শিল্প-সংস্কৃতি

পুস্তক পরিচয়

ক্ষেত্রটি একদিন মুক্ত ছিল

থ্রি চ্যান্সেলর্স: জওহরলাল ইন্দিরা রাজীব, সম্পাদনা নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। টাইমলেস বুকস, মূল্য অনুল্লেখিত

আশিস পাঠক

Indira, Rajiv and Nehru in Shantiniketan

গাঁধী-নেহরু পরিবার থেকে আসা বিশ্বভারতী-র তিন আচার্যের স্মৃতি, নথি এবং ছবি নিয়ে এই সংকলন। ছবি- ফাইল চিত্র

অসহযোগ, না আত্মশক্তি? স্বরাজ সম্পর্কে গাঁধী ও রবীন্দ্রনাথের দুই মতবাদ নিয়ে বিতর্কসভার আয়োজন হয়েছে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে। আশ্রমিকরা সভাপতি করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। চলল জমজমাট বিতর্ক। শেষে দেখা গেল পড়ুয়ারা গাঁধীর মতবাদকেই গ্রহণ করেছে। উঠে দাঁড়ালেন ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ, অভিনন্দন জানালেন পড়ুয়াদের। বললেন, ‘আজ আমার আশ্রমের শিক্ষা সার্থক হল।’
গাঁধী-নেহরু পরিবার থেকে আসা বিশ্বভারতী-র তিন আচার্যের স্মৃতি, নথি এবং ছবি নিয়ে সংকলনের একেবারে গোড়ায় ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন সম্পাদক। আর বইয়ের প্রকাশকের ভূমিকার প্রথমেই ইংরেজি অনুবাদে উদ্ধৃত নৈবেদ্য-র ৭২ নম্বর কবিতা...
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি...’।
বহু উল্লেখে লাইনগুলোর ধার আজ বোধ হয় কমে গিয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী-ধারণাটিকে অনুভব করা যায় ওই চার লাইনে। যত্র বিশ্ব ভবত্যেকনীড়ম্ তো এক লোগোবাক্য-মাত্র, চিন্তার ওই মুক্তিটাই বিশ্বভারতীর ধারণাটির মূল চরিত্র, কথাটা বোধহয় স্বীকার করবেন অনেকেই।
সেই চারিত্র্য বিশ্বভারতীর সাম্প্রতিক ছবিটায় কতটা প্রকাশিত সে নিয়ে যখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তখনই দৃশ্যময় এক অতীতযাত্রার সুযোগ করে দিল থ্রি চ্যান্সেলর্স। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গাঁধী এবং রাজীব গাঁধী— বিশ্বভারতীর এই তিন আচার্যের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্পর্ক ছবি, চিঠিপত্র ও অন্যান্য নানা নথি থেকে প্রভূত পরিশ্রম করে উপস্থাপন করেছেন সম্পাদক নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু নথি আর ছবিগুলি সাজিয়ে দেওয়া নয়, সম্পর্কটিকে নিজের লেখার মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। আর সেখানে আপনি তিনি দূরেই থেকেছেন, এই সংযম উল্লেখ করার মতো।
নথি-পত্র ও ছবিগুলির উৎস তিনটি— রবীন্দ্র-ভবন, নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং ইন্দিরা গাঁধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। সম্পাদক বিশ্বভারতীর ছাত্র এবং কর্মসূত্রে রবীন্দ্রভবন-সংগ্রহশালার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন। এই তথ্যটি বইটি পড়ার সময় মনে রাখতে হয়েছিল। কারণ, এর ফলে বিশ্বভারতী-কে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখায় একটা স্বাভাবিক বাধা জন্মাতে পারত। আবার এতে সংগ্রহশালাটির পূর্ণ ব্যবহারে একটা সুবিধেও হয়েছে।
এ বই বিশ্বভারতী-র কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠার উজ্জ্বল চিত্র-ইতিহাস।
১৪ মে ১৯৫১ থেকে ২১ মে ১৯৯১— এই ৪০ বছর সেই ইতিহাসের সময়কাল। এ পর্বে আরও থ্রি চ্যান্সেলর্স ছিলেন— লালবাহাদুর শাস্ত্রী, মোরারজি দেশাই, উমাশঙ্কর যোশি। এই তিন আচার্যের মোট কার্যকাল প্রায় ছ’বছর। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য জওহরলাল-ইন্দিরা-রাজীব ভারতের এই তিন প্রধানমন্ত্রী কেবল পদাধিকারবলেই বিশ্বভারতী-র আচার্য পদটি অলংকৃত করে থাকেননি, রীতিমতো সক্রিয় ভাবে জড়িত থেকেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে।
সক্রিয় এবং আন্তরিক। সেই অন্তরঙ্গতার ছবি এ বইয়ের পাতায় পাতায়। যেমন একটি, দেবলীনা মজুমদারের তোলা, ইন্দিরা ও জওহরলাল পৌষমেলার মাঠে নাগরদোলায় চড়েছেন। আর একটি, পাঠভবনে ছাত্রীদের সঙ্গে এক পংক্তিতে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন রাজীব গাঁধী। আচার্য হিসেবে তাঁর ভাষণগুলির চেয়ে এ বইয়ের বড় সম্পদ পড়ুয়াদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি প্রশ্নোত্তর, রবীন্দ্রভবনের টেপ থেকে যা তুলে দিয়েছেন সম্পাদক।
১৬ জানুয়ারি ১৯৮৮, উদয়ন-বাড়ির সামনে পড়ুয়াদের সঙ্গে আচার্য ‘রাজীব-দা’র সেই কথোপকথনের শুরুতেই মানবেন্দ্র নায়ক নামে এক ছাত্র প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হোয়াট শুড বি দ্য রিলেশন বিটউইন এডুকেশন অ্যান্ড পলিটিক্স?’ রাজীবের উত্তরটি বড় তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কিছুটা উদ্ধার করি, মূল ইংরেজিতেই: They have in a sense everything to do with each other, at the same time it is necessary at least to a certain degree, to keep the two apart. In a sense politics must mean moving towards the greater goal for the nation. I am trying to raise it above the day to day and electoral politics...
চেষ্টাটা সফল হয়েছিল কি না সে বিচার শিক্ষাবিদ এবং রাজনীতিবিদেরা করবেন। আপাতত এই উজ্জ্বল সংকলনটি আরও এক বার মনে করিয়ে দিল, মুক্ত চিন্তা আর উচ্চারিত প্রশ্নের উদার ক্ষেত্রটা একদিন প্রস্তুত ছিল। চার দেওয়ালের স্কুলের মানসিক প্রোটোকলটা ভেঙে ফেলবেন বলেই না রবীন্দ্রনাথ আশ্রম বিদ্যালয়টি বসিয়েছিলেন।

আনন্দবাজার পত্রিকা

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন