শিল্প-সংস্কৃতি

পুস্তক পরিচয়

গণতন্ত্রে এমন নজির খুব নেই

অযোধ্যা: দি ডার্ক নাইট, কৃষ্ণা ঝা ও ধীরেন্দ্র ঝা। হার্পার কলিন্স, ৪৯৯.০০

গৌতম রায়
কলকাতা, ১৯ জানুয়ারি ২০১৩

Babri Masjid

নিশ্চিহ্ন। ধ্বংসের আগে বাবরি মসজিদ, অযোধ্যা। ছবি- ফাইল চিত্র

মর্যাদাপুরুষোত্তম বিষ্ণু-অবতার কী ছলনার সঙ্গে ১৯৪৯-এর ২২ ডিসেম্বর মধ্যরাত্রে এক বিধর্মীর উপাসনাগৃহে ‘আবির্ভূত’ হয়ে তাকে নিজের জন্মস্থান বলে দাবি করেছিলেন, দুই সাংবাদিকের কলমে তারই রোমহর্ষক বিবরণী আলোচ্য বইটি। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের মাঝখানের গম্বুজটির ঠিক নীচে হিন্দু নরনারায়ণের এই আবির্ভাবের চমৎকার কাহিনি এত দিনে সকলেরই জানা। জানা রয়েছে দীর্ঘ ৬৩ বছর ধরে সমগ্র আর্যাবর্তের ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতার বিতর্কে ওই ঘটনার পূর্বাপর প্রভাবের কথাও— রামজন্মভূমি মুক্তি আন্দোলন, করসেবা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, সুরাত, মুম্বই ও গুজরাতে সংখ্যালঘুমেধ যজ্ঞ, হিন্দু মহাসভা, আর্য সমাজ, জনসংঘ ও বিজেপির উত্থান ও সংহতি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, শিব সেনা, শ্রীরাম সেনে প্রভৃতি জঙ্গি হিন্দুত্বের ফাসিস্ত বাহিনীর বিবর্তন।
তবু এমন একটি বইয়ের দরকার ছিল। কারণ, আজ বাবরি মসজিদ নামে কোনও স্থাপত্য ফৈজাবাদ-অযোধ্যার মাটির উপর দাঁড়িয়ে নেই। কোনও দিন ছিল কি না, ভাবী কাল তা জানবে কী ভাবে? ইতিহাসের যে রুদ্ধশ্বাস পুনর্লিখন চলছে! ভারতের ইসলামি ঐতিহ্য মুছে দিতে যে সব অপপ্রয়াস চলছে, তার মধ্যে অধুনা সবচেয়ে চমকপ্রদ হল হায়দরাবাদের বিখ্যাত চার মিনার সৌধের গায়ে ক্রমশ একটা হিন্দু মন্দির গড়ে তোলা। ৬০ বছর আগে তোলা আলোকচিত্রে ওই মন্দিরের কোনও অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ স্বাধীন, অতএব ধর্মনিরপেক্ষ ভারতেই ওই মন্দিরটি আস্তে-আস্তে তৈরি হচ্ছে এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের চোখের সামনেই তা করা হচ্ছে। কোথা থেকে এক ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’কে আমদানি করে তাঁর নামে ওই মন্দির গড়া হচ্ছে, আর মুসলিমরা প্রতিবাদ করলে হিন্দুত্ববাদের স্বেচ্ছাসেবকরা লাঠি-সোঁঁটা নিয়ে ‘আন্দোলন’ করছে। আকবরুদ্দিন ওয়াইসির বক্তব্য নিয়ে কিংবা মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন-এর আপত্তি নিয়ে বিগত পক্ষকাল ধরে হিন্দুত্ববাদীরা হায়দরাবাদে যে তাণ্ডব চালাচ্ছে ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করছে, বাবরি মসজিদে ‘রাম-লালা’র আবির্ভাবকে ঘিরেও কিন্তু একদা তেমনটাই করা হয়েছিল। ঘর-পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাবেই। চারমিনারের ভাগ্যলক্ষ্মীতে ‘রূপান্তর’-এর আশঙ্কা অহেতুক নয়।
রামজন্মভূমি বলতে সাবেক অযোধ্যায় বরাবর বাবরি মসজিদ লাগোয়া রামচবুতরাকেই শনাক্ত করা হত। সেখানেই ‘নির্মোহি আখড়া’-র তত্ত্বাবধানে প্রায় একশো বছর ধরে পুণ্যার্থীরা আসা-যাওয়া করেছেন। কিন্তু গাঁধী-হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ধৃত অযোধ্যার হিন্দু মহাসভার নেতা অভিরাম দাস, রামচন্দ্র দাস পরমহংস, বৃন্দাবন দাস প্রমুখের প্রকল্প ছিল বাবরি মসজিদটাকেই রামমন্দিরে রূপান্তরিত করা। এ কাজে একদিকে তাঁরা কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা রাঘব দাসের প্রশ্রয় পান, যেমন পান খোদ সংযুক্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত) গোবিন্দবল্লভ পন্থেরও। অন্য দিকে হিন্দু মহাসভার প্রচ্ছন্ন সমর্থক ফৈজাবাদের জেলাশাসক কে কে কে নায়ার, গুরু দত্ত সিংহ, পুর-চেয়ারম্যান প্রিয়দত্ত রাম এবং ফৈজাবাদের নগর দায়রা বিচারপতি ঠাকুর বীর সিংহ মসজিদে রাম-লালার আবির্ভাবে প্রশাসনিক ও আইনগত ‘স্থিতাবস্থা’ জারি করে সংখ্যালঘুর ধর্মাচরণের স্বাধীনতা কেড়ে নেন।
গোবিন্দবল্লভ পন্থ কী ভাবে সমাজতন্ত্রী কংগ্রেস নেতা আচার্য নরেন্দ্র দেবকে নির্বাচনে পরাস্ত করতে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে হাত মেলান, সেই সখ্য ক্রমে কত নিবিড় হয়, পরে সময়-সুযোগ থাকলেও এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সুস্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও মসজিদের ভিতর থেকে রাম-সীতার পুতুল সরিয়ে দেবার কিংবা অষ্টপ্রহর নামকীর্তন বন্ধ করার দায় ও কর্তব্য থেকে বিরত থাকেন, সে বিবরণ অনেকের জানা নেই। যেমন জানা নেই একই সঙ্গে প্রবল সেকুলার এবং দুর্মর গণতন্ত্রী নেহরুর অসহায় হাত- মোচড়ানো বেদনা, উপপ্রধানমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেলের কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থানের জন্য তাঁর প্রতি গোবিন্দবল্লভের অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতার বয়ানও। কৃষ্ণা ঝা এবং ধীরেন্দ্র ঝা মহাফেজখানা ঘেঁটে তুলে এনেছেন বহু প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি, সার্কুলার, হলফনামা। সেই সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে দেশময় হিন্দু মহাসভার নেতাদের ষড়যন্ত্রের রূপরেখা উদ্ঘাটনকারী বিভিন্ন ব্যক্তিগত পত্রালাপ, যা থেকে সহজেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ধর্মের সঙ্গে, ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে, সর্বোপরি রামচন্দ্রের জন্মস্থান উদ্ধারের সঙ্গেও ওই তথাকথিত আন্দোলনের কোনও সংশ্রবই কখনও ছিল না (আজও নেই)। গোটাটাই দেশভাগ-উত্তর হিন্দুস্তান থেকে মুসলমানদের পশ্চিম কিংবা পূর্ব পাকিস্তানে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযানের অন্তর্গত। মুসলিম-মুক্ত সেই হিন্দু ভারতের জন্য মহাত্মার হত্যা যেমন জরুরি, সংখ্যালঘুর ধর্মস্থান নিশ্চিহ্ন করাও তেমনই আবশ্যক, বিশেষত যে সব ধর্মস্থান রাম, কৃষ্ণ বা শিবের মন্দিরের গায়ে-গায়ে গড়ে উঠেছে। এ যেন কতকটা প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের অফিস পুড়িয়ে বা জবরদখল করে নিজের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চলতি বঙ্গীয় নাট্যেরই এক সাম্প্রদায়িক সংস্করণ।
তথাকথিত রামভক্তরা যে ছলনা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে ইসলামি মসজিদকে চোখের সামনে রাতারাতি রামমন্দির বানালেন, তা ইতিহাসে নজিরহীন নয়। মধ্যযুগের গোটা ইতিবৃত্তেই তো প্রজাদের গণ-ধর্মান্তরের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিধর্মীর ধর্মস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার কিংবা চুনকাম করে নিজ ধর্মের উপাসনাস্থল বলে চালানোর ঘটনা। কিন্তু একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে এমন পরিকল্পিত বর্বরতার নজির খুব বেশি নেই। সেই আখ্যানের তন্নিষ্ঠ বিবরণও তাই দরকারি।

আনন্দবাজার পত্রিকা

জনপ্রিয়

সমস্ত ভিডিও

বর্ধমানে তরুণীর উপর অ্যাসিড হামলা

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 1 জন

কালো টাকা নিয়ে জেটলি যা বললেন

এবিপি আনন্দ

দেখেছেন 0 জন

দেব-শ্রাবন্তীর বিন্দাস প্রেম

শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্

দেখেছেন 0 জন

তাপস পাল লোফার নন, ল' মেকার

এবিপি আনন্দ।

দেখেছেন 0 জন