রবিবাসরীয়

সেক্টর ফাইভ

স্রেফ শিল্পতালুক নয়, এই অঞ্চল বাঙালিকে স্মার্ট করেছে, পথের ধারে মিনি আমেরিকা বানিয়েছে, ঝুপড়িকে ‘ঝুপ্স’ বলে শুদ্ধ করে নিয়েছে।

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা,১৩ জানুয়ারি ২০১৩

sector five

বঙ্গে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয় সেক্টর ফাইভে। ছবি- সুমন চৌধুরী।

জন্মরহস্য
বঙ্গে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয় সেক্টর ফাইভে। উত্তর চব্বিশ পরগনার এই শিল্পতালুক বঙ্গের ভাগ্যাকাশে নতুন একটি দিকের (অর্থাৎ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণের পর পঞ্চম একটি দিক) উন্মোচন করে বলে একে ইংরেজিতে সেক্টর পাঁচ বলা হয়। অন্য একটি ব্যাখ্যা বলে, ওয়াই-টুকে-পূর্ব, মল-মাল্টিপ্লেক্স-নাইট ক্লাব-বিবর্জিত, উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে বঙ্গজাতি স্রেফ আত্মরতিতে মগ্ন ছিল। তারা বিশ্বায়নের মর্ম বুঝত না। হুইস্কি-মাটন ছেড়ে স্রেফ ডাল-ভাত-মাছে নিমগ্ন ছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। যে কারণে ভদ্রভাষায় বাঙালিকে ‘আত্মঘাতী’ ও চলিত ভাষায় ‘ভাতে-মাছে আছি, সাতে-পাঁচে নেই’ বলে ব্যঙ্গ করা হত। এই অপবাদ ঘোচানোর জন্য, শিল্পতালুকের নামকরণ করা হয় সেক্টর পাঁচ, যাতে ‘পাঁচে’ নেই, এই কথাটা অন্তত বাঙালিকে কেউ বলতে না পারে।

স্থাপত্য
সেক্টর ফাইভ-পূর্ব যুগকে বলে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত যুগ। আর প্রো-অ্যাকটিভলি ময়দানবীয় এক নতুন যুগের সূচনা করা হয়েছে বলে উত্তর-সেক্টর-পাঁচ যুগকে বলা হয় প্রো-পঞ্চ-ময় যুগ। পঞ্চত্বপ্রাপ্ত কলকাতা বলতে লোকে বুঝত অর্ধমৃত গঙ্গার উপর পুরনো একটি সেতু। প্রপঞ্চময় সেক্টর ফাইভ কলকাতাকে সে লজ্জা থেকে মুক্তি দিয়েছে। আজ বিমানবন্দর থেকে মাখন-মসৃণ সড়ক দিয়ে শহরের দিকে এগোলেই যে সুউচ্চ বাক্সবাড়ির দিগন্তরেখা দেখা যায়, তা একই সঙ্গে হাডসন-পাড়ের অভ্রংলিহ হর্ম্যরাজির সিলুয়েট, আর মিশিগানের নীল জলে সিয়ার্স (অধুনা উইল্স) টাওয়ার বা হ্যানকক বিল্ডিং-এর ছায়ার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। আর একটু এগোলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বিশ্বকর্মার নিজস্ব কর্মশালা। কোনওটা বিশ্বের প্রথম ‘বুদ্ধিমান’ বাড়ি, কোনও বাড়ির নাম ইনফিনিটি। কোনওটি গ্রিক ঘরানার, কোনওটি আমেরিকান। কোনওটি রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো, কোনওটি পুরো কাচের তৈরি। বিশালত্বের এই কার্নিভ্যাল দেখলে ভূমার সঙ্গে মাথা নত হয়ে আসে।

দর্শন
আগে বাঙালির তিনটি চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ছিল আমাশা, ম্যালেরিয়া ও হীনম্মন্যতা। তারা কিনু-গোয়ালার-গলিতে টিকটিকির সঙ্গে বসবাস করত আর ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে ঢাকাই শাড়ির স্বপ্ন দেখত। কিন্তু সেক্টর পাঁচ বাঙালির শরীরী-ভাষা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আজ নব্য কর্পোরেট কোডারদের দেখলে প্রাচীন কেরানিকুলকে হোমো-ইরেকটাস গোত্রীয় মনে হয়। আজকের কম্পিউটার-কেরানি হেলায় দিনকে রাত ও রাতকে দিন করেন। সকালে অফিসে আসেন, বীরদর্পে সারা দিন ও রাত কাজ করে পরের দিন বাড়ি যান, এবং একে তাঁরা কর্মসংস্কৃতি বলেন। তাঁরা দিনের বেলা ফেসবুক করেন, রাতে কন-কল। আপিস করতে সেক্টর ফাইভ যান, লং ড্রাইভে উলুবেড়ে। দিনে বসের ধাতানি খান, রাতে ফ্রেশ লাইম। প্রাতঃকালে বিগবাজার গমন করেন, সান্ধ্যভ্রমণে মল। দুঃখ পেলে শিট বলেন, আনন্দ পেলে ওয়াও। তাঁরা জানেন না হেন বস্তু নেই। মুখ খুললেই শেয়ার বাজারের গূঢ় তত্ত্ব, ল্যাপটপ খুললেই টেকনোলজির অন্ধিসন্ধি। শরীরী ভাষায় হীনম্মন্যতার আর চিহ্নমাত্র নেই। সেক্টর ফাইভের কথ্য ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিউড, দ্যাট্স দি অ্যাটিটিউড’।

সেক্টর ফাইভের দর্শনে এই কথ্য ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। পুরনো বাংলা ও নবীন ইংরিজির অভূতপূর্ব মিশ্রণের কারণে পঞ্চম সেক্টরের এই ভাষাকে বলা হয় ‘পাঞ্চ’। পুরনো জড়তা ধুয়ে ফেলে নতুন যুদ্ধজয়ের আহ্বান ধ্বনিত হয় বলে কেউ কেউ একে নবভারতের পাঞ্চজন্যও বলেন। ‘আই ক্যান নট গো টু কেএফসি টুডে রে, ডুয়িং সন্তোষী মা’ জাতীয় ‘পাঞ্চ’ আজ নবদিগন্তের প্রতিটি কোণে কান পাতলেই শোনা যায়। তবে এটুকু শুধু বহিরঙ্গ। অন্তরঙ্গের পরিবর্তনটি অনেক ব্যাপক। পঞ্চত্বপ্রাপ্ত যুগে ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ ছিল একটি নিন্দাসুলভ আচরণ। একদা কোনও কিছু করতে না পারলে, সে বিষয়ে অযথা বাক্যালাপ না করে বাঙালি মধ্যবিত্ত লজ্জায় জড়সড় হয়ে বসে থাকত। আর আজ, সেক্টর ফাইভের যুবা ওই একই পরিস্থিতিতে সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘দিস ইজ নট রকেট সায়েন্স।’ অর্থাৎ, বস্তুটি কী এমন উচ্চমার্গের, যে, না বুঝলে জীবন বৃথা? ফলে, কোনও বিষয়ের আগা থেকে গোড়া অবধি একেবারেই বোধগম্য না হলেও আজ আর বাঙালি থমকে যায় না, বরং ঝটপট কপি-পেস্ট মেরে গম্ভীর গলায় বলে, ‘ডু নট রি-ইনভেন্ট দ্য হুইল।’ মানে, যে জিনিস একবার হয়ে গেছে, সেটা আর এক বার করার দরকারটা কী, টুকে দিলেই হয়। এ শুধু ভাষার কারিকুরি নয়। এই দুই ইংরিজি বাক্য হল এই প্রপঞ্চময় বিশ্বের মহাসূত্র, সেক্টর ফাইভ বা সর্ব ক্ষণ জপে চলেছে। যা বাঙালিকে দিয়েছে মেকলে-মনস্কতা থেকে চিরতরে মুক্তি। জুগিয়েছে সাহস। সেক্টর-ফাইভ-উত্তর বাঙালি ললনা তাই সমস্ত পিছুটান ঝেড়ে ফেলে আজ অঙ্গে চড়ায় স্প্যাগেটি টপ, স্লিভলেস বাহুতে জড়ায় তাগা ও তাবিজ। প্রগতিশীলতার হ্যাংওভার কাটিয়ে অকুতোভয়ে নীলষষ্ঠীর উপবাস করে। বাঙালি পুরুষ ছোট চুলের বাধ্যবাধকতা কাটিয়ে ফেলে মাথায় পনিটেল-বেণীর আবাদ করে। অনুমান, বহু যুগ পূর্বে এই সম্ভাবনার কথা ভেবেই কবিগুরুর সেই অমোঘ উক্তি: ‘পঞ্চনদীর তীরে/বেণী পাকাইয়া শিরে’। বলা বাহুল্য, পঞ্চনদীকে এখানে সেক্টর পাঁচ হিসেবেই বুঝতে হবে। ‘নদী’, ‘সাগর’ শব্দগুলিকে কবি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন, যথা ‘মহামানবের সাগরতীরে’।

ঐতিহ্য
তার মানে কিন্তু এই নয়, যে, সেক্টর ফাইভ থেকে পুরাতন সমস্ত ঐতিহ্যকেই ‘আসুন’ বলে বিদায় দেওয়া হয়েছে। যদিও এ কথা সত্য যে, নবদিগন্তের দিকে-দিকে ঝাঁ-চকচকে স্থাপত্য, রাস্তায় মার্সিডিজ থেকে টয়োটা, দেখলেই মনে হয় শিল্পবিপ্লব আসন্ন, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলেই নজরে পড়বে, চোখ-ঝলসানো আধুনিকতার পাশে উত্তর কলকাতার গলির ঐতিহ্যকেও এখানে সযত্নে রক্ষা করা হচ্ছে। পুরনো গলি-কলকাতার রীতি মেনে সেক্টর ফাইভের রাস্তায় ফুটপাথের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যেখানে যেটুকু আছে, তাও যত্ন করে নীল রেলিং দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, যাতে সহজে ওঠা না যায়। সেখানে শুধু ঝুপড়ির মেলা। নবদিগন্ত সাম্যে বিশ্বাস করে। হাতের পাঁচটি সেক্টর (পড়ুন আঙুল) কখনও সমান হয় না। কিন্তু সকলকে একজোট করে হাত তুললে তবেই হাই-ফাইভ দেওয়া যায়। মার্সিডিজ হোক বা পথচারী, মুড়ি হোক বা মুড়কি, নবদিগন্তের পথে সকলেরই সমানাধিকার। জনসাধারণের রাস্তায় দলে দলে যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়, সাইকেল, অটো, ঝাঁকামুটে, বাস ও ফেরারি একই সঙ্গে পথ চলে। অটোরা উড়ে যায়, বাসেরা দাঁড়িয়ে থাকে, বিদেশি গাড়িরা তাদের প্রবল জাত্যভিমান ত্যাগ করে যেখানে-সেখানে মুখ গুঁজে দেয়। সবাই মিলে চিৎকার করে, হর্ন দেয়, ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়, যেখানে-সেখানে কোঁদল শুরু করে জটটা আরও খোলতাই করে তোলে।
এখানে শুধু সচল বস্তু নয়, নির্জীব ও ঝুপড়িদেরও সমানাধিকারের ছাড়পত্র দেওয়া আছে। ফুটপাথ ছাড়িয়ে পথের যে-কোনও জায়গায় তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। নবদিগন্তের ‘পাঞ্চ’-এ তাদের ‘ঝুপ্স’ বলা হয়। যথাযথ তৃতীয় বিশ্ব ব্যতিরেকে শুধু ইউরোপ-আমেরিকায় যেমন পৃথিবী সম্পূর্ণ হয় না, তেমনই সু-উচ্চ অট্টালিকার নীচে ঝুপড়ির সারি ছাড়া সেক্টর ফাইভ অচল। সেক্টর ফাইভের আমজনতা এদেরকে চোখের মণির মতো ভালবাসেন। উঁচু-উঁচু প্রাসাদের দম্ভ ত্যাগ করে কম্পিউটার-কেরানিরা সকাল-সন্ধে এই সব ঝুপড়িতে পদধূলি দেন। চায়ের দোকানে গালগল্প করেন, অবিকল সাধারণ মানুষের মতো বিড়ি-সিগারেট খান। তফাত এইটুকুই, তাঁরা চপ-সিঙ্গাড়া-ঝালমুড়ি খেয়ে ‘সো হট’ বলে জিভ বার করেন, চিকেন-চাউমিন ভক্ষণ করে ‘অসাম’ বলে দোকানির পিঠ চাপড়ে দেন। কোনও ক্যামেরা সাক্ষী থাকে না, কিন্তু সে-সব মুহূর্তে ঝলসে ওঠে সাম্যের আলো। মহামানবের সাগরতীরে স্থাপিত হয় পূর্ব ও পশ্চিম, আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সেতু।

স্বকীয়তা
তবে আধুনিকতা বা ঐতিহ্যের জন্য নয়, ইতিহাসে সেক্টর ফাইভের নাম যদি কোনও কারণে অক্ষয় হয়, তা তার সৃষ্টিশীলতার জন্য। বঙ্গসংস্কৃতিতে স্বকীয়তা এবং সৃষ্টিশীলতার বিশেষ গুরুত্ব আছে। সৃষ্টিশীল কোনও কাজ করে না দেখাতে পারলে কলকাতা শহরে কল্কে মেলে না। নবদিগন্ত সেই অগ্নিপরীক্ষাও হেলায় পাশ করেছে। যেমন, জাপানের বুলেট ট্রেন এ দেশে আনতে, তার প্রযুক্তি বুঝতে, ভারতীয় রেল বিগত কয়েক বছর ধরে হিমশিম খাচ্ছে। সেক্টর ফাইভ দেখিয়ে দিয়েছে, বুলেট ট্রেন এমন কিছু রকেট সায়েন্স নয়। ওই বহুবিজ্ঞাপিত যানের জবাবে এই শিল্পতালুক কলকাতাকে দিয়েছে তার নিজস্ব আবিষ্কার ‘শাট্ল’। বিকেল গড়িয়ে নবদিগন্তে যখন সন্ধ্যার ম্লানিমা নেমে আসে, গাড়ির ধুলোয় ঢেকে যায় দশ দিগন্ত, জ্যামে চতুর্দিক স্তব্ধ হয়ে আসে, বাসের পা-দানিতে পা রাখার জায়গা থাকে না, মুখ ফিরিয়ে চলে যায় শেষ অটোও, তখনই শাট্ল-এর আসল মহিমা টের পাওয়া যায়। এই অদ্ভুত বাহন যেমন তীব্রগতি, তেমনি দূরগামী। গতিতে এরা অনায়াসে এয়ারফোর্স ওয়ানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। বিদ্যুৎগতিতে এরা মানুষকে নিয়ে যায় এয়ারপোর্ট, বালি, উত্তরপাড়া এমনকী শ্রীরামপুরেও। এরা যায় ঝড়ের গতিতে, আসে টর্নেডো-র মতো। পথে ধুলো-বালি, কুকুর-ছাগল ও পথচারী সামনে পড়লে তাদেরও উড়িয়ে নিয়ে যেতে দ্বিধা করে না। আশা করা যায়, সে দিন আর বেশি দেরি নেই, যখন এরা অনায়াসে সিঙ্গুর, তারকেশ্বর, বিষ্ণুপুর, রানাঘাট ও তিব্বত যাবে। বিশ্ব জয় করবে। তখন ভারতীয় রেল কোম্পানি তো বটেই, বুলেট ট্রেনও পৃথিবী থেকে মুছে যাবে।

এ তো শুধু এক খুচরো আবিষ্কার। সেক্টর ফাইভের দ্বিতীয় বীজমন্ত্রটির প্রয়োগ আরও ব্যাপক। নবদিগন্তের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্কের কথা আগেই বলা হয়েছে। ‘জুতা আবিষ্কার’ নামক তাঁর একটি দার্শনিক চিন্তাকে পুনরাবিষ্কার না করে, বরং পুনর্ব্যবহার করে, নবদিগন্ত একাধারে নিজের বীজমন্ত্রের প্রতি এবং দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতিও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ দর্শনটি অতীব চমৎকার। পায়ে ধুলো লাগা আটকাতে হলে পৃথিবীকে চামড়া দিয়ে ঢেকে লাভ নেই, পা ঢাকাই যুক্তিসঙ্গত, এই তার মূল কথা। এই দর্শনটি বঙ্গজাতি নিজের অজ্ঞাতে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহার করেছে। যেমন, মশা তাড়ানোর জন্য দুনিয়া থেকে জল না ছেঁচে তারা নিজের বাড়িতে গুডনাইট লাগায়। সারা দুনিয়ার ময়লা পরিষ্কার না করে নিজের বাড়িটি পরিষ্কার রাখে, আর ময়লা ফ্যালে রাস্তায়। কিন্তু এ সবই অসচেতন ভাবে। সেক্টর ফাইভ সর্বপ্রথম সচেতন ভাবে এই দর্শনটি বৃহত্তর মাত্রায় প্রয়োগ করেছে। গোটা নবদিগন্তকে আমেরিকা বানানো কঠিন বলে, তারা এক-একটি বাড়িতে ছোট ছোট আমেরিকা বানিয়েছে। সে সব বাড়িগুলির পোশাকি নাম এস ই জেড, বাংলায় তাকে অভাগীর স্বর্গ বলা যেতে পারে। বঙ্গীয় যুবক-যুবতীরা এই স্বর্গরাজ্যে প্রবেশাধিকার পেলে কোলে ল্যাপটপ ও হাতে চাঁদ পান। এই সেই সব অট্টালিকা, যার সর্বোচ্চ তল ছুঁয়ে মেঘেরা গাভীর মতো চরে, মেঝেতে পা দিলে পা পিছলে যায়, নিঃশব্দে উঁচু, বহু উঁচুতে উঠে যায় আনমনা এসকালেটর। এর কাচের দেওয়াল দিয়ে তাকালেই দেখা যায় বাইরে গিজগিজ করছে যমের-অরুচি থার্ড ওয়ার্ল্ড। মশা, মাছি, ভিখিরি, ফেরিওয়ালা, উন্মাদ ও লম্পটে দুনিয়া থিকথিক করছে। জমি-বাড়ির দালাল, ইনশিয়োরেন্সের এজেন্ট থেকে শুরু করে শিল-কাটাবে-গোওওও পর্যন্ত সবাই যে যার মতো ধান্দা করছে। পাপড়ি চাট, ঢাকাই পরোটা, বিষ চা থেকে শুরু করে ‘সুলভে নেমপ্লেট বানান’-এর দোকানে কেনাবেচা হচ্ছে। গলাবন্ধ পোশাক পরে ঘামতে-ঘামতে কারা যেন বিলিতি জিম-এর লিফলেট বিলি করছে, আর তারই মধ্যে মিনিস্কার্ট পরে গাড়ি-কোম্পানির সুন্দরীরা নতুন লঞ্চ হওয়া চার-চাকা বেচার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এক-পাশের ঝুপড়িতে হাভাতের মতো লোকে চপ-মুড়ি কিংবা ভাত-রুটি গিলছে। আর এই সব বিশৃঙ্খলা টপকে, বিড়ি ফোঁকা শেষ করে, ক্রেডিট কার্ডের সেল্সম্যানকে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিয়ে বিল্ডিং-এর গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে আসছেন সেক্টর ফাইভের বাবু ও বিবিরা। ঢোকার মুখে উর্দিধারী দারোয়ান চেক করে নিচ্ছে পাসপোর্ট।

এ সকল অট্টালিকায় প্রবেশের জন্য পাসপোর্ট, অর্থাৎ গলার বকলস আবশ্যক। এখানে আম-জনতার প্রবেশ নিষেধ। এই সব ভবনে আছে উন্নত মানের কফিশপ, বইয়ের দোকান। কোনও কোনও বাড়িতে আছে পানশালা। বাইরে থেকে অস্বাস্থ্যকর তেলেভাজা খেয়ে এসে, কফি বা পানপাত্রে চুমুক দিয়ে সেক্টর ফাইভের বুদ্ধিজীবীগণ সেখানে শান্তিতে ঢেকুর তোলেন। একে-তাকে কাঠি করেন ও পরনিন্দা-পরচর্চার সঙ্গে চাট হিসেবে স্লাইট দেশ-ও-দশ বিষয়ক নানা উচ্চ স্তরের রাজা ও উজির মারেন। তৃতীয় বিশ্বের বাসি-তেলে-পোড়া পাকস্থলীতে বিদেশি পানীয়ের প্রলেপ পড়ে। প্রাণের আরাম ও আত্মার শান্তি হয়। একে লিবারালিজ্ম বলা হয়। শান্তিতে লিবারালিজ্ম চর্চার সুযোগ দিয়ে সেক্টর ফাইভ বঙ্গজনতার আত্মাকে আনন্দ দিয়েছে। আর দিয়েছে টুকরো টুকরো আমেরিকা। বৃহৎ বঙ্গের ইতিহাসে এর কোনও তুলনা নেই।

আনন্দবাজার পত্রিকা

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন