বলছেন, '১৯৩২-৩৩-এ প্রথম কলকাতায় এলাম। প্রথমে কলকাতায়! চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে কী একটা হোটেল ছিল, তাতে আমরা ছিলাম মনে আছে। ...সে একটা টিপিক্যাল বাংলা খাবার, থালায় করে ভাত আসছে মাছ, মাছের ঝোল। পাগলের মতো খেতাম। কী যে ভালো লাগত। ...এই সময়ে আলাপ হল হরেনদার সঙ্গে। হরেন ঘোষ। হরেনদার অফিস ছিল Tiger সিনেমার সামনে। Corporation Street-এ। চায়ের দোকানের পাশে একটা ছোট্ট অফিস তখন, ভাবতেও অবাক লাগে যে ওই ছোট্ট অফিসেই কলকাতার সেরা লোকদের আড্ডা ছিল। ওখানেই আমি বিখ্যাত সব লেখকদের দেখি।' আবার, 'একটা কথা ঠিক, এলগিন রোডে এসেই আমার অনেক কিছু চেঞ্জ হয়ে গেল। সেনেট হাউসে প্রথম বাবাকে দেখলাম মানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে, আলি আকবরের তখন বারো বছর বয়স। বেড়ালের মতো পাশে বসে ছোট্ট সরোদ বাজাল, ওদিকে দেখছি তক্মা পরে মেডেল পরে ফৈয়াজ খাঁ সাহেব, বিরাট বিরাট সব পাগড়িটাগড়ি পরে একেবারে যেন রাজা-রাজড়ার ব্যাপার। এ সময়টা হল, end of December of 1934. এটাই প্রথম All Bengal Music Conference ভূপেনবাবু করেছিলেন।'

এ বইয়ের অনুলেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য। রবিশঙ্কর তাঁর অনেক দিনের চর্চার মানুষ, ঘনিষ্ঠ মানুষ। সেই কাছে থেকে দেখা আর তাঁর সুখপাঠ্য গদ্য আর অনেক দারুণ ছবি- এ বই সবে মিলে যেন রাগ বসন্ত, সেই তার-শূন্য আমাদের এই প্রাণের পরে।

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন