বাংলা ব্লগ

লাস্ট ডে, লাস্ট শো

ঋজু বসু

গালুডির মুখে ধুলো-ঢাকা হাইওয়ের ধারে তিনি দাঁড়িয়েছেন দেখে বুকের মধ্যে যত জোরে খুশির নাগাড়া বেজে উঠেছিল, অ্যান্টিক্লাইম্যাক্সের অভিঘাতটাও ততটাই জোরালো হল। মোটরবাইকটায় হেলান দিয়ে তাপসদা আর অর্জুন খালি হাতে দাঁড়িয়ে। বাইকের পিঠেও শালপাতা কি প্লাস্টিকে মোড়া কিছুর চিহ্ন নেই।
 
কিন্তু তাপসদা সবিনয় হেসে বললেন, চলুন তাহলে, এই দু'-দশ পা ভেতরে ঢুকতে হবে! নিজের চোখে পিঠার জন্ম হতে দেখলে তবে না খাবেন!

প্রবল ফ্রাস্ট্রুতে আমার তখন সেই ভরদুপুরে মিশমিশে মখমলে মাখা রাত্তিরের পোড়াকপাল হুলোর মতো মনে হচ্ছে! লাস্ট সিনেও তবে এই ছিল কপালে! ধুক করে নিভে গেল বুকভরা আশা!
 
তাপসদার প্রস্তাব শুনে মনে মনে তেড়ে গাল পাড়ছি। খেপেছি, আর কী! এই তো হাইওয়ের হাল! সাত-সকালে রাঁচি থেকে বেরোন ইস্তক সুমোটা এত মালপত্তর নিয়ে ঘটরঘটর করতে করতে এগোচ্ছে। পিছনে একটানা লাফাচ্ছে, আমার এক বছরের সংসারের হাঁড়িকুড়ি। প্যাকারের বাক্সে মাইক্রো আভেনটা আস্ত আছে কি না, কে জানে! আর চান্ডিলের পর থেকেই যা ধুলো উড়ছে, তাতে নিজের কা‌লিঝুলি মাখা মুখটা গাড়ির রেয়ারভিউ মিররে দেখে নিজেই আঁতকে উঠেছি।

হাইওয়ের যদি এই হাল হয় তবে গ্রামের রাস্তার অবস্থা কী হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লটবহর নিয়ে শেষটা কোন্ গলিঘুঁজিতে টায়ার ফাঁসলে তখন আমায় কে উদ্ধার করবে শুনি! পর ক্ষণে মনে হল, ট্রান্সফারের পরে কম্পানিকে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে সড়কপথে লোটাকম্বলসুদ্ধ কলকাতা প্রত্যাবর্তনের হ্যাপাটাই তো এর জন্যে। নইলে ক্যুরিয়ারের ঘাড়ে মালের বোঝা চাপিয়ে ট্রেনের এসি কামরায় নাক ডাকিয়ে দিব্যি নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরা যেত! তাছাড়া, হিতৈষীরা সক্কলে বলেছিলেন, টাটা-ঘাটশিলা রুট না-ধরে বরং ধানবাদ-আসানসোল হয়ে ঘরে ফের, ও দিকটায় রাস্তা ঢের বেটার! এখন আমার সকল নিয়ে পথে ঝাঁপানোর পরে এ ভাবে রণে ভঙ্গ দেব? কভি নেহি!

যে-দিন রাঁচি থেকে রওনা দিলুম, তার আগের রাতেই ছিল দিওয়ালি। যখন সভ্য-ভব্য জনগণ মিষ্টি-মিষ্টি রিনরিনে স্বরের দেদার বাজি ফাটিয়ে আনন্দ মানান। গাঁ-ঘরের আনপড় সিংভূম তখন মেতেছে সোহরাইয়ের খুশিতে। ঝাড়খণ্ডের সোহরাই মানে, জঙ্গলমহলের বাঁদনা। গবাদি-পশুর পুজো। গরু-ছাগলের তকতকে শিঙে সিঁদুরে আভাস। পাড়াগাঁর সাঁওতাল মহল্লাও চোখ জুড়োচ্ছে স্নিগ্ধ প্রলেপে। শহুরে রঙ-করা রাজবাড়ির নকল ইন্টিরিয়র নয়। রকমারি পাথর-মাটি-গাছের সবুজ মিশিয়ে প্রাকৃতিক রঙের ছোঁয়া। আর সবার ওপরে পিঠেই সত্য। যখন ঘরে ঘরে প্রস্তুত হয় সেই আশ্চর্য বস্তু। একটা গোটা বছর ধরে যাকে আমি চোখে দিকিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি! ধরা দিচ্ছি-দিচ্ছি বলেও যে ব্যাটা আমায় চুক্কি দিয়ে ঠিক ফস্কে গ্যাছে। আমার এক বছরের ঝাড়খণ্ডবাস বা ‘পশ্চিম-যাপনে’-র লাস্ট সিনেও সে কি এমনই হাতছানি দিয়ে টা-টা করতে করতে উধাও হয়ে যাবে!

তাপসদার মোটরবাইকটা তাই ফলো করার ডিসিশনই নিলুম। এ বার সুমোটাকে মোচার খোলের মত ডিঙি মনে হচ্ছে। পিছনের মালপত্তর ধুপধাপ করছে, আমি নো দৃকপাত! এই ঘুরপথে কীভাবে ঢুকে আমার গাড়ি বিকল হল, কম্পানি তা জানতে চাইলে কী জবাব দেব, সে-ভাবনাটা অ্যাটাক করলেও মোটে পাত্তা দিলুম না! সব থেকে জ্বালাতন, কলকাতা থেকে গুচ্ছের ফোন! মোবাইলের সিগন্যালটা কেন যে এখনও জ্যান্ত আছে। এই টেকনোলজির যুগে‌ দিকশূন্যপুর-টুর কিচ্ছু কোত্থাও নেই। নইলে রাঁচি থেকে বেরিয়ে এই দশম ফল্‌স, দেওড়ি মন্দির, দলমা পাহাড়, টাটা কোথায় কখন পৌঁছলুম পদে পদে তার আপডেট দিতে হয় না কি!

এমনিতে অবশ্য আমরা তরতর করে এগোচ্ছি। রাঙামাটিতে সেই ইস্পেশাল রাবড়িটা (আসলে ক্ষীর) রসগোল্লা (পড়ুন, পুঁচকে পান্তুয়াবিশেষ) দিয়ে আবার কবে চাখব ভেবে একটু হল্ট। আর হ্যাঁ মনে পড়েছে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দিশি মুরগির ঝোল টানতে চান্ডিলের সেই ধাবাটায় একবার থামতেই হয়েছিল। ফোন পাচ্ছি, কী ব্যাপার! সবে গালুডি! এতক্ষণে তো বেঙ্গলে ঢুকে ঝাড়গ্রামের কাছে ঢুকে পড়ার কথা ছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়ে যত অবান্তর কথা! ঢেউ খেলানো রাস্তায় ডাইনে-বাঁয়ে কাত হতে হতে আমি একটিমাত্র আশা নিয়ে চলেছি।

এই তাপস চাটুজ্জে লোকটা ভালমানুষ সন্দেহ নেই! বাঙালিদের মধ্যে হেভি পপুলার। বিভূতিভূষণের বাড়ি সংস্কার-টংস্কার করেন। অর্জুন সিংহ তাঁর শাগরেদ। তবে তাপসদা অন্তত তিনবার আমায় ঝুলিয়েছেন। সেই যে পুজোর মুখে দাশাই নাচ দেখতে ঘাটশিলায় এসে পড়ে রইলুম। তখনও বলেছিল, চলে আসুন, মাংসের পিঠা খাওয়াব। হেন্দলজুড়ি গ্রামে বাইজন মুর্মুদের ঠেকে দাশাই নাচের সাজঘরে ঢুকলেও মাংসের পিঠে আমার জন্য অধরাই থেকে গিয়েছে।
 
আদিবাসী-জীবন নিয়ে ডকুমেন্টারি ছবির ডিরেক্টর মেঘনাথ-দাও রাঁচিতে বসে উস্-আস্ করতে করতে কাঠের আঁচের ভাপে পাকানো প্রকাণ্ড পিৎজার মতো দেখতে সেই সাঁওতালঘরের পিঠের বর্ণনা করেছেন। কোনওদিন খাওয়াননি। রাউরকেলার কাছে কুইলসর গাঁয়ে খাড়িয়া-মহল্লায় আমার বন্ধু সন্তোষ কিড়োর বাড়ি বা সিমডেগায় গ্ল্যাডস্টন ডুংডুংয়ের কল্যাণে বাঁশের কোড় দিয়ে দুরন্ত মুরগির কষা চেটেপুটে খেয়েছি। কিন্তু সুকরির মাংসের পিঠা আমায় সেই প্রবঞ্চনাই করে গিয়েছে। সন্তোষদের ইলেকট্রিকের বালাইহীন গ্রামে দোলের সন্ধেয় ভেজালবিহীন জ্যোস্নায় মাছের কষার চাট দিয়ে মহুয়া খেয়ে বর্তে গেলেও এমন একটা মোক্ষম অপ্রাপ্তির শোক থেকে আমি কিছুতেই বেরোতে পারিনি।
 
দিন দশেক আগেও জামশেদপুরে কাজে এসে আমি কী একটা ছুতো করে ঘাটশিলায় ঘুরে গিয়েছিলুম। সে-বারও তাপসদা আমায় নিয়ে গিয়েছিল এই জগন্নাথপুর গ্রামে। বনকাঠি পঞ্চায়েতের মুখিয়া পনপতি মারডির বাড়ি। তখন নরম রোদে ঘরে ঘরে দাওয়ায় চালের গুঁড়ি শুকোচ্ছে। সুকরির পিঠা (পর্ক), খাসির পিঠা নিয়ে বিস্তর গপ্পের ফাঁকে পনপতি ভাবির স্বামী ঠাকুরপ্রসাদ আমায় হাঁড়িয়া অফার করলেন। একটু বাদে আমি পিঠা কখন আসবে জিজ্ঞেস করায় তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েছেন। 'এখন কী! সোহরাই বা মকরের (মকর সংক্রান্তি) সময়ে আসুন। আসতে ভুলবেন না'!
 
এহেন অফার মাথায় রেখেই পরিকল্পনামাফিক দিওয়ালির ঠিক পরের দিনে সড়কপথে আমার কলকাতায় ফেরার ফন্দি।  তবে বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে ভেতরের রাস্তায় এতটা ঢুকে জগন্নাথপুর গ্রামে যাওয়াটা খুব একটা প্রজ্ঞার পরিচয় হবে না এটা আমার মনে হয়েছিল। তাপসদাকে তাই বলা ছিল, দাদা যদি গালুডির মুখটায় হাতে একটু পিঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

বাইকটার পিছু-পিছু এগোতে এগোতে হতাশা ও উৎকণ্ঠা দু’টোই একযোগে মাথা তু‌লছিল। তাপসদার দু’-দশ পা শেষ হল, অন্তত কিলোমিটার দেড়েক পার হয়ে। জগন্নাথপুরে ঢুকতেই দাদা-বউদি খাতির করে দাওয়ায় চেয়ার পেতে বসালেন।

কিন্তু পিঠের নামগন্ধ নেই। মুখিয়া-কাম-গৃহবধূ কোলের ছেলেটাকে সামলে আমার সামনেই একটু হলুদ দিয়ে মাংস আর চালের গুঁড়ি মাখতে বসলেন। তাপসদা গরু-শুয়োরের নামে কানে হাত চাপা দেন। তার ওপর কোলেস্টেরল না কীসের চাপে মাটনটাও ওঁর তত চলে না। তাই ব্রয়লারের পিঠে কস্মিনকালে না-ঘটলেও ওঁর অনারে তারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

শালপাতা বিছিয়ে মাংস আর চালের গুঁড়িমাখা ভারী সুদৃশ্য একটা মাটির বাসনে রাখলে‌ন পনপতি। ওঁরা বললেন, নাদুয়া। এমন পাত্র আমাদের শহুরে ড্রয়িংরুমে হামেশা সাজানো থাকে। মাটির পাত্রে ওপরে-নীচে শালপাতার মাঝে চাল-মাংসের মাখাটা রেখে তার ওপরে একটা থান ইঁট চেপে দেওয়া হল। কাঠের আঁচে সেই পাত্র রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুরগি তো বটেই মাটন-পর্ক অবধি পাকতে দেরি হল না। শালপাতা সরাতে দেখলুম, মাংসের পিঠের পুরু থাকটা সত্যিই পিৎজা-পিৎজা দেখতে!
 
খুব বেশি মশলা পড়ে না। যৎসামান্য পেঁয়াজটেয়াজ। অগোছালো ঘরোয়া ভঙ্গিতে রান্না। সুচারু ভাবে কেটে ভাগাভাগিরও হাঙ্গামা নেই। পিঠে একটু-একটু ছিঁড়ে খাওয়ার সময়ে মাংসের কুচিতে দু-একটা হাড়েরও আভাস। কিন্তু এমন সুসিদ্ধ মাংস অবিশ্বাস্য। চালের গুঁড়ির সঙ্গতে মহিমময়।

তিন রকম পিঠের মধ্যে সেরা সুকরির পিঠা আমি শালপাতায় মুড়ে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলুম। এখনও অনেকটা রাস্তা। হুঁ-হুঁ বাওয়া, স্টকে রাখা সাদা রামের পাঁইটটা এত ক্ষণ এক ফোঁটাও খাইনি বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিলুম।

এক বছরের বেশি কেটে গিয়েছে। ও’দিকটায় আর যাওয়া হয়নি। ঝাড়খণ্ডের শেষ সোয়াদ হিসেবে সেই সুকরির পিঠাই এখনও জিবে লেগে। পো’ষ মাসের শেষে কলকাতায় মিষ্টির দোকানের পাটিসাপ্টা মাইক্রো আভেনে তাতিয়ে নিয়ে খেতে-খেতে য-ত পুরনো কথা মনে পড়ল।