বইপাড়া
মায়ের সামনে স্নান করতে লজ্জা নেই
লেখক – জয় গোস্বামী, প্রকাশক – সিগনেট প্রেস (একটি আনন্দ প্রকাশনা), দাম –১৫০.০০ টাকা
আশিস পাঠক
কলকাতা, ২৯ এপ্রিল ২০১২
প্রিভিউ
কবিতা কী?
জীবনানন্দ এ প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, কবিতা অনেক রকম। ঠিক টু দ্য পয়েন্ট উত্তর হল না অবিশ্যি। হওয়ার দায়ও বা কী? জীবনানন্দকে তো আর বাংলা অনার্সের উত্তর লেখার দায় ছিল না।
সেই অনেক রকম কবিতারই এক রকম, বহু দিন পরে জ্বলে উঠল জয় গোস্বামীর কলমে। এ আগুন পত্রিকার পাতায় ধূসর হয়নি, সরাসরি পাণ্ডুলিপি-র আয়োজন থেকেই পেয়েছে গ্রন্থের শরীর। আর সেই শরীর, অনেক দিন পরে, তীব্র এক সংরাগে মাখানো। কয়েকটি পংক্তি, কয়েকটি বিদ্যুত্চমকের মতো সরলরেখায় গড়িয়ে চলা লাইন কী ভাবে তৈরি করে দেয় মনে রাখার মতো কবিতার এক আশ্চর্য জগত্, ছুঁয়ে দেখি:
‘মাঠে নেমেছে একটা মেঘস্তূপ। ঢুকলাম। একটা থিয়েটার হল। টর্চ দেখাচ্ছে না কেউ। অন্ধকার। বসতে যেতেই ঝটপট করে সব সিট থেকে পায়রা উড়ল। স্টেজের জায়গায় চাঁদ। চাঁদের ওপর দিয়ে পায়রার পর পায়রা। একটা পায়রা নখে ঝুলিয়ে নিয়েছে আমায়। চাঁদ পার হয়ে যাচ্ছি। দুলছি, দুলছি। হে ভগবান, পাখিটা আমায় নখ থেকে ফেলে দেবে না তো?’
স্মরণীয়তাই কবিতা, এ রকম একটা কথা বলেছিলেন কবি অরুণকুমার সরকার। আর, বাংলা কবিতায় অনেক কাল পর্যন্ত এই স্মরণীয়তা তৈরির অন্যতম হাতিয়ার ছিল অন্ত্যমিল। সেই অনুপ্রাসশ্বসিত কবিতার কাল পেরিয়ে গিয়েছে অনেক কাল। ছন্দেরও তেমন বালাই ছিল না, বাংলা কবিতার এক মরা সময়ে। আর তখনই সম্ভবত, চালু হয়েছিল খবরের কাগজের পাতা কেটে কেটে কলে তৈরি কবিতার রসিকতাটা।
রসিকতাটা রসিকতাই, কিন্তু তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল বাংলা কবিতার এক অশনি সংকেতও৷ বিষয় আর ভাবনা যখন অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে তখন ফর্ম যে প্রকট এক অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায় সেই কথাটা বার বার প্রমাণিত করছিল বাংলা কবিতার সেই শূন্যগর্ভ কাল৷ ছন্দ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা বাংলা কবিতার ইতিহাসে বহু বার হয়েছে, কিন্তু এই শূন্যগর্ভ কালে সেই নিরীক্ষারও বালাই ছিল না, এ ছিল কেবল যেমন খুশি লেখার কাল৷
কিন্তু টানা গদ্যে, অনেকটা কাটা কাটা বাক্যে, কখনও ইংরেজি শব্দ রোমানে লিখেও যে কী আশ্চর্য মেঘস্তূপের মতো কবিতা লেখা যায় তারই কিছু রং হয়ে থাকল জয় গোস্বামীর সাম্প্রতিকতম এই কাব্যগ্রন্থটি। মোট ১১২টি কবিতা এখানে, আর একটি উপসংহার। পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় তরুণ জয়কে, যখন তিনি হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষে, উন্মাদের পাঠক্রম, বিষাদ, সূর্য পোড়া ছাই বা মৌতাত মহেশ্বর যে জয় বেঁচে থাকবেন তরুণ কবির বুকের বোতাম খোলা শার্টের পকেটে তাঁকেই যেন ফিরে পেলাম আবার। ভূমিকাপ্রতিম একটি লেখায় এ বইয়ে জয় লিখছেন, ‘একসময় আমার শরীরে যখন যৌবন আসতে শুরু করেছিল তখনই শুরু হয়েছিল কবিতা লেখা। আজ জরা যখন অভ্রান্তভাবেই উপস্থিত তখন তাকে নিয়েও একটা কবিতার বই থাকুক। কারণ, ‘কবিরা চিরতরুণ’ এই ধারণাটি অন্তত আমার জীবনে এসে ভেঙে পড়ল।’
সেই ভাঙা থেকেই কবিতার পুনর্গঠন নিশ্চয় করে নেবেন কবিতার সহৃদয় পাঠক, কারণ কবিরা না হলেও, কবিতা চিরতরুণ, চিরতরুণ-ই।
















