বাংলা ব্লগ

মধ্যবিত্তের বিক্ষোভ

অমিতাভ গুপ্ত

দিল্লির ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে আলোচনা আপাতত থিতিয়ে এসেছে। বিক্ষোভের ঋতুও অতিক্রান্ত। এখন আর সেই বিক্ষোভ নিয়ে কথা বলে লাভ কী, প্রশ্নটা এড়ানো কঠিন। সেই প্রশ্ন মেনে নিয়েই দু’চারটে কথা বলতে চাই। বিক্ষোভের চরিত্র নিয়ে, বিক্ষোভকারীদের শ্রেণিচরিত্র নিয়ে।
 
এই দুটি বিষয় নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। যে কথাগুলো স্পষ্ট তা হল, এই বিক্ষোভ মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির। সেই শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রীরা আছেন, চাকরিজীবীরা আছেন, শহুরে ব্যবসায়ীরাও খানিকটা আছেন। মেয়েরা আছেন বেশি সংখ্যায়। ঘোলা জলে মাছ ধরতে ঢুকে পড়া কিছু রাজনৈতিক লুম্পেনকে বাদ রাখলে বিক্ষোভকারীদের আরও তিনটে চরিত্রলক্ষণ- তাঁরা ভারতের গড় শিক্ষার মানের তুলনায় বেশি শিক্ষিত, গড় আর্থিক অবস্থার তুলনায় অবস্থাপন্ন এবং তাঁরা মূলত অরাজনৈতিক।
 
আরও যে কথাটি বারে বারে আলোচনায় আসছে, তা হল এই বিক্ষোভের চরিত্র। যে ঘটনা থেকে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত, তার চরিত্র। দিল্লির বাসে যে মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছিলেন, তাঁর ওপর হওয়া অত্যাচার অতি মারাত্মক। কিন্তু এই কথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে দেশের নানান প্রান্তে প্রতি দিন যতগুলি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তার কোনওটি বীভৎসতায় দিল্লির ধর্ষণের সঙ্গে তুলনীয় নয়। বস্তুত, অনেক ঘটনাই দিল্লির ধর্ষণকাণ্ডের চেয়েও মারাত্মক, ভয়াবহ। কেন উত্তরপ্রদেশের কোনও গ্রামে তিন বছর বয়সী কোনও শিশুকে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মেরে ফেলার পর, অথবা কর্নাটকে কোনও মুসলমান রমণীর প্রাত্যহিক ধর্ষণের পর এমন দেশজোড়া প্রতিবাদ আরম্ভ হল না? নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট হয়তো বলত, কোথায় কখন বিস্ফোরণ হবে, তা বুঝতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও বাকি আছে! কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর অন্য ভাবে খোঁজার চেষ্টা করে।
 
ব্যবহারিক অর্থনীতির একটা অতি পরিচিত পরীক্ষা রয়েছে। তাতে দেখা হয়, কোনও এক জন মানুষ অপরের বিপদে সাহায্য করার সময় যাঁকে সাহায্য করছেন, তাঁর পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামান কি না! দুনিয়ার সর্বত্র এই প্রশ্নের একেবারে এক উত্তর পাওয়া গিয়েছে। হ্যাঁ, মাথা ঘামান। সাহায্যপ্রার্থীর সঙ্গে সাহায্যকারী যত বেশি নিজের মিল খুঁজে পান, সাহায্যের পরিমাণও ততই বাড়ে। ভেবে দেখলে, অতি স্বাভাবিক। যে আমার মতো, তার বিপদ এক দিন আমারও হতে পারে। কারণ আমিও তার পরিবেশেই থাকি, তার ঝুঁকিগুলোই প্রতি দিন নিই, বা নিতে বাধ্য হই। কাজেই, নিজের মতো কাউকে সাহায্য করা, এক দিক থেকে, নিজেকেই সাহায্য করা। আর একটু অর্থনীতির ভাষা ব্যবহার করলে, নিজের হলেও-হতে-পারে-বিপদের জন্য এক ধরনের ইনশিয়োরেন্স কেনা।
 
দিল্লির ধর্ষণকাণ্ডে সাহায্য করার উপায় ছিল না। কিন্তু যাঁরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁরা সকলেই, অথবা তাঁদের বোন, স্ত্রী, মা, বান্ধবী ওই ধর্ষিত মেয়েটির মতোই প্রতি সন্ধেয় দিল্লি, বা অন্য কোনও শহরের, রাস্তায় বাস ধরতে বাধ্য হন। কাজেই, নিজেকে বা নিজের প্রিয়জনকে ওই মেয়েটির সঙ্গে এক করে ফেলা অতি স্বাভাবিক। সেই কারণেই উত্তরপ্রদেশের গ্রামের ধর্ষণ নয়, রাজধানীর রাস্তার ধর্ষণেই প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটে। মধ্যবিত্তরা বিস্ফোরণ ঘটান। মধ্যবিত্তরাই, কারণ যাঁরা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপর তলার মানুষ, এই জাতীয় বিপদ তাঁদের ছুঁতে পারে না। আর যাঁরা নিম্নবর্গের বাসিন্দা, তাঁরা সম্ভবত এখনও এই জাতীয় অত্যাচারকে স্বাভাবিক জ্ঞান করেন।
 
প্রশ্ন হল, যাঁরা প্রতিবাদে পথে নেমেছেন, তাঁরা কি ধর্ষণের প্রতিবাদই করছিলেন, নাকি এই ধর্ষণপর্ব একটি উপলক্ষ্যমাত্র, মধ্যবিত্তশ্রেণির ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের? এই প্রশ্নটাকে এক কথায় এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। কারণ ডিসেম্বরের শীতে যাঁরা রাজপথ থেকে যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ করছিলেন, তাঁদের অনেকেই গত বছর হাজির ছিলেন অণ্ণা হাজারের বিক্ষোভে। তারও আগে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের সংরক্ষণের বিরুদ্ধে, ইউথ ফর ইকোয়ালিটির মিছিলে। হয়তো, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের ঢেউ যখন ভারতে এসেছিল, সেই মিছিলেও। এই আন্দোলনগুলোর মধ্যে বিবিধ যোগসূত্র চাইলে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মূল মিল একটাই। প্রতিটিতেই মূল চরিত্র মধ্যবিত্ত শহুরে তরুণ প্রজন্ম। অর্থাৎ, ভাবলে অন্যায় হবে না যে শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের রাস্তা খুঁজছে। যেখানেই পথ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই পথে নামা।
 
কেন এই বিশেষ শ্রেণির ভারতীয়দের মধ্যে এত ক্ষোভ জমেছে? এই প্রশ্নটা আজ যতখানি প্রাসঙ্গিক, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এর আগে কখনও এতখানি প্রাসঙ্গিক ছিল না। চারিদিকে তো শুধু শোনা যায়, মধ্যবিত্ত নাকি খুব ভাল আছে এখন। দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান মিডল ক্লাস, যাদের ক্রয়ক্ষমতা ভারতের গর্ব, পড়শির ঈর্ষা। তারা নাকি এখন বিশ্বনাগরিক। সর্বার্থেই। তা হলে এত ক্ষোভ জন্মায় কোথায়?
 
অপ্রাপ্তির ক্ষোভ জন্মায় ওই প্রাপ্তির ঘরেই। ভারতীয় মধ্যবিত্ত এই প্রথম পেতে শিখেছে। তার সামনে বাজার খুলে গিয়েছে। বিশ্বায়ন তাকে বুঝিয়েছে, নিউ ইয়র্কের এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর যা পাওয়ার অধিকার আছে, কোরামঙ্গলার বাসিন্দারও সেই একই অধিকার আছে. মধ্যবিত্ত নিজের অধিকার বুঝে নিতে চায়।
 
মুশকিল হল, মধ্যবিত্ত বলতে তো আর কোনও নির্দির্ষ্ট মাপ হয় না। মোটামুটি ভাবে একটা আর্থিক অবস্থায় পৌঁছানোর পর নিজেকে মধ্যবিত্ত ভাবলেই মধ্যবিত্ত। ভারতে যত মানুষ নিজেকে মধ্যবিত্ত মনে করেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তবানের সঙ্গে সবচেয়ে গরিবের আর্থিক ফারাক কত, জানতে ইচ্ছে করে। অনুমান করছি, বিপুল। এখানেই সমস্যা. “মধ্যবিত্ত শ্রেণি”-র ওপরমহল যেটা অনায়াসেই পায়, নিচের দিকে থাকা মানুষগুলোর কাছে তা রীতিমতো কষ্টসাধ্য। এই নিচের শ্রেণিটির রোজগার গত কুড়ি বছরে অনেক বেড়েছে, নিঃসন্দেহে, কিন্তু চাহিদা বেড়েছে তার চেয়েও বেশি। ফলে, সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ফারাক, সাধ্য অনেকখানি বাড়ার পরেও, আগের চেয়ে এখন সম্ভবত বেশি। যাঁরা উঁচু তলার মধ্যবিত্ত, তাঁদের মনেও সম্ভবত ক্ষোভ অনেক। তাঁদের সাধ্য আরও বেশি, কিন্তু সাধ তার তুলনাতেও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বিশ্ব বাজার সবারই সাধ বাড়িয়ে দিয়েছে।
 
ফলে, অপ্রাপ্তির বোধও আগের চেয়ে তীব্র। মধ্যবিত্তের প্রধান চালিকাশক্তিই এখন এই ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ বাইরে বেরোনোর অবকাশ খোঁজে, রাস্তা খোঁজে। অণ্ণা হাজারে এক রকম রাস্তা তৈরি করে দেন। দিল্লির ধর্ষণে আরও এক রকম রাস্তা তৈরি হয়। অবশ্যই, প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই মধ্যবিত্ত নিজেকে ক্ষোভের প্রত্যক্ষ কারণটার সঙ্গে আইডেন্টিফাই করতে পারে। দুর্নীতি তার অপছন্দ, ধর্ষণ তো বটেই। কিন্তু সেই বিক্ষোভের তলায় তলায় কাজ করে যায় অন্য রাগ।
 
অনুমান করছি, আগামী কয়েক বছরে আরও অনেক বিক্ষোভের সাক্ষী থাকবে ভারত।
 

আরও ব্লগ