বাংলা ব্লগ

বড়দিন কবে আসবে?

রংগন চক্রবর্তী

এবারে শীতে দেশটার মন ভাল নেই। বছর শেষের সকালে বসে যখন লিখছি, তখন কাগজে পড়লাম দিল্লির ছাত্রীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কোনও কঠিন অস্ত্রোপচারের জন্য। তার ধর্ষণ নিয়ে দেশ তোলপাড় হলেও, তার পরেও এদিক ওদিক অনেক ধর্ষণেরই খবর আসছে। আমাদের কলকাতার নানান দিকেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। তারপর আমাদের রাজ্য সরকারের সমর্থক এক নাট্যকর্মী দিল্লির এই ঘটনা আর পার্ক স্ট্রিটের সেই ঘটনার মধ্যে তুলনা করে, দুটি ঘটনাকে আলাদা বলে বিতর্কের সূচনা করেছেন। বড়দিন আর একটা নতুন বছরের শুরুর দিনগুলোতে যদি এই রকম একটা কুৎসিত ছায়া মাথার ওপর ঝুলতে থাকে, উৎসবের মন একটু মার খায় বইকি।

গত পনেরো বছর আমি বড়দিন বা নতুন বছরে পার্ক স্ট্রিটে যাই না। তার একটা ছোট কারণ আছে। ১৯৮০ সালের ১৬ই অগস্ট ফুটবল মাঠ নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ছবি করতে দিয়ে সেই বীভৎস মারামারি আর মৃত্যু দেখার পর থেকে আমি কোনও দিন আর ফুটবল মাঠে যাইনি। যদিও ছোটবেলায় ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থক হিসেবে স্কুল পালিয়ে বহু ম্যাচ দেখতাম। বড়দিনে পার্ক স্ট্রিট না যাওয়ার পেছনেও একটা অভিজ্ঞতার গল্প আছে। বড়দিনের আশেপাশের দিনগুলোতে পার্ক স্ট্রিট এলাকায় বহু মানুষ যান। অনেক পরিবার তাঁদের বাচ্চাদের আলো দেখাতে বা সান্তাকে দেখাতে নিয়ে যান। অনেক বড়রাও হয়তো আগে থেকে টেবিল বুক করে বা হঠাৎই নানান রেস্তোরাঁতে খেতে যান। অনেক তরুণ-তরুণী হয়তো যান ওই আলোয় রঙ মেশাতে, নাচতে গাইতে। কিন্তু এর বাইরেও একটা বিশাল সংখ্যক লোক যান, যাঁদের অধিকাংশই অল্পবয়সি পুরুষ; তাঁরা যান 'মজা দেখতে' (পড়ুন মেয়ে দেখতে)। আমি জানি না, সমাজ অনেক 'মুক্ত' হওয়ায় গত পনেরো বছরে এঁদের সংখ্যা কমেছে কিনা।  তবে চার দিকের হাল হকিকৎ দেখে মনে হয় না খুব কমার কথা। এঁরা যে মজাটা নিজেরা করেন, সেটা ঋত্বিকের ভাষায় বলতে গেলে একটা বীভৎস মজা।

পনেরো বছর আগে আমার বিদেশের সহপাঠিনী দুই ইংরেজ মেয়ে আমাদের সঙ্গে বড়দিন আর নতুন বছর কাটাতে এসেছিলেন। আমরা তাঁদের নিয়ে একটা ঢাকা জিপসি গাড়ি করে বেরিয়েছিলাম। পার্ক স্ট্রিট আর রাসেল স্ট্রিটের কাছাকাছি কোথায় একটা জনসমুদ্র ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আমরা আটকে গেলাম। ঢেউয়ের মতো একটা ভিড় আমাদের চার পাশে ভেঙে পড়ল, তাদের বক্তব্য বড়দিনে মেম সাহেবদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে দিতে হবে। সে যে কী আত্মমর্যাদাহীন ব্যবহার তাদের, কী রকম একটা লোলুপপনা, সে আমি আজও ভাবলে দুঃখ পাই। যাই হোক, গাড়িটা চালাচ্ছিলাম আমি। পাশে ছিলেন এক সহপাঠিনী। ব্যাপারটা বুঝে তিনি কাচ নামিয়ে হাত বাড়ালেন। হাতটা প্রায় ভেঙে যাচ্ছিল। নেহাৎ আমরা কলকাতার ভিড়ে চালানো লোক, কোনও মতে গাড়িটা বের করে আনলাম। এরপর অনেক ক্ষণ গাড়ির মধ্যে নীরবতা বিরাজ করেছিল। শেষে ওই সহপাঠিনীই আবহাওয়াটাকে সহজ করতে বললেন, ওয়েল দে জাস্ট ওয়ান্টেড টু হ্যাভ সাম ফান। সে দিন আমরা বাড়ি ফিরে এসেই বড়দিন পালন করেছিলাম।

আমাদের দেশে বাড়ির বাইরে বেরুলেই যে ভাষাটা আমরা শুনি সেটা ধর্ষণের ভাষা, পুং আস্ফালনের ভাষা। নইলে বাড়ির বাইরে বেরুলেই, নানান অল্পবয়সি ছেলেদের জটলায় সব সময় পুংলিঙ্গবোধক শব্দের এত রমরমা কেন? কেন মেয়েদের সম্পর্কে কথা মানেই কেবল তাদের রমণ করার ভাষা? কেন ছেলেদের গাল বা শাস্তি দেওয়ার কথা মানেই তাদের মা-বোনদের যৌন ভোগ করার কথা? কেন? কেন? কেন?

দিল্লির ঘটনা আটকানোর জন্যে নানান কথা শুনছি। চটপট বিচার, বিশেষ আদালত ইত্যাদি। প্রত্যেকটাই জরুরি। কারণ সত্যিই ধর্ষণ আটকানো দরকার। কিন্তু ওপর থেকে বিচার চাপিয়ে, ভেতরের এই বিষ বের করা যাবে কি? সত্যিই আগামী কোনও এক বড়দিন সত্যিই বড়দিন হয়ে উঠবে? বদলের দিন হবে? জানি না।