রবিবাসরীয়

একাত্তরের শিশু

শহরের নাম করিমগঞ্জ। যেখানে সে সময় বাচ্চারাও জানে, সাইরেনের ভোঁ শুনলেই দৌড়ে লুকিয়ে পড়তে হয় ট্রেঞ্চে, সঙ্গে তুলোর প্যাকেট।

সৌগত পুরকায়স্থ
কলকাতা,২৩ ডিসেম্বর ২০১২

painting

মেজর বলতে শুধু মেজর চমনলাল। ছবি- সুমন চৌধুরী।

ক-এ কথক

গ্র্যাজুয়েশনে ইংলিশ মেজর। এ ছাড়া আমার জীবনে মেজর বলতে শুধু মেজর চমনলাল। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কখনও। উনি মেজর, আর আমি তিন ভাইয়ের মেজো, তখন সবে শিশু নিকেতন মাইনর বললেও বুঝি বাড়াবাড়ি ঠ্যাকে! ছুটির দুপুরে টিনের পিস্তল হাতে মেজর চমনলাল সাজি, সরকারি কোয়ার্টারের সীমানা পাহারা দিই, আর ছাগল তাড়াই। অমিতাভ, মিঠুন, ব্রুস লি-র আগে, এমনকী সম্পূর্ণ রামায়ণের দারা সিংহেরও আগে, মেজর যেন ছোট্ট মনে মস্ত হিরো। সীমান্ত শহরে ‘আনন্দবাজার’ তখন রোজ পৌঁছয় না, গুয়াহাটি থেকে ‘অসম ট্রিবিউন’ পৌঁছতেও পর দিন সকাল। এ রকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে, অচেনা-অদেখা কোনও এক নাকি মূল ভূখণ্ড থেকে, সাঁজোয়া গাড়ি চেপে এক দিন এসে হাজির হয়েছিলেন মেজর চমনলাল। তাঁর কথা জেনেছি বড়দের আলোচনায় কান পেতে। কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরে, ওই শহরেও তখন একাত্তর ঘনিয়েছে, তবে এক অন্য চেহারায়। এর বেশ কিছু কাল পর কালীবাড়ি ঘাটের ডাকবাংলো চত্বরে তৈরি হয়েছে ত্রিকোণ স্মৃতিস্তম্ভটি। স্কুল-ফেরত দেখতে গেলাম এক বন্ধুর সঙ্গে ছাপার হরফে মেজর চমনলালের নাম, স্তম্ভের গায়ে।

এই লেখার উদ্দেশ্য, বিধেয় কোনওটাই অবশ্য মেজর চমনলাল নন। তিনি নিতান্তই উপলক্ষ, তাঁর লেফ্ট-রাইট-লেফ্টে পা মিলিয়ে আসলে এমন এক অখ্যাত শহরের গল্প ফেঁদে বসেছি, যেখানে লিও টয়েজ চেনার আগেই ছোটরা চিনে নিয়েছিল সত্যিকারের ট্যাঙ্ক, মর্টার, যুদ্ধবিমান, সাইরেন সংকেত। সে এক অদ্ভুত সময়! সেই ছোটদের সবাই এখন পঞ্চাশের এ-দিক ও-দিক। স্মৃতিপথে হাঁটারই বয়েস। সে স্মৃতির কোনটা প্রাইমারি আর কোনটা সেকেন্ডারি মানে কোনটা অর্জিত আর কোনটা আরোপিত, সে নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে! আপাতত শুধু এইটুকু জেনে রাখাই যথেষ্ট যে, আমাদের সেই শহরের নামটি করিমগঞ্জ, আর আমাদের নদীর নামটি কুশিয়ারা। কুশিয়ারার মাঝ-বরাবর অদৃশ্য সীমানা, দু’পারে বন্দুক হাতে সীমানাদারি চলে রাতদিন! এক বান্ডিল বিড়ি বাজি রেখে এ-পারে ডুব দিয়ে ও-পারে মাথা তুলবে, এমন ভাবনা মাথায় এনেছ কী, গেছ। প্রথমে খবরদার, তার পর গুড়ুম! সেই কবে এক মধ্যরাতে কী রফা হয়েছিল, তার পর থেকেই হুকুম জারি হয়েছে। না কি, ঠিক এক রাত্তির নয়? ও হরি, সে তো আবার অন্য গল্প! সে অবশ্য আমার জন্মের বিস্তর আগেকার কথা। তা বাপ-মামাদের মুখে শোনা গল্পই যদি বলি, মহাভারত কিছুমাত্র অশুদ্ধ হবে? সেই কোন আদ্যিকাল থেকে স্মৃতিবিস্মৃতির চেয়ে কিছু বেশিই ধরা আছে শ্রুতির সংসারে। সৌতি মুনি, সঞ্জয় থেকে শুরু করে সন্তোষ রেডিয়ো অবধি তার সাক্ষী!

খ-এ খবর

তখনও রেডি-স্টেডি-গো ট্রানজিস্টরের জমানা শুরু হতে অনেক বাকি! শিব্রাম চক্কোত্তি বলেছেন বটে রেডিয়ো সর্বদাই রেডি, তবু কত কাণ্ড করে তবে যে চালু হত পাখি মাস্টারের রেডিয়ো, শহরের সবেধন নীলমণি! খোলা মাঠে উঁচু বাঁশের মাথায় তার খাটাও রে, টেবিল পাতো রে, চেয়ার পাতো রে, তার পর চার হাতে ধরাধরি করে এনে রেডিয়ো-স্থাপন। এর চেয়ে ঢের সহজে শালগ্রাম শিলা স্থাপিত হয়ে যায় ছাগলে মুড়োনো তুলসী গাছের থেকে দু’খানা পাতা আর দু’ছত্র অং-বং, ব্যস সব প্রকরণ শুদ্ধ, এ বার শুধু দৈববাণীসিদ্ধ ইচ্ছেপূরণের অপেক্ষা। না মেনে উপায় নেই যে পাখি মাস্টারের ওই রেডিয়ো-স্থাপন পদ্ধতি ম্যানুয়ালহীনতা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ, তবে কিঞ্চিৎ জটিল, এই যা। সন্ধের আবছা আঁধারে রেডিয়োর সামনে তখন ধুতি-চাদর আর পাজামা-পাঞ্জাবিতে শোভিত জনাকয়েক মুরুব্বি, যথারীতি হাতলওয়ালা চেয়ারে। বাকিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, দাঁড়িয়ে, কিংবা মাটিতে গুটিসুটি বসে। সবার মনেই চাপা উত্তেজনা, আকাশবাণীর খবর শুরু হল বলে। অবশেষে আকাশপথেই সে দিন উড়ে এল সীমানা ভাগের খবর আর নতুন দেশের জন্মবার্তা। এই ছোট্ট গঞ্জশহর সহ গোটা জেলাই নাকি পড়েছে পাকিস্তানের ভাগে। মনের মধ্যে আশঙ্কার যাবতীয় উসখুসানি চেপে রেখে মুরুব্বিদের এক দল গলা জড়ালেন অন্যদের। যেন এমনটিই চেয়েছিলেন সবাই, শুধু ইচ্ছেপূরণটাই বাকি ছিল! যেন লুকোনো দীর্ঘশ্বাসগুলো যদি একসঙ্গে আছড়ে পড়ে, মস্ত অনর্থ ঘটে যাবে!

এই ভেবে ভেবেই কেটে গেল তিনটে দিন, তিনটে রাত। তেরাত্তির কোথাও কাটিয়ে ফেলা মানে নাকি আত্মীয়তায় বাঁধা পড়া! তবু সবার কি আর সব ভাগ্যি হয়! তিনটে দিন ধরে শহর জুড়ে পতপত উড়তে থাকা পাকিস্তানি পতাকার ভাগ্যে শহরের আত্মীয়তার বন্ধন জুটল না। রেডিয়োর রেডিপনা তিন দিনের মাথাতেই নিয়ে এল ভ্রম সংশোধনের বার্তা। নাঃ, নট-নড়নচড়ন-নট-কিচ্ছু শহরের দেশান্তর ঘটেনি। সিদ্ধান্তের অধিকারীরা পুনর্বিবেচনা করেছেন, আর সীমান্তরেখাটি টেনেছেন শহরের প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে চলা নদীর মাঝ- বরাবর। শহরবাসীরা, যাঁরা এই তিনটে দিন কাটিয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়, তাঁদের মনে তখন সব ছাপিয়ে চাপা উল্লাস, কারও কারও মনে আবার অনিশ্চয়তার ছায়া। তত ক্ষণে সবাই জেনে গিয়েছে, নদীর স্বাধীন স্রোতে লাগাম পড়েছে, এ-পারের ঢেউ এ বার থেকে এক অদৃশ্য সীমারেখা পেরোলে, তবেই ছুঁতে পারবে ও-পারের মাটি! পাল্টে যাওয়া ইতিহাস তবে এ ভাবে পাল্টে দেয় ভূগোলচিত্রটিও!

গ-এ গুলিগোলা
তবে ইতিহাস মানেই তো গল্পের পিঠে চলে আসা অন্য গল্প, গল্পের পেটে পেটে আরও কত কী! আখ্যানের চোরাপথে অন্য আখ্যানের অন্তর্ঘাত। এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই। তবু না হয় চেষ্টাচরিত্তির করে ফেরা যাক গল্পের গোড়ায়, করিমগঞ্জ ’৭১-এ যখন সাঙ্গোপাঙ্গ সমেত শহরে ঘাঁটি গেড়েছেন মেজর চমনলাল, আর আমাদের সরকারি কোয়ার্টারে গেটের দু’পাশে কঞ্চি-বাঁশের বেড়া দেওয়া যে ছোট্ট দু’ফালি ঘাসজমি, তার একটিতে শুরু হয়ে গিয়েছে খোঁড়াখুঁড়ি। কেঁচোদের শীতঘুম ভাঙিয়ে মাটির তলায় তৈরি হচ্ছে গোপন আশ্রয়, যুদ্ধের সেই মরশুমে যাকে আমরা চিনে নিয়েছিলাম ‘ট্রেঞ্চ’ নামে। শত্রুপক্ষের বিমান হানার সময় লুকিয়ে পড়তে হবে ওই গর্তেই, বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে! বাড়ির ভেতরে হাতের নাগালে রাখা আছে বাঁশ কেটে তৈরি ছোট ছোট কাঠি, আর তুলোর প্যাকেট। সাইরেনের বুক-কাঁপানো ভোঁ শুনলেই ওই কাঠি আর তুলো হাতে ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয় ট্রেঞ্চে। হানাদারদের যুদ্ধবিমান যত ক্ষণ ওড়াউড়ি করবে আকাশে, যত ক্ষণ না তাকে তাড়িয়ে সীমানার অন্য পারে নিয়ে যেতে পারছে মেজর চমনলালের দলবল, তত ক্ষণ ছোটদের কানে গোঁজা তুলো, আর দু’পাটি কচি দাঁতের ফাঁকে বাঁশের কাঠি। বোমা পড়লে তার শব্দে যেন কানে তালা না ধরে যায়, কিংবা জুড়ে না যায় দাঁতে দাঁত!
পাড়ায় অন্য কোয়ার্টারগুলোতেও তৈরি হয়েছে ট্রেঞ্চ, তবে সেগুলোর ওপরে কোনও ছাদ নেই, মাথার ওপর খোলা আকাশ। আমাদের ট্রেঞ্চের ওপর চাপানো হয়েছে করোগেটেড টিন, তার ওপরে আবার চাপড়া চাপড়া ঘাসমাটি সেই প্রথম শোনা, একে বলে ক্যামুফ্লাজ। বোমারু বিমান যতই মাটির কাছাকাছি নেমে আসুক না কেন, ট্রেঞ্চের অস্তিত্ব টেরই পাবে না। বড় হয়ে বুঝেছি, সেই শত্রুপক্ষ যেমন যুদ্ধবাজই হোক না কেন, আসলে তো তৃতীয় বিশ্বের দেশ জনমানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত টের না পেয়ে, দু’হাত উপুড় করে যেখানে-সেখানে বোমা ফেলে নষ্ট করার অবিমৃশ্যকারিতা কি আর তাকে মানায়? ক্যামুফ্লাজ ট্রেঞ্চে আমরা বোধ হয় ছাদহীন ট্রেঞ্চের থেকে তাই একটু বেশিই নিরাপদ ছিলাম। হায় মার্ক্সসাহেব, এই পোড়া দেশে জন্মাননি বলে আপনি জানতেই পারলেন না, উৎপাদন-সম্পর্কের বাইরে আরও কত কত শ্রেণিবিভাজনে প্রতি দিন বিভক্ত আমরা! আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির বারো ঘর এক উঠোনে যেমন কোনও ট্রেঞ্চ তৈরি হয়নি। যদিও সরকারি কোয়ার্টারের গা ঘেঁষেই ওদের বসবাস, তবু সরকারি কোয়ার্টার তো নয়, ওই বাড়তি নিরাপত্তাটুকুর আশ্বাস, বাঁশের বেড়া- টানা সীমানার ওপারে পৌঁছয়নি তাই।

তবে যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে কে আর কাকে নিরাপত্তা জোগাতে পারে, বিশেষ করে আমাদের মতো ছোটদের গল্পই বলছি যখন। এক দিনের কথা বলি। সে দিন বারবেলার কাছাকাছি কখনও বাবা তখন অফিসে, আর মা ঘরকন্না সামলে সদ্য গিয়েছেন চানে আচমকাই বেজে উঠেছিল সাইরেন। যেন এক প্রতিবর্ত ক্রিয়ায়, মুহূর্তের মধ্যে আমরা তিন ভাই নিজেদের আবিষ্কার করলাম ট্রেঞ্চের স্যাঁতসেঁতে পেটে! আর তখনই মনে পড়ল, মা রয়ে গিয়েছেন বাথরুমে। সাইরেনের ভোঁ মা-ও শুনতে পেয়েছেন সন্দেহ নেই, তবে অতিরিক্ত যে আওয়াজটি তাঁকে বিচলিত করে তুলেছে তখন, সে আমাদের তিন ভাইয়ের সমবেত কান্নার রোল! আধভেজা শরীরে শাড়ি-কাপড় সামলেসুমলে মা যত ক্ষণে এসে ট্রেঞ্চে পৌঁছলেন, তত ক্ষণে আমাদের তারস্বর মাতৃবন্দনা, স্বরগ্রামের সব ক’টা সপ্তক পরিভ্রমণ শেষে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত! আর সেই বিজাতীয় চিলচিৎকারে ভয় খেয়েই হয়তো বা তত ক্ষণে পাততাড়ি গুটিয়েছে হানাদার বিমানবাহিনী! সব মিলিয়ে মিনিট পাঁচেক, বা সামান্য কমবেশি। তিন নাবালক শিশুর সেই অসহায় ভয়ের কয়েক মিনিট, কোনও ইতিহাসে জায়গা পাবে না কখনও।

ব্ল্যাক আউটের রাতগুলোকেও কি কিছু কম ভয় পেত ওরা! সন্ধে হলেই শহর জুড়ে নেমে আসত গাঢ় অন্ধকার রাস্তায় বাতি জ্বলে না কত কাল। ঘরের ভেতরেও সমস্ত ফিলামেন্ট বাল্বগুলো শক্ত কালো কাগজে মোড়া। আলোর সূক্ষ্মতম রেখাটিও যেন বাইরের অন্ধকারে শ্বাস নিতে না পারে! নইলে ঘনিয়ে আসবে বিপদ, শত্রুপক্ষের বিমানবাহিনী জেনে যাবে জনবসতির সুলুকসন্ধান। এ ভাবেই অনির্দিষ্ট স্কুল-ছুটির মরশুমে, অভ্যস্ত দৈনন্দিনতায় যুদ্ধের সঙ্গে যুঝবার পাঠ নিয়েছে ওরা। তাই, যে-রাতে খাটে শোয়ার বদলে খাটের তলায় বিছানা পেতে, নির্ঘুম জেগে কাটিয়েছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে, ওরা প্রশ্ন করেনি কিছু। বরং বড়দের মতোই সমান উৎকণ্ঠা নিয়ে সমস্ত রাত ধরে কান পেতে শুনে গিয়েছে মর্টারের অবিশ্রাম গুলিবর্ষণের আওয়াজ, আর দেখেছে কাচের জানলার ও-পারে কালিপটকার মতো মুহুর্মুহু উড়ে যাচ্ছে আগুনের ফুলকি। বাবার ভয় ছিল, ও-রকম দু’একটা ফুলকি দেয়াল ফুঁড়ে ঘরের ভেতর না ঢুকে পড়ে আবার! খাটের তলায় শোওয়ার ব্যবস্থা, সেই দুর্ভাবনারই ফল। জানলার কাচে ক’দিন আগেই বাবার অফিস থেকে লোক এসে সেঁটে দিয়ে গিয়েছে কালো কাগজের ক্রস-চিহ্ন, যাতে যখন-তখন ঝনঝন ভেঙে পড়ে বিপদ না ঘটায়। তবুও তেমন সম্ভাবনাকে সারা রাত ধরে জিইয়ে রেখে ঝনঝনাল সব ক’টা জানলা। ভোর হতেই খোলা জানলা-পথে ভেসে এল বিজয়ের গান। গোটা শহর তখন উচ্ছল আনন্দে ছুটছে সীমান্তের দিকে, ভিড় জমাচ্ছে কুশিয়ারার পাড়ে। খবর রটে গিয়েছে, খানসেনারা আত্মসমর্পণ করেছে কাল রাতে। তবু এরই মাঝে সকালের হাল্কা কুয়াশার মতো শীতের শহর ছেয়ে রইল বিষাদের এক অস্বচ্ছ ছায়া গত রাতের মরণপণ যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন মেজর চমনলাল!

ঘ-এ ঘটনা
আমরা, মানে একাত্তরের শিশুরা জেনেছিলাম, সে দিনের পর আমাদের শহরের আকাশে আর কখনও হানা দেবে না যুদ্ধবিমান, যখন-তখন বেজে উঠবে না সাইরেন, রাতের নৈঃশব্দ্যের চেয়ে আরও বেশি ভয়ের উপচার বয়ে নিয়ে আসবে না মর্টারের অবিরাম গুলিবর্ষণের শব্দ। আমরা জেনেছিলাম, কী ভীষণ জরুরি ছিল এই যুদ্ধজয়, নইলে শত্রুসেনাদের বুট ও ট্যাঙ্কের নির্মম প্রতাপে হয়তো এক দিনেই গুঁড়িয়ে যেত আমাদের ওই ছোট্ট শহর। সত্যি, শিউরে ওঠার মতোই আশঙ্কা বটে! সেই কল্পিত ভয়যাপন আর যুদ্ধজয়ের উদ্যাপনের তালগোলে আমরা জানলাম না কুশিয়ারার বুকে ভূগোলচিত্রটি আবার পাল্টে গিয়েছে! সেই কবে চব্বিশ বছর আগে সঙ্গত বিবেচনায় যে অদৃশ্য সীমারেখাটি মাঝ-বরাবর দ্বিধাবিভক্ত করেছিল কুশিয়ারাকে, তার ও-পারে জন্ম নিয়েছে বাংলা নামে অন্য দেশ। জানলাম না যে জয়কে আমরা মেজর চমনলালদের জয় বলে ভেবে নিয়েছিলাম, সে আসলে এক দল আত্মপরিচয় খুঁজে ফেরা মানুষের জয়, এক মরিয়া ভাষাবন্ধনের জয়। সেই বন্ধনে মেজর চমনলাল আর তার দলবল যে কী করে বাঁধা পড়লেন কে জানে, ভাষাতুতো ঘেঁষাঘেঁষিতে ওঁরা বরং শত্রুসেনাদেরই ভাই-বেরাদর! ছোটরা অতশত বোঝে না, আমরাও জানতে পারিনি ওই সব সূক্ষ্ম প্রশ্নের উত্তর। জানতে পারিনি আরও অনেক কিছুই। জানতাম না, এই সমস্ত কিছু চুকেবুকে যাওয়ার দেড় দশক পর, বোধ করি মেজর চমনলালদের প্রেতাত্মারাই দাপিয়ে বেড়াবে আমাদের ওই ছোট্ট শহরের আনাচকানাচ, কারফিউগ্রস্ত শহরের নির্জনতাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে বুট জুতোর শাসন, দুঃস্বপ্নের রাত ও রক্ত মাখামাখি হয়ে গড়িয়ে যাবে রাজপথ থেকে অন্ধগলি, ভাষিক আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে পাঁজর পেতে আগলাতে হবে আমাদের মুখের ভাষা, সুখের জবান আর আহত বর্ণমালা, জানতাম না, বড় হতে হতে বিপন্ন বিস্ময়ে আমরাও ঠিক জেনে যাব শত্রুমিত্রশত্রু-ভেদে কখন কী ভাবে পাল্টে যাবে রাষ্ট্রের মুখ ও মুখোশ, পাল্টে যাবে স্বভূমির দিকনির্দেশ, আর মানচিত্রের ইতিহাসধ্বস্ত এক প্রান্তসীমায় সেই সময়ান্তরের সাক্ষী হয়ে জেগে থাকবে আমাদের স্মৃতি ও সত্তার শহর করিমগঞ্জ ও তার কোল ঘেঁষে ছলাৎছল বয়ে চলা আমাদের ছোট নদী কুশিয়ারা ভুবনজোড়া প্রান্তিকতার দুই অ-বাক প্রতিভূ।

আনন্দবাজার পত্রিকা

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও