শিল্প-সংস্কৃতি

পুস্তক পরিচয়

বছর কুড়ি জুড়ে, অপূর্ব একা

আশিস পাঠক
কলকাতা, ২৯ ডিসেম্বর ২০১২

Kabir Suman, book cover

দু’দশকের বাংলা গানে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সুমন। ছবি- গ্রাফিক্স

গীতবিতানের শুকনো পাতায় বর্ষার গান
রবীন্দ্রনাথ একলা ভেজেন
আমাকে ভেজান।’
নাগরিক কবিয়ালের আর এক গীতবিতান তৈরি হয়ে চলেছে গত দু’দশক ধরে। ধারাবাহিক সেই বইটির নাম সুমনের গান। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে সাতটি সংকলন। অষ্টমটি কারখানায়, প্রকাশিত হবে এই বইমেলায়। সুমন চট্টোপাধ্যায়, অধুনা কবীর সুমনের প্রথম ক্যাসেট ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশেরও দু’দশক এ বছর। এই দু’দশকের বাংলা গানে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সুমন, কথাটায় বোধহয় তেমন আপত্তি থাকবে না অধিকাংশ সঙ্গীতরসিকের।
কিন্তু যদি বলি, রবীন্দ্রনাথের পরে, উজ্জ্বল কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, বাংলা গানের নাগরিক কথকতায় সুমনই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম? বিতর্ক উঠবে, একমত হবেন না অনেকেই। তবু যে সাতটি সুমনের গান হাতে আছে, আরও যে-সব আছে সুমনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সব মিলিয়ে যে ছশোর কাছাকাছি গান এখন পড়তে পারি তার ভিত্তিতে কথাটা বলতে ইচ্ছে করে। কারণ তিনটে। এক, আদ্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত নাগরিক মনন এ গানে সহজে প্রকাশ পায়। দুই, শুরু থেকে শেষ এ গানের প্রতিটি শব্দ গুরুত্বপূর্ণ, সুরকে টেনে নিয়ে যেতে নিছক জড়ো করা নয়। তিন, যে ভাব সুরে ও কথায় এ গানে প্রকাশিত হতে হতে চলে তা একই ব্যক্তির। ফলে ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো দরজাটা মেলাবার দরকার হয় না, জড়িয়ে থেকেই তার ছড়িয়ে যাওয়া।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলাল রজনীকান্ত অতুলপ্রসাদ নজরুলের পরে তিরিশের দশকে ‘আধুনিক বাংলা গান’ নামের যে পারিভাষিক শ্রেণিটির জন্ম তার বেশির ভাগই এখানে মৌলিক বৈশিষ্ট্যে আলাদা হয়ে যায়। কারণ সেখানে সুরকার ও গীতিকার দুই ভিন্ন ব্যক্তি। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংকটে পড়তে হয়। ‘উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা/ সূর্যের উজ্জ্বল রৌদ্রে/ চঞ্চল পাখনায় উড়ছে’ কার গান? গীতিকার বিমলচন্দ্র ঘোষের, সুরকার সলিল চৌধুরীর নাকি শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের? শেষ নামটাও এল। কারণ একাকী স্রষ্টার নহে তো গান...। ‘আধুনিক বাংলা গান’ যাকে আমরা বলি তার সার্থকতা অনেকটাই শিল্পী-নির্ভর। রবীন্দ্রনাথের গান তা নয়। কিন্তু সুমনের গান? না, আমি অন্তত সুমনের কণ্ঠ ছাড়া ভাবতে পারি না।
এ গানের ধারা কেউ বহন করার ক্ষমতা রাখেন কি না সে প্রশ্ন উত্তরকালের জন্য থাক। আপাতত বহু জনতার মাঝে এই অপূর্ব একাগুলিকে সযত্নে ধরে রাখছে সপ্তর্ষি প্রকাশনের সংকলনগুলি, এই বড় পাওয়া। ১৯৯৩-এর বইমেলায় স্বতন্ত্র প্রকাশনী অত্যন্ত জরুরি এই কাজটি শুরু করেছিল। বাঙালির উদ্যোগ চিরকাল ঢোল পিটিয়েও লঘুক্রিয়া হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে, আশার কথা, তা হয়নি। প্রেরণার চালশেটা মুছে দেয় বোধহয় সুমন, সুমনের গানই।

আনন্দবাজার পত্রিকা

অন্যরা যা পড়ছেন

এই বিষয়ে আরও

জনপ্রিয়