বাংলা ব্লগ

সাফল্যের লক্ষ্যে একধাপ

পথিক গুহ

কী বলব একে? সাফল্য? নাকি আধা-সাফল্য? সিকি-সাফল্যও বোধহয় বলা যেতে পারে।

গণিতের এক ধাঁধার সমাধানে এক পা এগোন গেল। যে ধাঁধার বয়স পৌনে তিনশো বছর, যার সমাধানে হিমশিম খাচ্ছেন গণিতজ্ঞেরা, তা সমাধানের লক্ষ্যে এক পা। কী সেই ধাঁধা? যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যে, ২-এর চেয়ে বড় যে কোনও জোড় সংখ্যা দুটো মৌলিক সংখ্যার সমষ্টি। জোড় সংখ্যা ২, ৪, ৬, ৮, ...। আর মৌলিক হল সেই সব সংখ্যা, যারা অন্য সংখ্যার গুণফল নয়। ওরকম গুণফল সংখ্যাকে বলে যৌগিক। যেমন ৬, ৮, ৯, ১০, ...।

কারণ, ৬ = ২ x ৩
৮ = ২ x ২ x ২
৯ = ৩ x ৩
১০ = ২ x ৫

কিন্তু ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩... ইত্যাদি হল মৌলিক সংখ্যা। ওদের ওরকম গুণফলে লেখা যায় না। এখন, ২-এর চেয়ে বড় যে কোনও জোড় সংখ্যা দুটো মৌলিক সংখ্যার যোগফল।
৪ = ২ + ২
৬ = ৩ + ৩
৮ = ৩ + ৫
১০ = ৩ + ৭
= ৫ + ৫
১২ = ৫ + ৭
২০ = ৩ + ১৭
= ৭ + ১৩
১০০ = ৩ + ৯৭
   = ১১ + ৮৯
   = ১৭ + ৮৩
   = ২৯ + ৭১
   = ৪১ + ৫৯
   = ৪৭ + ৫৩

দেখা যাচ্ছে, জোড় সংখ্যাকে এক বা একাধিকভাবে দুটো মৌলিকের সমষ্টি হিসেবে লেখা যায়। যে কোনও জোড় সংখ্যার বেলাতেই কি এই নিয়ম ঘটে? জোড় সংখ্যার তো শেষ নেই। এমন একটা জোড় সংখ্যাও কি নেই, যাকে ওভাবে মৌলিকের সমষ্টি হিসেবে লেখা যায় না? ওই প্রশ্নটিই হল পৌনে তিনশো বছরের পুরনো ধাঁধা।
ধাঁধার জন্মকথা এখানে বলা দরকার। জন্মের পিছনে দু’জন গণিতজ্ঞ। জন্মসূত্রে জার্মান কিন্তু পরে রাশিয়ার বাসিন্দা ক্রিশ্চিয়ান গোল্ডবাক। এবং জার্মান গণিতজ্ঞ লিওনার্ড অয়লার। দু’জন দু’জনকে লেখেন বহু চিঠি। অঙ্কের নানা বিষয় আলোচনা করে। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন অয়লারকে লেখা চিঠিতে গোল্ডবাক জানান– ‘দুই মৌলিকের সমষ্টি যে কোনও সংখ্যাকে যত খুশি মৌলিকের যোগফল হিসেবেও লেখা যায়, শেষমেশ ওগুলি সব হতে পারে ১।’ মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু ১ সংখ্যাটিকে মৌলিক গণ্য করা হত। এখন আর ১ মৌলিক শ্রেণিভুক্ত নয়।
গোল্ডবাক যা বলেন, তা এই –

৩ + ৫ = ৮
= ২ + ২ + ২ + ২
= ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১
৭ + ১১ = ১৮
= ২ + ৩ + ৩ + ৫ + ৫
= ২ + ২ + ২ + ৩ + ৩ + ৩ + ৩
= ২ + ৩ + ১৩
= ৩ + ৫ + ৫ + ৫
= ১ + ১৭
= ...
= ...
= ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১+ ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১ + ১

ওই চিঠির মার্জিনে গোল্ডবাক আরও একটি অনুমানের কথা জানান। তিনি লেখেন, ‘২-এর চেয়ে বড় যে কোনও সংখ্যাকে তিনটে মৌলিকের সমষ্টি হিসেবে লেখা যায়।’ অর্থাৎ
৩ = ১ + ১ + ১
৪ = ১ + ১ + ২
৫ = ১ + ২ + ২
৬ = ১ + ২ + ৩
৭ = ২ + ২ + ৩
১০ = ২ + ৩ + ৫
২০ = ২ + ৭ + ১১

গোল্ডবাকের ৭ জুনের চিঠির উত্তর অয়লার দিলেন ৩০ জুন লেখা এক চিঠিতে। ওতে অয়লার গোল্ডবাককে মনে করালেন আগে ওঁদের দু’জনের সামনাসামনি এক আলোচনার স্মৃতি। যে আলোচনাকালে গোল্ডবাক তাঁকে বলেছিলেন, ২ এর বড় যে কোনও সংখ্যা যে তিনটে মৌলিকের সমষ্টি, সেটা আসে অন্য একটা দাবি থেকে। তা হল– ২-এর বড় যে কোনও জোড় সংখ্যা দুটো মৌলিকের সমষ্টি।
এই দাবিটা পরিচিত হয়েছে ‘স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার’ নামে। আর একটা দাবির নাম ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’। যা চলে আসে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন লেখা গোল্ডবাকের চিঠিতে মার্জিনে লেখা সেই মন্তব্য থেকে। মন্তব্যটি ছিল– ‘২-এর বড় যে কোনও সংখ্যা তিনটে মৌলিকের সমষ্টি।’ ওই দাবিকে এগিয়ে নিয়ে বলা যায়– ‘যে কোনও বিজোড় সংখ্যা সর্বাপেক্ষা তিনটে মৌলিকের সমষ্টি।’ এটাই হল ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’।

এই ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’-এর নমুনা–
৭ = ২ + ২ + ৩
৯ = ২ + ২ + ৫
১১ = ২ + ২ + ৭
১৩ = ৩ + ৩ + ৭
৭৭ = ৫৩ + ১৩ + ১১

এগুলো সবই নমুনা। মাত্র কয়েকটি বিজোড় সংখ্যা দিয়ে পরখ করা হল। যে কোনও বিজোড় সংখ্যার ক্ষেত্রেই কি এ নিয়ম খাটবে? বিজোড় সংখ্যার তো শেষ নেই। কত সংখ্যার ক্ষেত্রে পরখ করে দেখা হবে? ‘স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার’-এর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। জোড় সংখ্যার তো শেষ নেই। কত জোড় সংখ্যা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হবে যে সেগুলো সত্যিই দুটো মৌলিকের সমষ্টি কি না? এক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের একমাত্র পন্থা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ। প্রমাণ করা যে, জোড় সংখ্যা দুটো মৌলিকের সমষ্টি হতে বাধ্য। অথবা, বিজোড় সংখ্যায় পৌঁছতে তিনটের বেশি মৌলিক লাগে না। হায়, যুক্তি দিয়ে তেমন সব দাবি আজ পর্যন্ত কেউ প্রমাণ করতে পারেননি।

এ ব্যাপারে স্মরণীয় এক ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে হয়। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় একখানি বই। ‘আংকল পেত্রোস অ্যান্ড গোল্ডবাক’স কনজেকচার’। এক কল্পকাহিনি। বিষয় স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার প্রমাণে এক গণিতজ্ঞের ব্যর্থ প্রচেষ্টা। বইখানির প্রকাশক আটলান্টিকের দু’পারে দুই সংস্থা। ব্লুমসবেরি এবং ফেবার অ্যান্ড ফেবার। প্রকাশিত বইয়ের পাবলিসিটির জন্য দুই সংস্থা নেয় এক অভিনব উদ্যোগ। ঘোষণা করে এক ইনাম। ২০০২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে ‘স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার’ প্রমাণ করতে পারলে মিলবে এক মিলিয়ন ডলার প্রাইজ।
সময়সীমা বহুকাল অতিক্রান্ত। প্রাইজ জেতেনি কেউ। প্রমাণ হয়নি ‘স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার’। তবে, ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’ প্রমাণের লক্ষ্যে এগোন গেছে এক ধাপ। লস এঞ্জেলসে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতজ্ঞ টেরেন্স টাও প্রমাণ করেছেন, যে কোনও বিজোড় সংখ্যা সর্বোচ্চ পাঁচটি মৌলিকের সমষ্টি। অর্থাৎ, ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’-এ যেখানে তিনটি মৌলিকের কথা বলা হয়েছে, সেখানে টাও প্রমাণ দাখিল করতে পেরেছেন পাঁচটি মৌলিক নিয়ে।

তবু, এতেই শোরগোল পড়েছে গণিত জগতে। সামান্য হোক, তবু তো অগ্রগতি। টাও আশাবাদী, যে সাফল্য মিলেছে, তা সম্বল করে তিনি যাবেন এগিয়ে। খুব শিগগিরই প্রমাণ করবেন যে কোনও বিজোড় সংখ্যাকে সর্বোচ্চ তিনটি মৌলিকের সমষ্টি হিসেবে লেখা যায়। অর্থাৎ, প্রমাণিত হতে চলেছে ‘উইক গোল্ডবাক কনজেকচার’।

আর, ‘স্ট্রং গোল্ডবাক কনজেকচার’? নাহ্, তা তো এখনও দূর অস্ত।